ড. ইউনুসকে সরানোর আসল কারণ : শফিক রেহমানের কলাম

ড. ইউনুসকে সরানোর আসল কারণ
নেড়িকুকুরের টেলি-সংলাপ
-শফিক রেহমান

হোয়াইট হাউজের সামনে কুকুর বো কে নিয়ে ওবামা

(আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ওবামার পোষা কুকুর বো এবং বাংলাদেশের নেড়িকুকুরের টেলি-সংলাপের অনুলিপি)

স্খান : ওয়াশিংটন ও ঢাকা
কাল : মঙ্গলবার ৮ মার্চ ২০১১

নেড়িকুকুর : আপনাকে এই অসময়ে ফোন করার জন্য আগেই ক্ষমা চাইছি। আমি খুব সমস্যায় পড়ে আপনাকে ফোন করছি। আপনার উপদেশ আমার এখনি দরকার। আমি আপনার মূল্যবান সময়ের কিছুটা ভিক্ষা করছি।
বো (BO) : আমি আপনার বন্ধু। অবশ্যই আপনি আমাকে যে কোনো সময়ে ফোন করতেই পারেন। ইংরেজিতে কথা আছে­ এ ফেন্সন্ড ইন নিড, ইজ এ ফেন্সন্ড ইনডিড ((A friend in need, is a friend indeed)। প্রয়োজনের সময়ে যিনি বন্ধু হন, তিনিই তো আসল বন্ধু। আমি চেষ্টা করবো আপনাকে সাহায্য করতে। সমস্যাটা কি?
নেড়িকুকুর : থ্যাংক ইউ সো মাচ। আপনি তো জানেন আমি বাংলাদেশে কুকুর ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছি। বাংলাদেশে কতো কোটি মানুষ আছে তার সঠিক হিসাব এই মুহূর্তে দেয়া কঠিন। ঠিক তেমনি বাংলাদেশে কতো কোটি কুকুর আছে সেটা বলাও কঠিন। তবে আছে অন্তত দুই কোটি নেড়িকুকুর। তাদের মধ্যে ৮৩ লক্ষ হয়েছে কুকুর ব্যাংকের সদস্য এবং সারা দেশ জুড়ে আমাদের কুকুর ব্যাংকের শাখার সংখ্যা এখন ২,৫০০-র কিছু বেশি।
বো : হ্যা। এসব আমি জানি। কুকুর ব্যাংক এখন গ্রামীণ ব্যাংকের প্রায় সমান। হোয়াইট হাউসে বস আর হিলারি আন্টি প্রায়ই ড. ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংকের কথা বলেন। পাশাপাশি আপনার কুকুর ব্যাংকের কথাও তখন তারা বলেন। এ সবই আমি শুনি। সেদিন বস বললেন, মাইক্রোক্রেডিট সামিট ক্যামপেইন বা ক্ষুদ্রঋণ শীর্ষ আন্দোলনের একটি রিপোর্টের মতে, ২০০৯-এ বিশ্বের ৬৪ কোটি মানুষ ক্ষুদ্রঋণের ফলে লাভবান হয়েছেন। মাইক্রোক্রেডিট সামিট ক্যামপেইনের এখন লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ২০১৫-র মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে গরিব সাড়ে সতের কোটি পরিবারের মধ্যে পৌছানো। তখন বস এটাও বললেন, আমেরিকাতে সাড়ে ছয় কোটি কুকুর আছে এবং তাদের জন্য বাংলাদেশের কুকুর ব্যাংকের মতোই একটা ব্যাংক করা উচিত। ২৭% আমেরিকান তাদের উইলে কুকুরের কথা বলে যান। আমেরিকার ৮৩% মানুষ তাদের কুকুরের জন্য নিজের জীবনের ঝুকি নিতে প্রস্তুত। তাই আমেরিকান ভোটারদের কাছে কুকুর ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বসকে আরো পপুলার করবে।
নেড়িকুকুর : আমরা জানি প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রয়াত মা, ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পের একজন গুণগ্রাহী ছিলেন। আমরা জানি প্রেসিডেন্ট নিজেও ড. ইউনূসের গুণগ্রাহী। অতি সম্প্রতি তাকে আমেরিকার সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক নিজের হাতে পরিয়ে দিয়ে সম্মানিত করেছেন। কিন্তু আমি জানতাম না তিনি কুকুর ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতেও আগ্রহী।
বো : কুকুরদের খুব ভালোবাসেন বস। তাই তিনি তার দুই মেয়েকে কথা দিয়েছিলেন হোয়াইট হাউসে গেলে তিনি তাদের একটি কুকুর গিফট দেবেন। আর সেই সুবাদেই তো আমার এখানে আসা এবং থাকা। বস আমাকে এতই ভালোবাসেন যে তিনি নিজের নামের দুটি আদ্যক্ষর দিয়ে আমার নাম রেখেছেন। বারাক (Barack)-এর বি (B) এবং ওবামা (Obama)-র ও (O)। বো!
নেড়িকুকুর : আমি নেড়িকুকুর। আমাদের কোনো নাম নেই বাংলাদেশে।
বো : কিন্তু আপনি বাংলাদেশের নেড়িকুকুরদের জন্য যে কাজ করেছেন সেটা আজ বিশ্ববাসী নিজেদের দেশে অনুকরণে আগ্রহী। এটা তো অসাধারণ সাফল্য। আপনার কোনো নাম নেই, তাতে কি? আপনি নোবেল প্রাইজ পাবেন। তখন আপনিই হবেন নিজের দেশে সবচেয়ে পরিচিত প্রাণী এবং বিদেশেও সবচেয়ে পরিচিত বাংলাদেশী।
নেড়িকুকুর : এই সম্ভাবনা আছে টের পেয়েই তো আপনাকে ফোন করেছি। ড. ইউনূসের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা থেকে আমি বুঝতে পেরেছি নোবেল প্রাইজ পেলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও তার আমেরিকা নিবাসী পুত্রের ঈর্ষার শিকার হতে পারি আমি। লন্ডনের প্রভাবশালী সাপ্তাহিক দি ইকনমিস্ট ২ মার্চের সংখ্যায় লিখেছে, গত তিন মাস ধরে বিভিন্ন মিডিয়ায় ড. ইউনূসকে অপদস্খ করতে যেসব কিছু বলা হচ্ছিল এবং তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকার যেভাবে মামলা করছিল, তারই চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে, ৩০ বছর আগে তারই গড়া ব্যাংক থেকে তাকে সরিয়ে দেয়া।
প্রবìধটির মতে, গত নভেম্বরে নরওয়ের জাতীয় টেলিভিশনে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র সম্প্রচারিত হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ সরকার ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগে। প্রামাণ্যচিত্রে দাবি করা হয়েছিল, ১৫ বছর আগে গ্রামীণ ব্যাংকের লাখ লাখ ডলার হাওয়া হয়ে গেছে।
প্রবìেধ বলা হয় কোনো সন্দেহ নেই, নরওয়ে সরকার পরিচালিত তদন্তে দেখা গেছে প্রামাণ্যচিত্রের সেই অভিযোগ ভিত্তিহীন। এই পরিস্খিতিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সতর্কতার সঙ্গে রাজনৈতিক ডামাডোল পিটিয়ে ড. ইউনূসকে হেনস্তা করার প্রেক্ষাপট নির্মাণ করেন।
ইকনমিস্টের রিপোর্টে বলা হয়, চৌদ্দ বছর আগে শেখ হাসিনা যখন প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন, তখন ড. ইউনূসের ব্যাপারে তিনি অতটা কঠোর ছিলেন না। ১৯৯৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদের ক্ষুদ্রঋণ শীর্ষ সম্মেলনের কো-চেয়ারম্যান হিসেবে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “আমরা বাংলাদেশে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার গড়া গ্রামীণ ব্যাংকের অসাধারণ কার্যক্রমে গর্বিত।”
প্রবìেধ বলা হয়েছে, ড. ইউনূস বিশ্বকে এটা দেখিয়ে দিয়েছেন ক্ষুদ্রঋণের সুবিধা নিয়েও দরিদ্ররা আয় বাড়ানোর সামর্থ্য রাখে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের ভাগ্য পাল্টে দিতে পারে। দরিদ্রদের ক্ষুদ্রঋণ সহায়তা প্রকল্প বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সম্প্রসারণ ঘটেছে মূলত গ্রামীণ ব্যাংকের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে।
ইকনমিস্ট লিখেছে, সুতরাং যে কেউ এটা আশা করতে পারেন, এই শীর্ষ সম্মেলনের ৯ বছর (২০০৬-এ) পর যখন ড. ইউনূস শান্তিতে নোবেল পেলেন, তখন শেখ হাসিনাও তার ওপর সন্তুষ্ট থাকবেন। কিন্তু আসলে তা হয়নি। কারণ শেখ হাসিনা ড. ইউনূসের নোবেল প্রাপ্তির বহু আগ থেকে মনে করছিলেন তিনিই শান্তিতে এই পদক পাওয়ার যোগ্য। ক্ষুদ্রঋণ চালুর জন্য ড. ইউনূস শান্তিতে নোবেল পেতে পারেন না। বরং তিনি ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যে শান্তিচুক্তি করেছিলেন, তার জন্য তাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া উচিত ছিল। তবে এ কাজে বিশ্বের নানা প্রান্তে তিনি সিনিয়র আমলাদের লবিইং করতে পাঠিয়েও সফল হননি।
ইকনমিস্টের ভাষায়, কিন্তু নোবেল প্রাপ্তির মাধ্যমে ড. ইউনূস হঠাৎ করেই প্রধানমন্ত্রীর বাবা শেখ মুজিবুর রহমানের চেয়েও বিখ্যাত হয়ে যান। যারা শেখ হাসিনাকে খুব কাছ থেকে জানেন, তাদের মতে, এটা মেনে নেয়া শেখ হাসিনার পক্ষে তেতো ওষুধ গেলার চেয়েও কঠিন হয়ে দাড়ায়।
ওই ম্যাগাজিনে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানসিক অসন্তুষ্টি সরাসরি ব্যক্তিগত বিরোধে রূপ নেয়, নোবেল পাওয়ার পাচ মাস পর ড. ইউনূস রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দেন। সেনাসমর্থিত কেয়ারটেকার সরকারের শাসন আমলে ড. ইউনূস এ ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেনানায়করা আশা করেছিলেন, দেশটির রাজনীতি থেকে শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়াকে সরিয়ে দেয়া সম্ভব। কিন্তু তারা মাইনাস-টু ফর্মুলা বাংলাদেশী জনগণকে গেলাতে পারেননি। ড. ইউনূস রাজনৈতিক অঙ্গনে বিদ্যমান দুর্নীতির জঞ্জাল সরাতে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা চিরতরে উচ্ছেদ করার পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী ছিলেন।
ইকনমিস্টে লেখা হয়েছে, ড. ইউনূসের অভিপ্রায় যা-ই হোক না, রাজনীতিতে তার নাক গলানোর এই উদ্যোগকে শেখ হাসিনা নিজের ও তার দলের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছেন। ইকনমিস্টের মতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ একজন সিনিয়র আমলা বলেন, তিনি (শেখ হাসিনা) মনে করলেন ড. ইউনূস (তার মতে) সেনাবাহিনীর তৎপরতার সঙ্গে জড়িত এবং তাকে রাজনীতি থেকে অপসারণের চেষ্টা করছেন। এ কারণে সেনাবাহিনীর পরিকল্পনা ড. ইউনূসের পরিকল্পনাও বটে।
প্রবন্ধে আরো বলা হয়, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন দাবি করছে, ১৯৯৯ সাল থেকে ড. ইউনূস অবৈধভাবে গ্রামীণ ব্যাংক ব্যবস্খাপনা পরিচালক বা এমডি’র পদ দখল করে আছেন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তি হচ্ছে গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনা পরিষদ ড. ইউনূসের পুনর্নিয়োগ অনুমোদন করেনি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট এম জহিরের উদ্ধৃতি দিয়ে ইকনমিস্ট বলেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক খুব ভালো করেই জানতো ড. ইউনূস সঠিকভাবেই গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদে আছেন। তার ভাষায়, বাংলাদেশ ব্যাংক যখন এতদিন ধরেই তাকে ওই পদে থাকতে দিয়েছে, তাতে ইউনূসের পদে থাকার ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে সম্মতি ছিল, তা আমরা ধরেই নিতে পারি।
