গণতন্ত্র

Democracy is a Government by the cattle, of the cattle and for the cattle

কোন এক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর বইয়ে গণতন্ত্রের এ সংজ্ঞা পড়েছিলাম, লেখকের নামটা আজ আর মনে পড়ছে না। তবে গণতন্ত্র চর্চার নামে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক বুনো ষাড়ের লড়াই চলছে তাতে গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটিকে যথার্থ বলেই মনে হয়।

গণতন্ত্র কি? এ প্রশ্ন যদি করা হয় সাধারণ জনতার কাছে, আমি নিশ্চিত, ৯৯% জনতাই সঠিক জবাব দিতে পারবে না। গণতন্ত্র মুক্তি পাক আর গোল্লায় যাক তাতে তাদের কি আসে যায় তা তারা জানে না, তারা একটা বিষয়ই জানে, নিরঙ্কুশ আনুগত্য (ইচ্চেয় বা বাধ্যহয়ে)।

আমার এলাকার এক রাজনৈতিক নেতার সাথে গণতন্ত্র নিয়ে আলোচনার সময় গণতন্ত্রের দুএকটা খুঁত তুলে ধরায় তিনি এতটাই অগ্নিশর্মা হয়ে যান যে আমার মনে হয় তিনি আমাকে বোধহয় ছিড়েই ফেলবেন। সে ক্ষমতাও তার আছে তবে ছুঁচো মেরে হাত নষ্ট হবে ভেবেই বোধহয় সে যাত্রায় আমি রক্ষা পাই। আসলে সবার ধারণা গণতন্ত্র হচ্ছে শিল্পীর নিপুঁন হাতে যত্নে গড়া কোন মূর্তি, নেই কোন খুঁত কিংবা কোন অসংলগ্নতা। কিন্তু বাস্তবে গণতন্ত্র আদৌ তা নয়।

হ্যা, এটা স্বীকার করছি যে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত মতবাদগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র অপেক্ষাকৃত বেশি সফল, জনপ্রিয় এবং মানবতাবন্ধব। বিশেষ করে থিউরী হিসেবে গণতন্ত্রের জুড়ি মেলা ভার। অবশ্য থিউরী হিসেবে অন্যান্য মতবাদগুলোও অসাধারণ। তবে সমস্যা দেখা দেয় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের দিকে তাকালেই সহজে অনুমান করা যায় তত্ত্ব আর বাস্তবতার মাঝে কত ফারাক।

গণতন্ত্র তো এমনই যে গণতন্ত্রের খুঁত নিয়ে আলোচনারও সুযোগ থাকবে এখানে। কিন্তু বাস্তবে আমাদের দেশে গণতন্ত্রের চর্চার স্বরূপ দেখে খোদ আব্রাহাম লিঙ্কনেরও পিলে চমকে ওঠার কথা। এখানেই নেই কোন বাক স্বাধীনতা, যা বলার জনগণের নেতা হিসেবে কিছু সংখ্যক লোকই তা বলে যায়, হোক তা জনতার জন্য ক্ষতিকর বা ধ্বংসাত্মক। অথচ জনগণ যাদেরকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে ভোট দেয়, তাদের নেতা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত করে তাদেরকে কথা বলার সুযোগ দেয় হয় না কিংবা কথা বলতে দেয় না এসকল স্বঘোষিত নেতারা।

গণতন্ত্রে জনগণের আশা আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটার কথা অথচ এখানে ঘটে তার উল্টো। প্রতিনিধিত্বশীল গণতান্ত্রিক সরকারে জনগণ নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য সরকার গঠন করে, প্রতিনিধিরা তাদের কথা বলে সংসদে, তাদের আশা আকাঙ্কার বাস্তবায়ন ঘটায় এবং জনকল্যাণমূলক আইন প্রণয়ন করে জনতার শাসন কায়েম করে। এ কাজে যদি জনতার প্রতিনিধিরা ব্যর্থ হয় তবে জনতা আবার পরবর্তী নির্বাচনে নতুন প্রতিনিধি নির্বাচন করে।

কিন্তু বাংলাদেশে গণতন্ত্রে নির্বাচন কোন মূখ্য বিষয় নয়। এখানে পেশি শক্তিই গণতন্ত্রের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। এক দল প্রতিনিধিদের জনগণ সরকার গঠনের অধিকার দিলে পরাজিত প্রার্থীরা বিজয়ীদের টেনে হেচড়ে নামানোর জন্য আদাজল খেয়ে মাঠে নামে, এক্ষেত্রে তারা একবারও ভাবে না যে ওরা জনগণ দ্বারাই নির্বাচিত, জনগণই ওদের না চাইলে পরবর্তীতে ওরা আর ক্ষমতায় আসবে না। বরং এখানে কিছু লোক জনগণের চাওয়া পাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। এদেশে স্বাধীনভাবে কোন কিছু করার বা স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেয়ার কোন অধিকার জনগণের নেই বরং এক একটা পেশীশক্তি জনগণ কি স্বপ্ন দেখবে না দেখবে, কি চাইবে না চাইবে, কি করবে না করবে তা নিয়ন্ত্রনের চেষ্টায় তৎপর।

বলা হয় জনগনই সকল ক্ষমতার উৎস, কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতা থাকে কিছু সংখ্যক নেতা-নেত্রীর হাতে, যারা প্রতিনিয়ত জনগণকে প্রতারিত করে, গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে গলা ফাটায় অথচ প্রকৃতপক্ষে এরাই গণতন্ত্রকে গলাটিপে হত্যা করে।

বাংলাদেশে প্রধান দুটো রাজনৈতিক দলের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের আসল চিত্র। কোন দলের অভ্যন্তরেই গণতন্ত্রের চর্চা নেই, আছে পরিবারতন্ত্র (অথবা রাজতন্ত্র), আছে একনায়কতন্ত্র। নিয়মিত নির্বাচনের বালাই নেই দলগুলোর ভেতরে, ফলে সহজেই অনুমান করা যায় যে এরা আসলে গণতন্ত্রের মন্ত্রজপলেও আসলে এরা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নয় বরং গণতন্ত্রে কফিনে পেরেক ঠোকাই এদের নেশা।

অথচ যে দলটি গণতন্ত্র নয় বরং ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে কাজ করে যাচ্ছে সেই জামায়াতে ইসলামী কিন্তু তাদের দলের প্রতিটি কর্মকান্ডে গণতন্ত্রের প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। জামায়াতের দলীয় নির্বাচন পদ্ধতি এতটাই গণতান্ত্রিক এবং নিয়মতান্ত্রিক যে তা গণতান্ত্রিক দল বলে দাবীদার আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা জাতীয় পার্টির জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে।

আসলে বাংলাদেশের জন্য গণতন্ত্র আদৌ প্রয়োজনীয় বিষয় কি না তা এখন ভেবে দেখার সময় হয়েছে। এদেশের- জন্য যদি গণতন্ত্র আসলেই প্রয়োজনীয় হয়ে থাকে এবং এদেশের দলগুলোর যদি সত্যিই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতি সদিচ্ছা থেকেই থাকে তবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সকল ক্ষমতার উৎস বলে পরিচিত জনগণকেই দায়িত্ব দেয়া উচিত তাদের কাঙ্খিত সরকার বেছে নেয়ার। আর গণতন্ত্রের চেয়ে পেশীতন্ত্রই যদি বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সঠিক সরকার পদ্ধতি বলে মনে হয়, কিংবা বাংলাদেশের জনতা অবোধ শিশুর মতো সহজ সরল, ন্যায় অন্যায় বুঝার ক্ষমতা তাদের বিধাতা এখনো দেয় নি, যা কিছু জ্ঞান-বুদ্ধি তা শুধুমাত্র রাজনৈতিক নেতাদের মাথায়ই বিধাতা ঢেলে দিয়েছেন বলে মনে করে থাকে তবে তাও পরিস্কার হওয়া উচিত। আমরা সাদাকে সাদা দেখতে চাই, কালোকে কালো। একের পর এক গণবিধ্বংসী সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়ে, জনগণের জান-মাল-ইজ্জতের উপর হামলা করে, দেশের রুগ্ন অর্থনীতিকে গলাটিপে হত্যা করে গণগন্ত্রের নামে চালিয়ে দেয়া কিছুতেই আমরা সাধারণ জনগণ মেনে নেব না।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“গণতন্ত্র” লেখাটিতে 2 টি মন্তব্য

  1. আরাফাত রহমান বলেছেন:

    keep it up.

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    ধন্যবাদ।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন