এইডস কি, বাঁচতে হলে জানতে হবে

এই মুহূর্তে পৃথিবী সবচেয়ে বড় যে বিপদটির মোকাবেলা করছে তা হলো এইডস। বাংলাদেশে এ রোগটি এখনও মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে নি এ কথা হয়তো সত্যি কিন্তু বিশ্বের ৬ষ্ঠ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এইডস নামক আগ্নেয়গিরির একেবারে ঠিক জ্বালামুখেই যে অবস্থান করছে সে সম্পর্কে সচেতনরা নিশ্চয়ই একমত হবেন। এইডসের ভয়াবহতা এতই ব্যাপক যে অনেকে তা মুখেও উচ্চারণ করতে চান না, পাছে সাধারণ লোক এইডসের ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে। কিন্তু দেশের মানুষকে এইডস থেকে রক্ষা করতে হলে এইডস যে একটি মরণব্যধি তা সবাইকে জানানোর কোন বিকল্প নেই। এইডসের ভয়াবহতা সম্পর্কে জেনে হয়তো সহজ সরল সাধারণ মানুষের হাসিখুশি মুখগুলো আতঙ্কে নীল হয়ে যাবে তবুও সত্যকে চাপা দিয়ে রাখার কোন যুক্তি নেই। সত্যিকারের বিপদ আসার আগেই যদি সবার ভয় ভাঙ্গানো যায়, ভয়ংকর বিপদ সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করা যায়, সবাইকে নিয়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় তাহলে হয়তো এইডসের ভয়াল ছোবল থেকে দেশ ও দেশের মানুষ বেঁচে যাবে।

এইডস কি?
AIDS বা Aids এর পূর্ণ অভিব্যক্তি হলো Acquired immunodeficiency syndrome বা acquired immune deficiency syndrome । এইডস হলো এক ধরণের ব্যধি, যাকে মরণব্যধিও বলা হয়। Human immunodeficiency virus বা HIV নামক ভাইরাস এই রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী। HIV এমনই ভয়ংকর জাতের ভাইরাস যে এ ভাইরাস মানুষের শরীরে অনুপ্রেবশ করার সুযোগ পেলে ধীরে ধীরে মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়। ফলে HIV আক্রান্ত রোগী যে কোন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে এবং সংক্রামক রোগটি তাকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।

HIV পজিটিভ মানেই এইডস নয়:
HIV অনুপ্রবেশ করলেই মানুষের মৃত্যু ঘটে না কিংবা HIV শরীরে থাকলেই এইডস আক্রান্ত বলা যায় না। তবে HIV একবার শরীরে অনুপ্রবেশ করলে এইডস হবে এটা ধরে নেয়া যায়। মূলত: HIV অনুপ্রবেশের পর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পেতে শুরু করলেই এইডস হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়। এইডসে আক্রান্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত একজন মানুষ এইচআইভি ভাইরাস নিয়েও সুস্থ জীবন যাপন করতে পারেন। HIV অনুপ্রবেশের পর এইডসের পর্যায়ে পৌঁছতে গড়ে প্রায় দশ বছর সময় লেগে যায়। তবে “হার্রট“ অর্থাৎ Highly active antiretroviral therapy (HAART) নামক ব্যয়বহুল একধরণের কম্বিনেশন ঔষধ দ্বারা HIV বহনকারীর এইডসের পর্যায়ে পৌছানোকে আরো কিছুটা বিলম্বিত করতে পারে। তাই এইডসের হাত থেকে রক্ষা পেতে চিকিৎসা নয় বরং শরীরে HIV-এর অনুপ্রবেশকেই প্রতিরোধ করতে হবে।

HIV যেভাবে ছড়ায়:
HIV বহনকারী কোন ব্যক্তির শরীর থেকে অন্য কোন ব্যক্তির শরীরে HIV প্রবেশ করালেই কেবল HIV ছড়াতে পারে। সামাজিক মেলামেশা, ওঠাবসা ইত্যাদি মাধ্যমে HIV ছড়ানোর কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নি বরং HIV বহনকারী ব্যক্তির শরীর থেকে ক্ষরিত তরল যদি কোন ব্যক্তির শরীরের উন্মুক্ত বা কাটাছেড়া ত্বকে পড়ে তবে তার মাধ্যমে HIV অনুপ্রবেশ করতে পারে।
HIV বহনকারী ব্যক্তির শরীর থেকে অন্য স্বাভাবিক কোন ব্যক্তির শরীরে HIV প্রবেশের কয়েকটি মাধ্যম রয়েছে:
১। HIV বহণকারী ব্যক্তির সাথে অরক্ষিত অবস্থায় স্ত্রী যোনী বা মলদ্বার বা মুখে যৌন সম্ভোগ করলে।
২। HIV বহনকারী ব্যক্তির শরীরের রক্ত অন্য কোন শরীরে প্রবেশ করালে।
৩। HIV বহনকারী ব্যক্তির ইনজেকশনের সিরিঞ্জ যা এইচআইভি বহণ করছে তা ব্যবহার করলে।
৪। HIV বহনকারী মা যখন সন্তান সম্ভবা হন অথবা সন্তান জন্মদানের সময়ে অথবা সন্তানকে দুধ পান করানোর মাধ্যমে শিশুর শরীরে HIV অনুপ্রবেশ করতে পারে।
৫। HIV বহনকারী কোন ব্যক্তির ব্যবহৃত কোন জিনিসপত্রে যদি সংক্রামক রক্ত লেগে থাকে এবং তা ব্যবহারের ফলে যদি শরীরের উন্মুক্ত বা কাটাছেড়া ত্বকের সংস্পর্শে আসে।

এইডস একটি মরণব্যাধি হওয়ায় এ সম্পর্কে মানুষের রয়েছে ব্যাপক ভীতি তেমনি রয়েছে অজ্ঞতা। আর এ অজ্ঞতার ফলে এইচআইভি বহণকারী ব্যক্তি বা এইডস আক্রান্ত রোগীকে সামাজিকভাবে অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করতে হয়। এইডস সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে এবং অযৌক্তিক ঘৃণার কারণে নির্মমভাবে জীবন দিতে হয়েছে অনেক এইডস রোগীকে। এইচআইভি বহনকারী ব্যক্তির সাথে অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক মেলামেশা ওঠাবসা করা হয় না, এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে পাশবিক অত্যাচার চালিয়ে বা গায়ে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করার ঘটনাও ঘটেছে অতীতে। কিন্তু এইচআইভি বহনকারী ব্যক্তি বা এইডসের কোন রোগী কাউকে ছুয়ে দিলেই কি এইচআইভি সংক্রমিত হয়? না, এইচআইভি ছোঁয়াচে নয় এবং শুধুমাত্র স্পর্শের মাধ্যমেই এইচআইভি এক শরীর থেকে অন্য শরীরে স্থানান্তরিত হতে পারে না।

সামাজিক মেলামেশায় এইচআইভি ছড়ায় না
এইচআইভি বহনকারী ব্যক্তি অন্য সাধারণ ব্যক্তিদের মতোই স্বাভাবিক আচরণ প্রত্যাশা করতে পারে। এইচআইভি বহনকারী ব্যক্তির সাথে যে সকল সম্পর্ক করলে এইচআইভি সংক্রমিত হতে পারে না তা হলো:
১। এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি কারো শরীরের উপর হাঁচি, কাশি দিলে, চোখের জল,
থুথু, ঘাম ফেললে, নাক ঝাড়লে,
২। হ্যান্ডশেক, কোলাকুলি, স্পর্শ, চুমু কিংবা কথা বললে।
৩। একই পুকুর, গোছলখানা, পায়খানা, তোয়ালে, লুঙ্গি, গামছা ব্যবহার করলে।
৪। একই থালা-বাসন, কাপ-পিরিচ, তৈজসপত্র ব্যবহার করলে।
৫। একই আসবাবপত্র ব্যবহার করলে।
৬। এইচআইভি বহনকারী ব্যক্তির রান্না করা খাবার খেলে।
৭। মশা,মাছি বা পোকামাকর কিংবা পশুর কামড়ে।
৮। একই বিছানা ব্যবহার করলে, একই বাড়ীতে অবস্থান করলে।
৯। একই টেলিফোন, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি ব্যবহার করলে।
১০। এইচআইভি মুক্ত সিরিঞ্জ ব্যবহার করে রক্তদান করলে।

চুমু দিলে কি এইচআইভি ছড়ায়?
এইচআইভিতে স্নেহ পদার্থের আবরণ envelop থাকায় এইচআইভি অত্যন্ত ভঙ্গুর ফলে এরা শরীরের বাইরে বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারে না। শরীরের অধিকাংশ ক্ষরিত তরলেই এইচআইভি থাকে কিন্তু এর আয়ুষ্কার কম হওয়ায় রক্ত বা যৌন মিলনের মাধ্যমে সরাসরি শরীরে প্রবেশ করতে না পারলে এইচআইভি সংক্রমনের তেমন আশংকা নেই। তাই এইচআইভি বহনকারী রোগীকে চুমুও দেয়া যায়। তবে চুমু দেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী। বিশেষ করে ফ্রেন্স কিস বা Deep Kissing পরিহার করা উচিত। যদিও ফ্রেঞ্চ কিসিং-এর মাধ্যমে এইচআইভি ছড়ানোর তেমন রেকর্ড নেই তার পরও যেহেতু শরীরের অধিকাংশ তরল ক্ষরণেই এইচআইভি থাকে তাই এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির মুখে যদি কোন কাটা-ছেড়া, ঘা বা ক্ষত থাকে তবে তা বিপদ ডেকে আনতে পারে। আর উভয়েরই যদি মুখে কাটা-ছেড়া, ঘা বা ক্ষত থাকে তবে বিপদের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। তাই এইচআইভি বহণকারী ব্যক্তিকে যদিও চুমু দেয়া যায় তবুও ফ্রেঞ্চ কিস দেয়া থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“এইডস কি, বাঁচতে হলে জানতে হবে” লেখাটিতে একটি মন্তব্য

  1. রাহাত বলেছেন:

    খুবই গুরুত্ব পূর্ণ বিষয়…কিন্তু আপসোস আমারা এখন সচেতন হয় নি…তবে এই বিষয় নিয়ে আরো অনেক কিছু লিখতে হবে, জানাতে হবে…তবে আপনার উদ্দেগ টা ভাল…চালিয়ে যান।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন