তথ্য সন্ত্রাস ও বর্বরতার শিকার ইসলামী আন্দোলন

২৮ অক্টোবর ২০০৬। পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের ছুটির পরে প্রথম অফিস। পুরো অফিস জুড়ে ছুটির আমেজ। কোলাকুলি, গালাগালি (গালে গালে যে মিলন), কুশল বিনিময় করেই অফিস শেষ করে দুপুরে বেড়িয়ে পড়ি। অফিসের অবসরে [email protected]@!162202 [email protected]@!162203 নামে একটা ব্লগ পোস্ট করেছিলাম, রাজনৈতিক ময়দান যে কতটা উত্তপ্ত হতে পারে তার একটা আশংকা লিখেছিলাম পোস্টে। তাই অফিস শেষ করে একটু পল্টন ময়দান ঘুরে দেখতে ইচ্ছে হলো খুব।

দুপুর সোয়া একটায় অফিস থেকে বেড়িয়ে পল্টন ময়দানের কাছাকাছি এসে দেখলাম পুরোটাই পুলিশের দখলে। পুলিশের বেস্টনি ভেদ করে পল্টন ময়দানের দিকে যাওয়ার দু:সাহস হলো না বিধায় ধীরে ধীরে দৈনিক বাংলা মোড় হয়ে পল্টন মোড়ের দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু দৈনিক বাংলা মোড়ের কাছে জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদেরকে দেখলাম পুরো রাস্তাটা মানববন্ধনি দিয়ে ঘিরে রেখেছে। কিছুতেই কাউকে রায়তুল মোকাররমের উত্তর পার্শ্বের রাস্তায় ঢুকতে দিচ্ছে না। একটু এদিক ওদিক করে অপেক্ষাকৃত দূর্বল একটা দিক থেকে আস্তে করে ঢুকে পড়লাম। মুখে হালকা ছাগুলে দাড়ি থাকায় কিছুটা দ্বিধা সত্ত্বেও ভেতরে ঢুকতে দিল। আসলে দলটাতো কট্টর আস্তিক অর্থাৎ বিশ্বাসীদের দল। খুব সহজেই ওরা বিশ্বাস করে এবং কখনো কখনো মানুষকে বিশ্বাস করে চরমতম মূল্য দিতে হয় ওদের।

বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের সামনেই একটা উচু মঞ্চ করা হয়েছে। জোট সরকারের সফলতার পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিকাল তিনটা থেকে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। বক্তব্য রাখবেন সরকারের শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, এমপি। মঞ্চে বিভিন্ন ইসলামী সঙ্গীত গেলে চলেছেন শিল্পীবৃন্দ। মঞ্চের সামনে বেশ কিছু শ্রোতা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে প্রধান অতিথির জন্য।

পল্টন মোড় থেকে হৈ-হুল্লা চিৎকারের হালকা ধ্বনি মাইকের সঙ্গীতের শব্দকে ছাপিয়ে কানে বাজতে থাকলে আরো সামনের দিকে এগিয়ে যাই। আযাদ প্রোডাক্টসের দোকানের সামনে আসতেই রক্ত হীম হয়ে যায়। একের পর এক রক্তাক্ত তরুন, কিশোর, যুবক এমনকি বাবার বয়েসী বৃদ্ধদেরকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ভেতরের গলি হয়ে জামায়াতের মহানগরী অফিসের দিকে। একটা স্কুল পড়ুয়া ছাত্রকে রক্তাক্ত অবস্থায় কোলে করে নিয়ে যাচ্ছে একজন, দেখে মনটা হাহাকার করে উঠল। এগিয়ে গেলাম সাহায্যের জন্য। কিন্তু ছেলেটি আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, “আমাকে ধরতে হবে না, আমি ঠিক আছি, আপনার সামনের দিকে এগিয়ে যান, ওরা আমাদের ভাইদেরকে শেষ করে ফেলছে।” ইতোমধ্যেই আমার সাদা সার্ট ছেলেটির রক্তে ভেসে গেছে। তুমুল সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে পল্টন মোড়ে। একের পর এক জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা রক্তাক্ত হয়ে লুটিয়ে পড়ছে মাটিতে।