ইকনমিস্টের আশঙ্কা, সরকারের প্রসঙ্গ এলেই বাংলাদেশের আদালতগুলো ক্রমান্বয়ে সরকারের মুখপানে চেয়ে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। তাই ড. ইউনূসকে তার পদে ফিরিয়ে দেয়ার রায় দিতে হলে খুবই সাহসী কোনো বিচারপতির প্রয়োজন রয়েছে।
ইকনমিস্ট আরো লিখেছে, সম্ভবত পুরো ঘটনার এটাই সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হচ্ছে গ্রামীণ ব্যাংকের পদ থেকে ড. ইউনূসকে সরাতে বাংলাদেশ সরকার তার আন্তর্জাতিক সুনামকে কতোটা ঝুকিতে ফেলতে আগ্রহী হবে। ড. ইউনূসকে অপসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার কতটুকু লাভবান হবে তা অনুমান করা কঠিন। যদি সরকার এ পদক্ষেপে জিতে যায়, তাহলে গ্রামীণ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিতে আগ্রহী হবে এবং এ ব্যাংকটাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবে।
ড. ইউনূসের এই অভিজ্ঞতা থেকে আমি বুঝেছি নোবেল প্রাইজ পেলে আমারও একই অবস্খা হবে। সেদিন পড়লাম এই প্রথম নোবেল প্রাইজ কমিটি জানিয়েছে পরবর্তী শান্তি পুরস্কারের জন্য কারা মনোনীত হয়েছেন। এদের মধ্যে উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ-এরও নাম আছে। আমি শুনেছি, আমার নামও আসতে পারে। প্লিজ, বো, বসকে বলেন, হিলারি আন্টিকে বলেন, আমার নাম যেন কিছুতেই না আসে। নোবেল প্রাইজ পেলে এখন হয়তো রাশিয়ান সাহিত্যিক আলেকজান্দার শোলঝেনেৎসিন এবং ইরানি আইনজীবী শিরিন এবাদি-র মতো নির্বাসনে থাকতে হবে। অথবা চায়নিজ শান্তিবাদী লিউ জিয়াওবো-র মতো জেলে থাকতে হবে। আমি সুন্দরভাবে আমার পদ ছেড়ে দিতে চাই। আমার বয়সও তো হয়েছে।
বো : আপনার কথাগুলো এবং দি ইকনমিস্টের রিপোর্ট খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। দেখুন, ড. ইউনূস সাধারণ মানুষ নন। তিনি একজন সৃজনশীল মানুষ। আপনিও সাধারণ নেড়িকুকুর নন। আপনি একজন সৃজনশীল প্রাণী। সৃজনশীল মানুষ বা প্রাণীর কোনো রিটায়ারমেন্ট এইজ বা অবসর নেয়ার বয়স থাকে না। তারা যতোদিন পর্যন্ত সৃষ্টি করতে পারেন, কাজ করতে পারেন, ততোদিন পর্যন্তই নিজ পদে থাকতে পারেন। নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি নিজের গড়া প্রতিষ্ঠান শান্তিনিকেতন থেকে রিটায়ার করেছিলেন? করেননি। এখানেই গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি ইউনূসের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্য সব ব্যাংকের এমডিদের বিরাট তফাৎ।
নেড়িকুকুর : এসব যুক্তি কি এই বিচার বিভাগ মানবে? ১৬ জানুয়ারি ২০১১-তে আন্টি হিলারি তো বাংলাদেশের প্রধামনন্ত্রীকে বলেই দিয়েছিলেন, “বর্তমান সরকার যে বিচার বিভাগকে সাজিয়েছে সেটা সর্বজনবিদিত। আমেরিকা সেটা জেনে গেছে।” সুতরাং কোনো যুক্তি দেখিয়ে লাভ হবে না।
