বাংলাদেশের সমস্যা কি?

বাংলাদেশের সবচেয়ে ভয়ংকর বিপদ কোনটি এ প্রশ্ন করলে উত্তর পাওয়া যাবে একাধিক। এদেশের যে নাগরিক ব্যক্তিগতভাবে যে সমস্যায় পড়ে সেটাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। যিনি একানব্বইয়ের ঘূর্ণিঝড়ে স্বজন হারিয়েছেন তার কাছে প্রাকৃতিক দূর্যোগটাই সবচেয়ে বড়, রাজনৈতিক অবোধ শিশুদের খেলতামাশার শিকার হয়ে যে মা তার আদরের সন্তান হারিয়েছেন তার কাছে রাজনীতিই দেশের প্রধান সমস্যা। এভাবে সন্ত্রাস, মাদক, সড়কদূর্ঘটনাসহ বিভিন্ন ঘটনার শিকার হয়েছেন যারা, তাদের কাছে তাই প্রধান সমস্যা হয়ে সিন্দাবাদের ভুতের মতো ঘাড়ে চেপে বসেছে।

বাংলাদেশের মানুষের দৃষ্টিশক্তি কম কিনা জানি না, তবে বর্তমান সমস্যার চেয়ে ভবিষ্যতের বড় কোন সমস্যা নিয়ে মাথা খুব একটা আমরা ঘামাই না। গণতান্ত্রিক দেশ হওয়ায় এখানে কোন সরকারই দীর্ঘমেয়াদী কোন প্রকল্প হাতে নিতে চায় না, কারন জনগণ বর্তমানটাকে সুন্দর দেখতে চায়, বর্তমান সমস্যা তা যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন এদেশবাসীর কাছে সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাই বর্তমানটাকে নিষ্কন্টক করতে, বতর্মানটাকে সাজাতেই চলে যায় পাঁচটি বছর। তাই ভবিষ্যৎ ভয়ংকর সমস্যা নিয়ে চিন্তা করার কিংবা চিন্তা করলেও তা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়ে ওঠে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া আমার শ্যালিকা সেদিন প্রশ্ন করে বসলো, আচ্ছা দুলাভাই, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা কোনটি বলে আপনি মনে করেন?
আমি রাজনীতিবিদ নই, বুদ্ধিজীবি শ্রেণীর সাথেও ওঠাবসা নেই, আর জ্ঞান দেবার ন্যূনতম যোগ্যতা শিক্ষকতার সাথেও আমি জড়িত নই। তবুও দেশের একজন সাধারণ সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার মনে হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা দুটি।
এক: বেকারত্ব
দুই: দূর্নীতি।

শ্যালিকার প্রশ্ন: তাহলে সন্ত্রাসকে কি আপনি সমস্যা মনে করেন না?

আমি ওকে আস্বস্ত করি, সন্ত্রাস অবশ্যই দেশের জন্য একটি বড় সমস্যা। তবে এটি কোন মৌলিক সমস্যা নয়, বেকারত্ব এবং দূর্নীতির বাই-প্রডাক্ট মাত্র। বেকারত্ব এবং দূর্ণীতির আরো যেসকল বাই-প্রডাক্ট রয়েছে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সমস্যা হলো মাদক এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা। একটি সমাজে যদি বেকারত্ব সমস্যার সমাধান না হয় এবং সমাজের উচুস্তরের নেতৃবৃন্দরা যদি দূর্ণীতিগ্রস্থ হয় তবে অবশ্যই সে সমাজের তরুন সমাজ বেকারত্বের অভিষাপ ঘোচাতে দূর্নীতিবাজদের পরিকল্পিত ছকে পা দিয়ে সন্ত্রাস ও মাদকের পথে পা বাড়াবেই। যে সমাজের একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জনসংখ্যা বেকার থাকে সেসমাজের দূর্ণীতিবাজ রাজৈনিতক নেতৃবৃন্দ বেকার যুবকদের সুন্দর ভবিষ্যতের মুলো ঝুলিয়ে নিশ্চিতভাবে অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে হাকিয়ে নিয়ে যাবে।

একটি অধ্ব:পতিত সমাজের জন্য অবশ্যম্ভাবী উপায় উপকরণের সবগুলোই বাংলাদেশে বর্তমান রয়েছে। আশার কথা এই স্বল্প মূল্যের শ্রমবাজারের কারণে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই তৈরীপোষাক শিল্পে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে এবং দেশের বেকারত্বের একটি বড় অংশকেই কর্মসংস্থানের আওতায় নিয়ে আসতে পেরেছে।

কিন্তু এখনো যে বিশাল জনগোষ্ঠী বেকারত্বের অভিষাপ নিয়ে সমাজের বোঝা হয়ে রয়েছে তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পারলে এর ভয়ংকর পরিণতি থেকে কিছুতেই দেশ রক্ষা পাবে না। দেশের ভয়ংকর ভবিষ্যতের কিছু নমুনা গত কয়েক দিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখে সহজেই অনুমান করা যায়।

দেশে জনতার দাবী আদায়ের নামে এখন চলছে তুমুল আন্দোলন। নাগিনের বিষাক্ত ছোঁবলে একের পর এক ঝড়ে যাচ্ছে একেকটা অমূল্য জীবন। অথচ কি আশ্চর্য, যারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে তারা কিন্তু সত্যিই জানে না কি তাদের অপরাধ কিংবা যারা আন্দোলন সফল করতে বা আন্দোলনকারীদের দমনে জীবন দিচ্ছেন তারা কিন্তু জানেন না কি জন্য তারা জীবন দিচ্ছেন। গতকাল যে যুবক প্রাণ দিয়েছে কাওরান বাজারে তাকে যদি জিজ্ঞেস করা যেত যে কি জন্য সে জীবন দিয়েছে, হয়তো সেও বলতে পারবে না তার জীবনদানের আসল রহস্য।

সিইসি কি কিংবা সিইসি পরিবর্তন হলে কি লাভ, আওয়ামী লীগকে কেন ক্ষমতায় যেতেই হবে, বিএনপি ক্ষমতায় না যেতে পারলে দেশের কি ক্ষতি বৃদ্ধি হবে এ সম্পর্কে আসলেই কি সাধারণ জনগণ সচেতন? মোটেই নয়। দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর বিশাল বিশাল মহাসমাবেশ দেশে হয়তো অনেকেই আমার কথাটাকে হেসে উড়িয়ে দেবেন কিন্তু বাস্তবতা এই যে দেশে বেকারত্বের অভিযাপই দূর্ণীতিনির্ভর রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য শাপে বর হয়ে ধরা দিয়েছে। বিশাল বেকার জনগোষ্ঠীকে মূলত অলীক সোনালী স্বপ্নে বিভোর করে রাজনৈতিক দলগুলো মরণখেলায় মেতে উঠেছে। কিংবা বলা যায় বেকারত্বের অভিষাপে ভার বইতে অপারগ তরুণরা সমাজের নিজের জীবন ও সমাজের প্রতি বিতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে আর তাই সমাজটাকে গুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে, সমাজে যারা প্রতিষ্ঠিত তাদের জীবনটাকে ত্যক্ত-বিরক্ত করে তুলতে এবং সর্বোপরি নিজেদেরকে তীলে তীলে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতেই তাই তারা রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতারোহণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

আমাদের সমাজটাকে বাঁচাতে হবে। অনেক ত্যাগ ও কোরবানীর ফসল সোনার বাংলাদেশকে অন্ধকার আর অনিশ্চয়তার হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। কি ভাবে করতে হবে তা আমার জানা নেই, তবে দেশের প্রধান সমস্যা বেকারত্ব আর দূর্ণীতিকে যে করেই হোক নির্মূল করতে পারলেই যে তা সম্ভব সে ব্যাপারে আমি আশাবাদী। স্বার্থান্বেষী মহল আর আকন্ঠ দূর্ণীতিতে নিমজ্জিত রাজনৈতিক নেতারা দেশকে কিছুতেই স্বনির্ভর হতে দেবে না, যুবসমাজের বেকারত্বের অভিষাপ কিছুতেই ওরা দূর করবে না। কিন্তু যারা দেশের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, যারা চাঁদা আর ঘুষ দিয়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে পুষছেন, যারা দেশের অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দিয়েছেন তৈরী পোষাকশিল্পসহ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী বিভিন্ন সেক্টর, এদেশ থেকে বেকারত্বের অভিষাপ ঘোচাতে তারা এগিয়ে আসবেন, নিজেদের অর্থসাগরকে মহাসমুদ্রে পরিণত করার স্বাথেই না হয় এগিয়ে আসবেন, এই কামনা করি।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য নেয়া হবে না।