আমি পড়েছি মহা বিপদে। রাজনৈতিক তামাশা দেখতে এসে এখন আমার প্রাণ নিয়ে টানাটানি। জামায়াতের বেস্টনী পেরিয়ে ১৪ দলের দিকে গেলে আরো বিপদ। এমনিতেই দাড়ি-টুপির প্রতি ওদের ভয়ংকর আক্রোশ, মুখে দাড়ী আর শার্টে রক্ত দেখলে নির্ঘাত ওরা আমাকে কুকুড় বেড়ালের মতো নির্মমভাবে হত্যা করবে। আবার আমি যেহেতু কোন রাজনৈতিক দলেরই সদস্য নই তাই জামায়াতের ছেলেদের সাথে থাকতে পারছি না, আবার রক্তাক্ত শার্ট নিয়ে জামায়াতের বেস্টনী ছেড়ে পালাতেও পারছি না, হয়তো ১৪ দলের লোক অথবা জামায়াতের কাপুরুষ কর্মী দোষে বিপদে পরতে পারি। এখানেই কয়েকজন পরিচিত সাংবাদিক বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে গেল। ক্যামেরা নিয়ে ছুটোছুটি করছে ওরা বিভৎস্য মুহুর্তগুলো ধরে রাখার জন্য। অবশেষে সাংবাদিক বন্ধুদের পাশেই আশ্রয় নিলাম। ফাঁকে সাংবাদিক বন্ধুদের সাথে কথা বলে এবং অন্যদের সাথে আলোচনা করে পুরো চিত্রটা আস্তে আস্তে পরিস্কার হয়ে গেল। ইতোমধ্যেই জামায়াতের কয়েক কর্মী নিহত হয়েছে। পরিস্থিতি ক্রমশই জটিল হয়ে পড়ছে।

সকাল এগারটার দিকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল জামায়াতে ইসলামীর মঞ্চ দখলের জন্য পল্টন মোড় থেকে আক্রমণ শুরু করে। বিকেল ৩ টায় সমাবেশ শুরু হওয়ার কারনে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে তখনো লোকসমাগম তেমন হয় নি। অরক্ষিত ও স্বল্প জনবল দেখে আওয়ামী লীগ মোক্ষম আঘাত হানার পরিকল্পনা করে। যে করেই হোক জামায়াতে ইসলামীর অগ্রযাত্রাকে আজকেই চীরতরে স্তব্ধ করে দিতে হবে এমন প্রত্যয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল পৈশাচিক উল্লাশে আগ্নেয়াস্ত্র, লগি-বৈঠা, নিয়ে হামলে পড়ে নিরস্ত্র জামায়াত শিবিরের নেতা-কর্মীদের উপর। অসহায় জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা পাশবিক হামলায় রক্তাক্ত হয়ে আজাদ প্রোডাক্টস পর্যন্ত পিছু হটে আসে।

জামায়াত শিবিরের কর্মীদের বুঝতে বাকী থাকে না যে আজ তাদের যে করেই হোক টিকে থাকতে হবে। আওয়ামী শাসনামলে এই স্থানেই জামায়াত শিবিরকে পশুর মতো অত্যাচার চালানো হয়েছিল পুলিশ দিয়ে। সেদিন বায়তুল মোকাররম মসজিদে আশ্রয় নিয়েও নিস্তার মেলেনি তাদের। আওয়ামী পুলিশ বাহিনীর বুটের আঘাতে সেদিন বায়তুল মোকাররম মসজিদ যেভাবে অপবিত্র হয়েছিল তার স্মৃতি ভেসে ওঠে জামায়াত কর্মীদের মনে। জামায়াত শিবিরের কর্মী শুধু নয় পল্টন এলাকা থেকে দাড়ী-টুপিধারী যাকে পাওয়া গেছে তাকেই ধরে নির্যাতন চালানো হয়েছে এমনকি জামায়াত শিবিরের অফিসগুলো টিয়ারসেল দিয়ে অন্ধকার করে প্রথমে চরমভাবে আহত করা অফিসের নেতা-কর্মীদের এবং পরে প্রায় অচেতন একেক জনকে টেনে হিচড়ে তোলা হয়েছিল পুলিশ ভ্যানে। দশতলা ভবনে অবস্থিত অন্যান্য সাধারণ অফিস ও বাসাবাড়ি তছনছ করেছিল পুলিশ বাহিনী। এতকিছুর পরও জামায়াত শিবিরকে স্তব্ধ করা যায় নি। আজ যে তার সমুচিত জবাব আওয়ামী লীগ দিতে কুন্ঠিত হবে না তা জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের বুঝতে অসুবিধা হয় না।