বো : দেখুন, ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার ঈর্ষার যে দুটি কারণ দি ইকনমিস্ট দিয়েছে, তা আংশিক বিশ্লেষণ মাত্র। ইকনমিস্ট বলেছে, শেখ হাসিনা ঈর্ষাপরায়ণ কারণ এক. তিনি নিজে নোবেল পুরস্কার চান এবং দুই. নোবেল প্রাপ্তির ফলে প্রধামন্ত্রীর পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের চেয়েও বেশি বিখ্যাত হয়ে যান ড. ইউনূস। এ ছাড়া আজকেই অ্যাটনি জেনারেল বলেছেন শান্তিতে নোবেল পাওয়া উচিত ছিলো সন্তু লারমা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। কিন্তু এটা পূর্ণ বিশ্লেষণ নয়।
নেড়িকুকুর : পূর্ণ বিশ্লেষণ কি তাহলে?
বো : ডিজিটাল বাংলাদেশ উপহার দেয়ার অঙ্গীকার করে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেছিলেন। কিন্তু গত দুই বছরে ব্যক্তিগত কয়েকটি এজেন্ডা পূরণ করা ছাড়া তিনি সফল হননি। ফলে জনতা যে এখন তার এবং তার দলের বিরুদ্ধে চলে গেছে সেটা শেখ হাসিনা বোঝেন। গতকাল ৭ মার্চে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের রেকর্ডটি রাজধানীর কোথাও আগের দুই বছরের মতো বাজতে শোনা যায়নি। এটাতেও বোঝা যায় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কতোটা নিóíমুখী। এই পরিস্খিতিতে বর্তমান এবং আর তিন বছর পরে বাংলাদেশে যে সাধারণ নির্বাচন হবে সে বিষয়ে আমার বস আর হিলারি-আন্টি ওয়াশিংটনে স্টেট ডিপার্টমেন্ট এবং ঢাকায় আমেরিকান দূতাবাসের মতামতের পাশাপাশি, আরেকটি নির্ভরযোগ্য মতামতের সোর্স রূপে ড. ইউনূসকে ব্যবহার করতে পারেন। ইউনূসের এই ইউনিক পজিশন তার সম্পর্কে শেখ হাসিনার দুশ্চিন্তার সবচেয়ে বড় কারণ। শেখ হাসিনা জানেন, যদিও ওয়াশিংটনে স্খায়ীভাবে থেকে তার ছেলে জয় সেখানে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন, তবুও সেটা আমেরিকান প্রশাসনের কাছে খুব গ্রহণযোগ্য হবে না। অন্য দিকে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী, হিলারিআন্টির সঙ্গে ড. ইউনূসের সম্পর্ক পারিবারিক এবং অনেক বছরের। আন্টির সঙ্গে ইউনূসের সম্পর্ক সরাসরি। অন্য কোনো দেশে ইউনূসের সমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মাপের কোনো ব্যক্তির সঙ্গে হিলারি আন্টির এমন সম্পর্ক নেই বলে মনে করেন শেখ হাসিনা। ইউনূসের এই অসাধারণত্বই ইউনূসের সমস্যার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। তাই আওয়ামী লীগের অবস্খান যতোই দুর্বল হবে, ইউনূসকে দেশ থেকে তাড়ানোর প্রচেষ্টা ততোই জোরালো হবে। আপনার তো কোনো রাজনৈতিক অভিলাষ নেই। নোবেল প্রাইজ পেলেও ইউনূসের মতো আপনার সমস্যা হবে কেন?
নেড়িকুকুর : তা নেই। আমি ইউনূসের মতো কোনো দল গঠনের ঘোষণা কখনওই দেইনি। তাছাড়া ওয়ান-ইলেভেনের পরে আমিই সর্বপ্রথম বলেছিলাম তিন উদ্দিন, ইয়াজউদ্দীন, ফখরুউদ্দিন, মঈনউদ্দিন মাইনাস হয়ে যাবেন এবং দুই নেত্রী প্লাস হয়ে যাবেন। পরবর্তীতে আমার ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছে। আমি নিজে কখনও প্লাস-মাইনাসের রাজনীতিতে যেতে চাইনি। যাইনি। কিন্তু তবুও সমস্যা হতে পারে।
বো : কেন?
নেড়িকুকুর : কারণ ঠিক গ্রামীণ ব্যাংকের মতোই আমার কুকুর ব্যাংকে সদস্যদের জমাকৃত সঞ্চয় এখন ৫,০০০ কোটি টাকা। আমাকে পদচ্যুত করে এই টাকাটা সরকার দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে।
বো : ইমপসিবল। অসম্ভব।
নেড়িকুকুর : না। সম্ভব। গতকালই দৈনিক ইত্তেফাকে খবর বেরিয়েছে, “গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করতে এবং সাধারণ মানুষকে মহাজন ও সুদখোরদের খপ্পর থেকে রক্ষার লক্ষ্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় মাথাপিছু সর্বোচ্চ ত্রিশ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।” অনেকের আশংকা গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ড. ইউনূসকে সরিয়ে দেয়ার পর এই ব্যাংকের তাবৎ টাকা আগামী নির্বাচনের আগে এভাবেই বিলি করা হতে পারে। আর এই আশংকা যদি সত্যে পরিণত হয় তাহলে সরকার পরবর্তী পদক্ষেপে আমাকে তাড়িয়ে কুকুর ব্যাংকের টাকাও তাদের দলের স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যবহার করবে। তখন কি হবে?
আমি কোথায় যাবো? মানুষ নির্বাসনে যেতে পারে এবং যায়। কোনো কুকুর কি কোনো দিন নির্বাসনে যেতে পেরেছে? তখন কি আপনি আমার ভিসার ব্যবস্খা করতে পারবেন?
বো : হুম। এদিকটা আমি ভেবে দেখিনি।
নেড়িকুকুর : বাংলাদেশে এখন এক ব্যক্তির বন্দনা, এক নেত্রীর শাসন এবং এক পরিবারের সুসময় চলছে। তারাই মুখ্য। আর সবাই গৌণ। মানুষের যখন এই অবস্খা তখন নেড়িকুকুরদের অবস্খা যে আরো কতো অসহায় সেটা বুঝে নিন। এ ছাড়া আমার অবস্খা আরো কৃটিকাল। কুকুর বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্খা, যাদের দায়িত্ব হলো দেশের সব কুকুরদের ওপর নজরদারি করা, তারা আমাকেও কোনো মামলায় ফেলে দেয়ার সুযোগ খুজছে।
বো : বুঝলাম। তাহলে আপনি নোবেল প্রাইজ চান না। কুকুর ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা এমডি পদেও থাকতে চান না।
নেড়িকুকুর : আগে চাইতাম। এখন আর নয়। ড. ইউনূসের অভিজ্ঞতা থেকে আমি বুঝতে পেরেছি, নোবেল প্রাইজ জীবনকে দেয় সুইডিশ ক্রোনার ও বিশ্ব খ্যাতি। কিন্তু নিজেরই গড়া প্রতিষ্ঠান থেকে পদচ্যুতকে দেয় কি? তাকে দেয় দাহ। যে আগুন আলো দেয় না অথচ দহন করে, সেই দীপ্তিহীন অগ্নির নির্দয় দহনে পলে পলে দগ্ধ হবেন আওয়ামী লীগ সম্পর্কে জ্ঞানহীন হতভাগ্য ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আমি নেড়িকুকুর। আমি জানি আওয়ামী লীগ কি জিনিস। আমি ড. ইউনূসের পরিণতি বরণ করতে চাই না। তাই আমি নোবেল প্রাইজ চাই না। কুকুর ব্যাংকেও থাকতে চাই না।

৮ মার্চ ২০১১

আমেরিকান কুকুর বিষয়ক তথ্যসূত্র :
লস এঞ্জেলেস টাইমস ২০.০৮.০৪ (কুকুর সংখ্যা)
মায়ামি হেরাল্ড ১৫.০১.০৩ (কুকুর বিষয়ক উইল)
ইউএসএ টুডে ১৫.০৩.৯৯ (কুকুরের জন্য ঝুকি)

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“ড. ইউনুসকে সরানোর আসল কারণ : শফিক রেহমানের কলাম” লেখাটিতে একটি মন্তব্য

  1. IKBAL AHMAD SIDDIQUE বলেছেন:

    ER JONNO HASINAR PORINAM KUBI KHARAP HOBE…JUST WAIT KOTO KICHU KORTESE NARI NAMER EI KOLONKINI.

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন