এইডস প্রতিরোধে করণীয়

এইডস সম্পর্কে সবচেয়ে ভয়ংকর যে তথ্যটি আমরা এখন পর্যন্ত পাই তা হলো এইডসে আক্রান্ত রোগীকে সুস্থ করার জন্য কোন কার্যকরী ওষুধ এখনো উদ্ভাবন করা সম্ভব হয় নি। “হার্রট” অর্থাৎ Highly active antiretroviral therapy (HAART) নামক এক ধরণের কম্বিনেশন ওষুধ রয়েছে এইডসের চিকিৎসার জন্য যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এ ওষুধ এইডস রোগীকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না বরং মৃত্যুকে কিছুদিনের জন্য বিলম্বিত করতে পারে মাত্র। যেহেতু এইডসের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং চিকিৎসায় পুরোপুরি আরোগ্যলাভ অসম্ভব তাই এইডস প্রতিকারের চেয়ে এইচআইভি অনুপ্রবেশ অর্থাৎ এইডস প্রতিরোধই কার্যকর উপায়। তবে হতাশার কথা এই যে, এইডস প্রতিরোধের জন্য ব্যাপক গবেষণা চললেও এর প্রতিরোধের জন্য কোন টীকা বা প্রতিষেধক আবিস্কারে অগ্রগতি ঘটে নি এবং খুব সহসাই এইডস প্রতিরোধক টীকা আবিস্কার হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। তাই এইচআইভি সংক্রমিত করে এমন সব মাধ্যমগুলো সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরী।

কনডম শতভাগ নিরাপদ নয়
এইডস সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রচার মাধ্যমে কনডমের ব্যবহারকে উৎসাহিত করার জন্য চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। অথচ এইডস প্রতিরোধে কনডম শতভাগ কার্যকরী পন্থা নয়,  এমনকি কনডম জন্মনিয়ন্ত্রনেও শতভাগ সফল নয়। তাই কনডমের কার্যকারীতা সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রদানের জন্য খোদ আমেরিকাতেই  জোড় তৎপরতা শুরু হয়েছে।

এইডস প্রতিরোধে সংযত যৌনাচার
যৌনস্পৃহা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। বংশবিস্তারের জন্য তথা মানবজাতির ধারা অব্যাহত রাখতে যৌনমিলনের কোন বিকল্প নেই। আর এ জন্যই মানুষ বিয়ে করে, গড়ে তোলে সমাজের ভিত্তিমূল তথা পরিবার। স্বামী-স্ত্রীর যৌনমিলনে ঘর আলোকিত করে আসে নতুন প্রজন্ম এবং তাকে স্থান ছেড়ে দিয়ে পৃথিবী থেকে এক সময় বিদায় নেয় পূর্বসূরীরা। এভাবেই ক্রমান্বয়ে মানবজাতি অব্যাহতভাবে টিকিয়ে রেখেছে তার অস্তিত্ব।

কিন্তু পরিবার প্রথার বাইরে অবাধ যৌনাচার একদিকে যেমন পরিবারকে করে তোলে অশান্ত, সমাজকে করে কলুষিত তেমনি ভয়াবহতম আপদ তথা এইডসের বিস্তার ঘটিয়ে অপরাধী-নিরপরাধ এমনকি নিষ্পাপ শিশুদের পর্যন্ত মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেয়, মানবজাতির অস্তিত্বকে করে হুমকির সম্মুখীন। একজন অনৈতিক যৌনাচারী এইডসের বীজানু বহণ করে রোপন করে স্ত্রী/স্বামীর শরীরে, স্ত্রীর শরীর থেকে তা চলে যায় গর্ভস্থ সন্তানের শরীরে। অথচ স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের প্রতি বিশ্বস্ত থাকলে খুব সহজেই এইডসের ভয়াবহতা থেকে মুক্ত থাকা যায়।

ব্যভিচার এইডসের প্রধান বাহক
ইসলাম যৌনতাকে অস্বীকার করে না বরং নির্ধারিত সীমার মাঝে যৌনাচারকে ইসলাম ইবাদত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অবাধ যৌনাচার বা ব্যভিচারকে ইসলাম কখনো অনুমোদন করে না এমনকি ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এমন বিষয়গুলোকে থেকেও বেঁচে থাকতে ইসলাম নির্দেশ দেয়।

আর ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ। -সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত ৩২

ব্যভিচারকে ইসলাম এতটাই অভিষপ্ত কাজ বলে সাব্যস্ত করেছে যে আল্লাহ ব্যভিচারী/ব্যভিচারীনীর জন্য কঠোরতম শাস্তি এবং তা জনসম্মুখে বাস্তবায়নের বিধান করেছেন।

ব্যভিচারিনী নারী, ব্যভিচারী পুরষ, তাদের প্রত্যেককে একশ করে বেত্রাঘাত কর।আল্লাহর বিধান কার্যকর কারণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের দয়ার উদ্রেগ না হয়, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। সূরা আন-নূর ২

শুধু তাই নয় ব্যভিচারী/ব্যভিচারীনীর সাথে মুমিনদের বিয়েকেও আল্লাহ নিষিদ্ধ করেছেন:

ব্যভিচারী পুরষ কেবল ব্যভিচারী নারী অথবা মুশরিক নারীকেই বিয়ে করে এবং ব্যভিচারীনীকে কেবল ব্যভিচারী অথবা মুশরিক পুরুষই বিয়ে করে এবং এদেরকে মুমিনদের জন্য হারাম করা হয়েছে। সূরা আন-নূর ৩

সমকামিতা নিকৃষ্টতম যৌনাচার]
সমকামিতা প্রকৃতি ও নৈতিকতা বিরুদ্ধ নিকৃষ্টতম যৌনাচার। এইডসসহ যাবতীয় যৌনরোগ সংক্রমনের অন্যতম ঘৃণ্য মাধ্যম সমকামিতা। জানামতে কোন ধর্মই সমকামিতাকে বৈধ মনে করে না এবং ইসলাম সমকামিতার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর মনোভাব পোষণ করে। সমকামিতার আল্লাহর কাছে এতটাই ঘৃণ্য আচরণ যে এ অন্যায় আচরণের জন্য তিনি হয়রত লুত (সাঃ) -এর সভ্যতাকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সমকামিতাকে নিষিদ্ধ করে বলেন:

এবং আমি লূতকে প্রেরণ করেছি। যখন সে স্বীয় সম্প্রদায়কে বলল: তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের পূর্বে সারাবিশ্বের কেউ করেনি? তোমরা তো কামবশত: পুরুষদের কাছে গমন কর নারীদেরকে ছেড়ে। বরং তোমরা সীমা অতিক্রম করছ। সূরা আল-আ’রাফ ৮০-৮১

সারা জাহানের মানুষের মধ্যে তোমরাই কি পুরুণদের সাথে কুকর্ম কর? এবং তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের যে স্ত্রীগণকে সৃষ্টি করেছেন, তাদেরকে বর্জন কর? বরং তোমরা সীমা লংঘনকারী সম্প্রদায়। সূরা আশ শো’আরা ১৬৫-১৬৬

শুধু তাই নয় যৌনআবেগের সাথে পুরুষের সাথে পুরুষের কিংবা নারীর সাথে নারীর আলিঙ্গণকেও ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে এবং একে ব্যভিচার হিসেবে সাব্যস্ত করেছে।

রাসূল (সাঃ) বলেন, যৌন আবেগের সাথে নারীদের পারস্পরিক আলিঙ্গনও ব্যভিচারের পর্যায়ভুক্ত -তাবারানী

স্ত্রীর মলদ্বারে সঙ্গমও হারাম
ইসলামে স্বামী-স্ত্রীকে একে অপরের পরিচ্ছদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ স্বামী এবং স্ত্রীর মাঝে যৌনাচারের ক্ষেত্রে অবাধ স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর অবাধ মেলামেশার পরেও কয়েকটি ক্ষেত্রে বিধি নিষেধ বেঁধে দেয়া হয়েছে। ঋতুকালীন সময়ে স্ত্রী সহবাসকে ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে।

আর তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে ঋতু সম্পর্কে। বলে দাও, এটা অশুচি। কাজেই তোমরা ঋতুঅবস্থায় স্ত্রীগমন থেকে বিরত থাক। সূরা বাক্বারা -২২২

শুধু তাই নয়, সমকামিতা যেমন ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে ঠিক তেমনি স্ত্রীর মলদ্বারেও সংগমকে ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

এ প্রসঙ্গে রাসূল (সাঃ) বলেন, যে লোক সমকাম কিংবা মহিলাদের মলদ্বার দিয়ে যৌন সঙ্গম করবে, আল্লাহ পাক তার দিকে ফিরেও তাকাবেন না-তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে হেববান।

সর্বপ্রকার অশ্লীলতাই মূলত অবাধ যৌনাচারকে উস্কে দেয়। এক্ষেত্রে অবাধ যৌনাচার প্রতিরোধে যাবতীয় অশ্লীলতাই পরিহার করা উচিত। আর শয়তান (কিংবা আমাদের প্রবৃত্তি) সব সময় আমাদেরকে অশ্লীলতার দিকে ধাবিত করতে চায়। তাই অশ্লীলতা প্রতিরোধে রাসূল (সাঃ) -এর পরামর্শ হলো নিভৃতে একাকী কোন স্ত্রী/পুরুষের সাথে অবস্থান না করা। তিনি বলেন:

কোন পুরুষ যখন কোন মহিলার সাথে নিভৃতে অবস্থান করে, শয়তান তখন তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে সেখানে অবস্থান নেয়” -তিরমিযী, তাবারানী।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য নেয়া হবে না।