বেলা বারোটার দিকে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা তাদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে আক্রমনকারীদের ধাওয়া করে। কিন্তু জেহাদের তামান্না যতই থাকুন নিরস্ত্র হয়ে অস্ত্রধারী আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মোকাবেলায় যে কত মূল্য দিতে হয় তা মুহূর্তেই জানা হয়ে যায় জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের। প্রকাশ্য দিবালোকে, ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিড়িয়ার ক্যামেরার সামনে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে একের পর এক গুলি বর্ষণ করতে থাকে রক্তপিয়াসী আওয়ামী গুন্ডারা। বুলেটের আঘাতে মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়ে অসংখ্য জামায়াত-শিবির কর্মী। হায়েনাদের বুলেট স্তব্ধ করে দেয় জামায়াতের তিন-তিনটি তাজা প্রাণ। জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী আর সাংবাদিকদের অনুরোধ সত্ত্বেও পুলিশ থাকে সম্পূর্ণ নিষ্কৃয়। ওদের ভাব দেখে মনে হয় ওরা আসলে শক্তের ভক্ত। আজ লড়াই করে যারা টিকে যাবে কুকুরের মতো তাদের পা চাটার জন্য লুটিয়ে পড়বে পুলিশ বাহিনী। নিরীহ, নিরপরাধ সাধারণ মানুষের জান-মাল-ইজ্জত যতই ক্ষতিগ্রস্ত হোক না কেন তাতে পুলিশ বাহিনীর কিছুই যায় আসে না।

দুপুরের দুটার দিকে পুলিশ এসে উভয় পক্ষের সামনে দাড়িয়ে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। পুলিশের এই ভালোমানুষী কেমন যেন অশুভ মনে হলো। বার বার মনে হচ্ছে আরো কোন ভয়ংকর হামলার পরিকল্পনা হয়তো করছে ওরা, পুলিশ ওদের সুযোগ করে দিতেই আপাদত হস্তক্ষেপ করেছে বলে মনে হলো। ইতোমধ্যে একপিস রুটি ও একটা/অর্ধেক কলা সরবরাহ করা হলো জামায়াত কর্মীদের। জামায়াত কর্মীরা পুলিশের হাতেও পৌছে দিল কলা রুটি। কি যত্ন করেই না ওরা কলা রুটি খায় দেখে ভারী মায়া হয় ওদের জন্য, আসলে রুটি রুজির জন্যই ওরা শক্তির পুঁজো করে বুঝতে অসুবিধা হয় না। এক শিবির কর্মী বললো, “ওরা ইচ্ছে করলেই আওয়ামী সন্ত্রাস থামাতে পারতো, ওই শয়তানদের রুটি-কলা দিয়ে সৌজন্য দেখানোর মানে কি? অন্য একজন বললো, “ওরা যেই হোক, এখনতো আমাদের এরিয়ায়, ওরা আমাদের মেহমান”।

কিন্তু ওরা যে আসলে মেহমান নয় বরং ওরা শত্রুপক্ষের অগ্রবাহিনী তা একটু পরেই পরিস্কার হয়ে যায়। পল্টন মোড থেকে সুকৌশলে (নাকি পুলিশের ইশারায়) আওয়ামী সন্ত্রাসীরা আস্তে আস্তে পুলিশের বেরিকেড (তারকাটার নয়, শ্রেফ পুলিশবন্ধন) ভেঙ্গে একপা একপা করে সামনে এগোতে থাকে। মাঝে মাঝে ক্যামেরা কাধে ঝুলিয়ে সাংবাদিকের বেশে একে একে ঢুকে পড়তে থাকে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। সাংবাদিক ভেবে চ্যালেঞ্জ করতে সাহস পায় না শিবির কর্মীরা, পাছে আবার এ ঘটনার পুরো দায় জামায়াত শিবিরের ঘাড়ে চাপে।

ইতোমধ্যেই কানাকানি শুরু হয়ে যায় যে আসরের নামাজের সময় আক্রমণ হতে পারে। যেহেতু নামাজে ব্যস্ত থাকবে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা সেই সুযোগটাই নিতে চায় আওয়ামী লীগ। কিন্তু জামায়াত শিবিরের কর্মীরা সুকৌশলে দলে দলে ভাগ হয়ে পর্যায়ক্রমে জামায়াত আদায় করলে ওদের কৌশল ব্যর্থ হয়ে যায়।

বিকেলে ৫ টার দিকে নির্মানাধীন ব্যাংকস ভবন থেকে মুহুর্মুহূ বোমা নিক্ষিপ্ত হয়, সমানে চলতে থাকে গুলি। একই সাথে বাসস (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার) ভবন ও পাশের আরেকটি ভবনের ছাদ থেকে আস্ত একেকটা ইট ছুড়তে থাকে আওয়ামী হায়েনারা। আর কি আশ্চর্য মুহুর্তেই পুলিশ হাওয়া হয়ে যায়। এই ফাকে একদল সন্ত্রাসী জামায়াতের স্টেজ লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকে, ওদের টার্গেট ছিল জামায়াতের নেতাদের হত্যা করা। কিন্তু জামায়াত সম্পর্ক ওদের ধারণা মনে হয় স্পষ্ট নয়। জামায়াত কোন ব্যক্তি নির্ভর দল নয়। এ সংগঠনের সাংগঠনির ভিত্তি এতটাই মজবুত যে প্রথম সাড়ির শ’খানেক নেতাকে হত্যা করলেও দলটি থমকে দাড়াবে না কারন দলটি কর্মী তৈরীর চেয়ে নেতা তৈরীতেই বেশি মনোযোগ দিয়ে থাকে।

আগেই বলেছি, আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলার মুখে অনঢ় অবস্থানে থাকা জামায়াত-শিবিরের জন্য ছিল জীবন মরণ প্রশ্নের মতো গুরুত্বপূর্ণ। এদিন যদি জামায়াত-শিবির কর্মীরা পিছু হটতো, তাহলে জামায়াতের কর্মীদের পাশাপাশি নেতৃবৃন্দকেও বেঘোরে প্রাণ হারাতে হতো। শুধু তাই নয় আওয়ামী অপশক্তি জামায়াত শিবিরকে সেদিন পল্টন থেকে বিতারিত করতে পারলে নিশ্চিত যে দেশব্যাপী জামায়াত-শিবিরের সমর্থক, পরিবার পরিজনের উপর কেয়ামত বয়ে যেত। ওদের টার্গেট যে জামায়াতের নেতাদেরকে হত্যা করা তা তো আওয়ামী লীগের মঞ্চ থেকে জামায়াত শিবিরের উপর আক্রমনের বার বার নির্দেশ দানই প্রমাণ করে। এছাড়া বাঙলা ভিশনের সৌজন্যে সবাই দেখেছে যে মালিবাগ হত্যাকান্ডের নায়ক ড. ইকবাল কিভাবে সন্ত্রাসীদেরকে জামায়াত শিবিরের উপর ঝাপিয়ে পড়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। আমি ভেবে পাই না, যে লোক শিক্ষা গ্রহণ করেছে চিকিৎসাশান্ত্রে, যার দায়িত্ব মানুষের বিপদে আপদে সাহায্য করা, মৃত্যুপথযাত্রীদেরকে জীবনের আলোয় ফিরে আসতে সাহায্য করা সেই ডাক্তার নামধারী কসাই কি করে মানুষ হত্যার খেলায় মেতে ওঠে। আসলে আওয়ামী লীগ নেতা বাছাইয়ের সময় খুন করায় দক্ষতা কার কতটুকু, কার পেশি শক্তি বেশি, কে সন্ত্রাস আর নৈরাজ্য সৃষ্টিতে পারঙ্গম তা দেখেই বোধহয় হাতে নেতৃত্ব তুলে দেয়। আওয়ামী লীগের এমন নেতা পাওয়া দুষ্কর যিনি সন্ত্রাসীদের গডফাদাররূপে সমাজে ধিকৃত হন নি।

একের পর এক সন্ত্রাসী আক্রমন, হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন তবু জামায়াতকে নির্মূলের খায়েশ আওয়ামী হায়েনাদের পূর্ণ হয় না। যথাসময়ে জামায়াতের আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, এমপি বক্তব্য রাখেন। আমি অবাক হয়ে যাই, যে দলের তাজা তাজা তরুণ প্রাণ গুলো আওয়ামী হায়েনাদের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে দূনিয়া থেকে বিদায় নিল, যার মঞ্চ লক্ষ করে গুলী ছোড়া হলো, বক্তব্য প্রদানকালীন যখন তুমল আক্রমণ চলছে মঞ্চ দখলের জন্য তখন তিনি হিংসাত্মক বক্তব্য না রেখে নির্বাচনে ব্যালটের মাধ্যমে জনগণ এর জবাব দেবে বলে বক্তব্য রাখছেন। হাজারো অপবাদে বিধ্বস্ত একটা দলের আমীর এতটা অহিংস বক্তব্য রাখতে পারেন এমন দুর্যোগপূর্ণ দিনে তা নিজের চোখে না দেখলে হয়তো বিশ্বাস করাই কঠিন হতো।

জামায়াত শিবিরের কর্মীদেরকে অসহায়ত্ব দেখে আমার খুব আফসোস হয়। এ দলটা সম্পর্কে আজীবন শুনেছি, কর্মীদেরকে নিয়মিত অস্ত্রের ট্রেনিং দেয়, হত্যা নির্যাতন করা এদের পেশা অথচ বাস্তবে পল্টনের রণক্ষেত্র দেখে আমার আক্কেলগুড়ুম। জামায়াতের নেতৃবৃন্দ, বিশেষ করে যারা শিবিরের একসময় কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিল এবং বর্তমান শিবির কেন্দ্রীয় সভাপতি হাতে মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে আওয়ামী আক্রমণ প্রতিহত করতে মাঠে নেমেছে। আগে শুনেছি শিবিরের কোন নেতার গায়ে আঘাত লাগলে দেশে কেয়ামত বয়ে যায় অথচ শিবিরের বাঘা বাঘা নেতারা আহত হওয়ার পরও দলটি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে না দেখে ভারী অবাক হলাম। শুনে এসেছি একে ৪৭ ছাড়া এরা একপাও নড়েনা অথচ বুলেটের আঘাতে একের পর এক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার পরও খালি হাতে সন্ত্রাসীদের মোকাবেলা করছে। তাহলে এরা দেশে অস্ত্রাগার গড়ে তুলেছে, আর্মীর চেয়েও বেশি অস্ত্র এদের এসব কথা যে শুনে এসেছি তা কি ফাঁকা বুলি? জামায়াত শিবির অস্ত্র নির্ভর একটি দল এটা কি তবে আওয়ামীদের অপপ্রচার?

পুরো রাস্তায় বিধ্বস্ত, বিক্ষুব্ধ কর্মীদের একটাই প্রশ্ন ছিল নেতাদের কাছে, “আর কত এভাবে মার খাবো আমরা? আর কতো মায়ের বুক খালী হবে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের বুলেটের আঘাতে? বার বার জামায়াত শিবির কর্মীরা বিক্ষোভ করছিল কেন ওদের মতো আমাদেরকেও অস্ত্র দেয়া হয় না। আমরা অস্ত্রবাজী করি বলে মিডিয়াতো সব সময় মিথ্যাচার করে তবে কেন সত্যি সত্যি আমরা অস্ত্র ব্যবহার করতে পারি না?”

সবাই জানে ২৮ অক্টোবর রাজপথ উত্তপ্ত থাকবে। দেশের সকল সচেতন নাগরিকের দৃষ্টি ছিল এ দিনটির দিকে। তাহলে জামায়াতে ইসলামীর নেতারা এ সম্পর্কে এতোটা বেখবর হন কি করে? হ্যা ঠিক যে তাদের সমাবেশ হওয়ার কথা বিকেল ৩ টায় তাই বলে সকাল থেকেই কেন নিরাপত্তার ব্যাপারটি তাদের নজরে এলো না।

বাসা থেকে বার বার ফোন আসছে, অফিসে থেকে ফিরতে এতো দেরি দেখে। আমি কিছুতেই বলতে পারি না আমি নারকীয় তান্ডরের নীরব দর্শক। পল্টনে রঙ তামাশা দেখতে এসে আমিই যে এখন হাসির পাত্রে পরিণত হয়ে গেছি তা বলতে পারি না। আশ্বস্ত করি, সন্ধ্যার পরই বাসায় আসছি।

