রূপপুর : ঝুঁকিতে পড়ছে কি বাংলাদেশ!

সিকি শতাব্দী ধরে পরিত্যক্ত সাজানো গোছানো নগর

জাপানে পারমাণবিক চুল্লিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ বিশ্ব বিবেককে আরেকবার নাড়িয়ে দিয়েছে। পরমানু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোকে সভ্যতা বিধ্বংসী শক্তি নিয়ে খেলার পরিণাম কতটা ভয়ংকর হতে পারে তা আরেকবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেল । পারমানবিক দূর্ঘটনায় সাধারণত সঠিক তথ্য কখনোই প্রকাশিত হয় না, তাই জাপানে কতটা ক্ষতি হয়েছে তার হয়তো সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে না যদিও ইতোমধ্যেই সাগর পেরিয়ে রাশিয়া পোঁছেছে তেজস্ক্রিয়তা । তারপরও পারমানবিক স্থাপনায় আমেরিকার সহায়তাকে জাপান উপেক্ষা করায় সন্দেহ আরো বাড়িয়ে তুলেছে। এর আগে রাশিয়ার পারমানবিক ডুবোজাহাজ কুরস্ক দূর্ঘটনায় পড়লে তারাও সাহায্যের প্রস্তাব প্রথমে প্রত্যাখ্যান করেছিল। বিষয়টি যে কতটা ভয়াবহ তা পারমানবিক শক্তিধর দেশগুলো ঠিকই অনুধাবন করতে পারছে আর  তাই পরমানু স্থাপনা নির্মান স্থগিত করেছে চীন, জার্মানী এবং সুইজারল্যান্ড, এমনকি চাপের মুখে পড়েছে ওবামার পারমানবিক জ্বালানী চুক্তিও।  আর ভারতে তো বিতর্কিত পারমানবিক চুক্তি কেলেংকারী নিয়ে গতকাল পাল্টামেন্টে হট্টগোল বেধে গেল, প্রধানমন্ত্রী মনমোহনের পদত্যাগ দাবী করা হলো। “ডাক্তার বাবু ভয়ে ছোটে, নাপতা ব্যাটা ফোঁড়া কাটে”, ঠিক তেমনি পারমানবিক বিস্ফোরণে স্তব্ধ পরমানু বিজ্ঞানীরা যেখানে পারমানবিক শক্তির বিকল্প নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন, নিরাপত্তা নিয়ে পেরেশান হচ্ছেন, সেখানে বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান ঘোষণা করলেন, রূপপুর পরমাণু কেন্দ্র নিয়ে মোটেই চিন্তিত নয় বাংলাদেশ। সাবাস! মন্ত্রী, সাবাস!!

জাপানের সাম্প্রতিক দূর্ঘটনা নিয়ে বিশ্ব ইতোমধ্যেই শতাধিক দূর্ঘটনার কবলে পড়েছে, এবং এর জন্য বিশ্ববাসীকে কতটা মাসুল দিতে হয়েছে তা খুব সহজে হিসেব দেয়া অসম্ভব।  আসুন, একবার দৃষ্টি ফেরাই সিকি শতাব্দী আগে ঘটে যাওয়া চেরনোবিল দূর্ঘটনার দিকে। এ দূর্ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে ইউক্রেন, বেলারুশ এবং রাশিয়া সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ১লক্ষ ৫৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে দীর্ঘমেয়াদী তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে যাতে শুধূমাত্র বেলারুশেরই ২৩% এলাকা ক্ষতিগ্রস্থ হয়, যার শিকার হন ৮৪ লাখেরও বেশি মানুষ। জনসংখ্যার বিবেচনায় তা গোটা অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যাকেও হার মানায়। এ দূর্ঘটনায় ৫২ হাজার বর্গকিলোমিটার কৃষিজমি দূষিত হয় যা গোটা ডেনমার্কের সমান। আর তেজস্ক্রিয়তার কারণে চার লক্ষাধিক মানুষকে আবাসস্থল ছেড়ে যেতে হয় যা আজো পরিত্যক্ত পড়ে রয়েছেএবং এ বিপর্যয়ের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছে ৬ লক্ষাধিক কর্মীকে। আর্থিক বিবেচনায় চেরনোবিল দূর্ঘটনায় বেলারুশের ৩২ অর্থবছরের বাজেটের সমান ক্ষতি হয় দেশটিতে।

এবার একবার ভেবে দেখুন, বাংলাদেশে এ ধরণের যদি কোন দূর্ঘটনা ঘটে যায় তবে কি পরিমান ক্ষতি হতে পারে বাংলাদেশের। আগেই চোরনোবিল দূঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ এলাকার পরিমান উল্লেখ করেছি, এবার দয়া করে একবার বাংলাদেশের আয়তনের সাথে মিলিয়ে নিতে পারেন। চেরনোবিল দূর্ঘটনার মতো কোন পারমানবিক বিস্ফোরণ ঘটলে বাংলাদেশের সম্পূর্ণ অঞ্চলই দূষিত হয়ে পড়বে এবং  ভারত, নেপাল, ভূটান, মায়ানমারসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোও এ থেকে রেহাই পাবে না। আর যদি জনসংখ্যার ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় আনা হয় তবে তা হবে বিশ্বের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১১০০ জন বসবাস করে এবং এমন এলাকা পাওয়া প্রায় অসম্ভব যেখানে মানুষের বসবাস নেই। এমনকি গহীন জঙ্গলেও মানুষের বিচরণ আছে, আছে প্রাণবৈচিত্রে ভরপুর প্রাণী ও উদ্ভিদ জগত। বাংলাদেশে যে কোন পারমানবিক বিপর্যয়ে প্রথমেই পুরো দেশের জনশক্তিকে দেশের বাইরে সরিয়ে নিতে হবে, কিন্তু প্রশ্ন হলো ১৬ কোটি মানুষকে হুট করে কোন দেশ স্থান দেবে? বিষয়টি এমন নয় যে ২/৩ দিনের জন্য ভারতে বেড়াতে গেলাম আবার চলে এলাম, বরং পুরো দেশটাকেই চীর জীবনের জন্য ছেড়ে যেতে হবে ১৬ কোটি বাংলাদেশীকে। এবার ভাবুন, কে দেবে দীর্ঘস্থায়ী বসবাসের সুযোগ, কে নেবে ১৬ কোটি বাংলাদেশীদের খাওয়া পড়া কর্মসংস্থানের ভার?

রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আশার বানী শুনিয়েছেন মন্ত্রী, বললেন জাপানের পারমানবিক কেন্দ্র গুলো পুরনো এবং আমাদের গুলো হবে ৩য় প্রজন্মের। তবে খুব একটা আশস্ত হতে পারলাম না এ জন্য যে, যে রাশিয়ার সাথে পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি হয়েছে, সেই রাশিয়াই প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে বাংলাদেশকে। রাশিয়ার প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে ইতোমধ্যে ভারত বেশ বিপদে পড়েছে, ভারতের উৎক্ষিপ্ত স্যাটেলাইট কয়েকবার বিস্ফোরিত হয়েছে। এছাড়া রাশিয়ার তৈরী মিগ ইতোমধ্যেই উড়ন্ত কফিন নাম ধারণ করায় ভারত এ যানটির সংখ্যা ক্রমশ কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে। আর আমাদের মন্ত্রী মহোদয় যে সুবিধাটির কথা বললেন তা-ই সবচেয়ে চিন্তার বিষয়। মন্ত্রী বলেন, “এত কম খরচে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ আমরা পাবো না, তাই এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করা হবেই“। সস্তার তিন অবস্থা একথা সবাই জানলেও মন্ত্রী কিসের স্বার্থে ভুলে গেলেন তা বোধগম্য নয়। অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু রাশিয়াও চাইছে যে কোন ভাবে তাদের পণ্যগুলো বাংলাদেশকে গছিয়ে দিতে, কিন্তু বাংলাদেশকে অবশ্যই ভাবতে হবে তার ১৬ কোটি জনগণের কথা।

বাংলাদেশে বড় ধরণের ভূমিকম্পের আশংকা করছেন বিশেষজ্ঞরা, আর মাত্র ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে রাজধানীর ৭২ হাজার দালান ভেঙ্গে পড়বে বলে তাদের আশংকা। প্রতিবেশী দেশ ভারতের পরমাণু কেন্দ্রগুলো এমনভাবে তৈরি, যা ভূমিকম্পের তীব্রতা রিখটার স্কেলে ৭ পর্যন্ত সহ্য করতে পারে। এর বেশি হলে কোন নির্মাণই অক্ষত থাকতে পারে না বলে মত বিশেষজ্ঞদের। মন্ত্রী বললেন বাংলাদেশে তৈরী পারমানবিক কেন্দ্র হবে ১০ মাত্রার ভূমিকম্প প্রতিরোধক, অথচ দশ মাত্রার ভূমিকম্প প্রতিরোধক পরিমাপ করার কোন পরীক্ষা নিরীক্ষা আজ পর্যন্ত কোথাও হয়েছে কিনা তা জানা যায় না।  যে দেশে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প সহ্য করার ক্ষমতা নেই সে দেশে ১০ মাত্রার ভূমিকম্প প্রতিরোধক বিদ্যুৎকেন্দ্র, তাও আবার কমমূল্য, আসলেই তৈরী করা সম্ভব কিনা তা বিবেচনার বিষয়। বাংলাদেশে শত বৎসরের জন্য যমুনা সেতু গড়ার কয়েকদিন পড়েই ফাটল ধরে, অধিকাংশ স্থাপনারই একই হাল, সেখানে কি যাদু মন্ত্রে এই স্থাপনাটি ১০ মাত্রার ভূমিকম্প প্রতিরোধক হবে তা অকল্পনীয়।

রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র এখনো শুধুই চুক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ। এখনো আমাদের হাতে যথেষ্ট সময় আছে ভাববার, এখনো যথেষ্ট সময় আছে চুলচেরা বিশ্লেষণ করার, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সাথে জোড়ালো পরামর্শ করার। লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা সওয়া যায় না, দ্রুত বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান চায় সবাই। কিন্তু বিশ্ব যেখানে নতুন করে চিন্তাভাবনা করছে সেখানে এমন কিছু আমাদের করা উচিত হবে না যাতে পুরো দেশের আলোই নিভিয়ে দেয়।

Be Sociable, Share!

One Reply to “রূপপুর : ঝুঁকিতে পড়ছে কি বাংলাদেশ!”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।