ফোনে বললেও আসলে বাসায় ফেরাটা অত সহজে হয়ে ওঠে না। একে তো রক্তমাখা শার্ট গায়ে, আবার বাসার পথে কোন রিক্সা-টেক্সি কিছুই যাচ্ছে না। সন্ধ্যার খানিক পরে যুদ্ধ থামে, আওয়ামী পিশাচদের প্রলয়নাচন থামে, জামায়াত শিবির কর্মীরা একে একে দলের অফিসে ফেরে কেউ কেউ দল বেধে বাড়ির পথ ধরে। কিন্তু আমার তো কোন দল নেই, আমি আমার এলাকার আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা জামায়াতে ইসলামীর কোন নেতাকে চিনি না তাহলে কি করে বাসায় ফিরি? আমার গায়ে রক্তমাখা সাদা শার্ট, দূর থেকেও দেখলেই যে কেউ বুঝতে পারে, মুখে আছে একছটাক ছাগুলে দাড়ি। এবার আমি পড়ি আসল বিপড়ে। আস্তে আস্তে দৈনিক বাঙলা মোড়ে এসে অপেক্ষমান কয়েকটা রিক্সা দেখে বুড়ো মতো একজনকে যাওয়ার কথা বলতেই রাজী হয়ে গেল। বিপদের সময়ে রিক্সা সাধারণত পাওয়া যায় না বা পাওয়া গেলেও হাত-পা ধরেও গন্তব্যে যেতে রাজী করানো যায় না, অথচ বেচার আমাকে দেখে কি মনে করলো জানি না, রাজী হয়ে গেল। পুরোটা পথ এতটা আতঙ্কে ছিলাম যে প্রতিমুহূর্তে মনে হচ্ছিল এই বুঝি অন্ধকারে ওত পেতে থাকা আওয়ামী হায়েনারা হামলে পড়ে আমায় ছিড়ে টুকরো টুকরো করে হত্যা করবে। কিন্তু আল্লাহ সহায় হওয়ায় সে যাত্রায় প্রাণ নিয়ে বাসায় ফিরি।

বাসায় ফেরা পর্যন্ত আমার ধারণা ছিল আমি জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর আওয়ামী বর্বরতা দেখে ফেলেছি। কিন্তু বাসায় পৌছে টেলিভশনের স্ক্রীনে দৃষ্টি দিয়ে স্তব্ধ হয়ে যাই। এতটা বিভৎস্য, এতটা নির্মম, এতোটা পাশবিক নির্যাতন যে মানুষ মানুষের উপর চালাতে পারে তা দেখে আতকে উঠি। বিবিএর ছাত্র মুজাহিদকে আওয়ামী হায়েনারা একের পর এক বৈঠার আঘাতে যে নির্মম অত্যাচার চালিয়ে হত্যা করেছে তা কোন বিবেকবান মানুষের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। মুজাহিদের মাথায় বৈঠার আঘাতে চুর্ণ বিচুর্ণ করেও পিশাচদের তৃষ্ণা মেটে নি, ওরা মুজাহিদের লাশের উপর লাথি মারে, লগি দিয়ে চোখ খোঁচায়, থুথু ছেটায় এসব বর্বরতা প্রমাণ করে হত্যা, নির্যাতন, সন্ত্রাস আওয়ামী অপশক্তির পেশা। ওরা মানুষ নয়, ওরা পেশাদার খুনী, ওরা নরখাদক পিশাচ-হায়েনার জাত, ওরা আওয়ামী লীগ।

কেন ওরা মুজাহিদকে হত্যা করলো? মুজাহিদ কি কোন সন্ত্রাসী? ওর ইউনিভার্সিটির বন্ধুরাতো কোনদিন ওকে অস্ত্রবাজী করতে দেখেনি, কোনদিনতো ও ওর কোন সহপাঠিকে আঘাত করেনি। মুজাহিদকে যখন রক্তপিপাসু হায়েনার দল ঘিরে ধরে তখন তো মুজাহিদের হাতে ছিল না কোন মারনাস্ত্র, কিংবা ছুরি, লাঠি। তাহলে কেন সম্পূর্ণ নিরস্ত্র, নিরপরাধ অসহায় এক তরুনের জীবন প্রদীপ খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে খুবলে খেল আবুলাহাবের প্রেতাত্মারা?

মুজাহিদ কি ওদের কারো বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছিল? মুজাহিদের সাথে কি ওদের জমি জমা নিয়ে কোন বিরোধ ছিল? মুজাহিদ কি ওদের কোন মা-বোনের ইজ্জর কেড়ে নিয়েছিল, যেমন শতাধিক বোনের ইজ্জত লুটে সেঞ্চুরী উৎসব পালন করেছিল ছাত্রলীগ নেতা মানিক কিংবা যেমন ওরা প্রকাশ্যে বস্ত্রাহরণ করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঁধনের? মুজাহিদের হাতে কি ওদের কোন আত্মীয়ের রক্ত ঝড়েছিল, যেমন মাত্র দুই দিনে হাজারো নিরপরাধ লোকের রক্ত ঝড়িয়েছে ১৪ দল? তবে কি মুজাহিদ একাত্তরে পাকিস্তানীদের দোসর হয়ে নিরস্ত্র বাঙ্গালীর উপর শকুনের মতো হামলে পড়েছিল? না মুজাহিদ তাও করে নি। মুহাজিদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারেরই সন্তান, ওর জন্ম স্বাধীনতার অনেক অনেক পরে।

স্বাধীন বাংলাদেশে এমন নির্মন নির্যাতন, এমন নির্দয় হত্যাকান্ড, এমন পৈশাচিক উল্লাশ কেউ কি কখনো দেখেছে? পাহাড় সমান অপরাধ নিয়ে যে সন্ত্রাসী ধরা পরে তাকেও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয়, তাকেও তার শেষ ইচ্ছে পূরণের সুযোগ দেয়া হয়। পশু পাখি জবাই করার পূর্বেওতো এক চুমুক পানি পানের সুযোগ করে দেয় বিবেকবান মানুষ। তাহলে মুজাহিদ এমন কি অপরাধ করলো যে তাকে জীবনের শেষ মুহূর্তে “মা, মা” বলে ডাকতেও দিলো না ওরা?

তাহলে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিবিএর ছাত্র মুজাহিদ আহমেদ ফাহিমের অপরাধ কি? মুজাহিদের স্বপ্ন ছিল শোষনমুক্ত, ক্ষুধামুক্ত একটি ইসলামী সোনালী সমাজ গড়া। আর তাই মুজাহিদ যোগ দিয়েছিল ছাত্র ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরে। শুধু মাত্র ভিন্ন মতাদর্শের, ভিন্ন মূল্যবোধের, ভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী হওয়ায় পাশবিক নির্যাতন সয়ে সয়ে পৃথিবীর আলোবাতাসের মায়া ছেড়ে চলে যেতে হলো খোদার সান্নিধ্যে।

মুজাহিদ যে আদর্শের সৈনিক সে আদর্শ সম্পর্কে আওয়ামী পিশাচদের মতো প্রচন্ড ঘৃণায় একসময় নাক সিটকাতেন মুজাহিদের শ্রদ্ধেয় নানা মনসুর আহমেদ। কিন্তু তিনিও একসময় এসে আশ্রয় নেন ইসলামী আন্দোলনের সুমহান আদর্শের পতাকাতলে। [email protected]@!168772 [email protected]@!168773 [email protected]@!168774 পত্রিকার ৬ নভেম্বর সংখ্যায় মুজাহিদের নানা মনসুর আহমেদের ইসলামী আন্দোলনে শামীল হওয়ার ইতিহাস তুলে ধরেছে।
যে দল পাকিস্তানী নরঘাতকদের হাত থেকে সাত কোটি মানুষের প্রাণ বাংলাদেশকে মুক্ত করার জন্য যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল সেই দলই এক সময় গণমানুষের ভালোবাসাকে আস্তাকুড়ে ছুড়ে মেরে ভ্রাতৃ হত্যায় মেতে ওঠে, স্বাধীনচেতা জনতার কাধে চাপিয়ে দেয় একদলীয় বাকশালী অপশাসন। ওরা এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিল, রক্তের নেশায় এতটাই জ্ঞানশুণ্য হয়েছিল যে প্রতিপক্ষ জাসদের ৩০ হাজার কর্মীকে তিলে তিলে, পিষে পিষে হত্যা করেছে। কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামে যারা নিজেদের প্রাণ বাজী রেখেছিলেন, যারা মানবতার মুক্তির জন্য অস্ত্র ধরেছিলেন, যারা ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে মরে যাওয়াকে শ্রেয় মনে করতেন তারা আওয়ামী অপশাসনকে কিছুতেই মেনে নিতে পারে নি।

মুজাহিদের নানা স্বাধীনতার সৈনিক বিধায় স্বাধীনতার শত্রু বলে খ্যাত অধ্যাপক গোলাম আযমকে হত্যার জন্য ১৯৭৮ সালে বন্ধুদের নিয়ে কল্যাণপূরে অনুষ্ঠিত জামায়াতের অনুষ্ঠানে চলে যান। কিন্তু যারা পাকিস্তানী হায়েনাদের হাত থেকে মুক্ত হয়ে আওয়ামী বাকশালী পিশাচদের নির্যাতন দেখেছে, সত্য আর মিথ্যের প্রভেদ করা তাদের জন্য কঠিন নয়। তাইতো অধ্যাপক গোলাম আযমকে হত্যা করতে যেয়ে ইসলামী আন্দোলনের সুমহান আদর্শের সুশীতল পরশ পেয়ে ইসলামী আন্দোলনের কর্মী হয়ে যান নানা মনসুর আহমেদ।

আসলে অপরাধী যত চতুরই হোক না কেন তার অপরাধের চিহ্ন রেখে যায় একথাটি সবার কাছে স্পষ্ট। আওয়ামী অপশক্তি হত্যা, নির্যাতন, ষড়যন্ত্র করে দেশের শান্তিকামী মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়ে সাধু সাজার যে অপচেষ্টা চালায় তা আজ জাতির কাছে পরিস্কার। একের পর এক অপরাধ করে মিডিয়ার কল্যাণে সে দায়ভার অন্যের কাঁধে চাপিয়ে সাধারণ মানুষকে আর কতদিন ধোকা দেবে ওরা?

টিভি স্কীনে মুজাহিদের করুণ শাহাদাতের চিত্র মুছে যেতে না যেতেই ভেসে ওঠে আওয়ামী তথ্য সন্ত্রাসের বিভৎস্য চেহারা। ২৮ অক্টোবর পল্টন মোড়ে ৬ ঘন্টায় যা দেখলাম টিভির সংবাদে আর পরবর্তী দিন পত্রিকার সংবাদ পড়ে আমার আক্কেল গুড়ুম। সাদাকে কিভাবে কালো করতে হয়, সত্যকে কিভাবে মিথ্যেয় পরিণত করতে হয় তা মিডিয়ার তথ্য সন্ত্রাস কাছে থেকে না দেখলে বুঝে উঠা কঠিন।

আওয়ামী লীগ লাশের রাজনীতি করে এই কথাটি সমাজে বেশ চালু আছে, রিন্টুর আমার ফাঁসি চাই বইতেও শেখ হাসিনার লাশের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা রয়েছে কিন্তু তা যে কতটা বাস্তবচিত্র তা ২৮ তারিখে স্বচক্ষে দেখে বুঝতে পারলাম, এবং রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য যে কোন ধরণের অন্যায়কেই যে আওয়ামী লীগ বৈধ কিংবা অবশ্য করণীয় বলে মনে করে তা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম।

২৮ তারিখে হাবিবুর রহমানের লাশ নিয়ে আওয়ামী লীগের কুৎসিত রাজনীতি পুরো জাতিকেই স্তম্ভিত করেছেন। রাজনৈতিক স্বার্থে একটি লাশকে ভিন্ন নামে ভিন্ন পরিচয়ে মর্গ থেকে কেড়ে নেয়ার চেষ্টা আমাদের মনে করিয়ে দেয় শেয়াল কুকুরের কথাই যা কবরের মাটি দন্ত-নখর দিয়ে আচড়িয়ে লাশকে ছিন্ন ভিন্ন করে খাওয়ার জন্য গভীর রাতে হানা দেয় গোরস্তানে। ওরা তার চেয়েও নীচ, শেয়াল কুকুর রাতের আধারে লাশ কেড়ে নেয়, ওরা মিডিয়ার টিভি ক্যামেরার সামনে দিন দুপুরে সবার চোখে ধুলো দিয়ে লাশ কেড়ে খেতে চায়।

২৮ তারিখে জামায়াত কর্মী হাবিবুর রহমান আওয়ামী নরখাদকদের বুলেটের আঘাতে মৃত্যু বরণ করেন। ২৮ তারিখের পৈশাচিক হামলায় আওয়ামী লীগের একজনও নিহত না হওয়া একটা লাশের জন্য ওরা মরিয়া হয়ে ওঠে। আর জামায়াত কর্মী হাবিবুর রহমান ওদের গুলির আঘাতে নিহত হলে তাকেই ওদের কর্মী বলে চালিয়ে দেয়ার জন্য লাশ দখল করে। শুরু হয় হাবিবুর রহমানের লাশকে আওয়ামী কর্মী মনির হোসেন বাবানোর বিভৎস্ নাটক। হাবিবুর রহমানের লাশ দখলের মাধ্যমে আওয়ামী অপশক্তি এক ঢিলে দুই পাখি মারার পরিকল্পনা নেয়, একে তো তাদের একটা লাশ দরকার, হাবিবুর রহমান সেই লাশের তৃষ্ণা কিছুটা হলেও মিটাবে, আবার জামায়াত শিবিরের পক্ষ থেকে একটা বুলেটও নিক্ষিপ্ত না হওয়ায় জামায়াতকে জঙ্গী সংগঠন প্রমাণের সুযোগটাও হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিল তাও সহজে প্রমাণ করা যাবে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আহত ও নিহতদের দেখতে গিয়ে সাবেক সংসদ সদস্য আওয়ামী গডফাদার হাজী সেলিম হাবিবুর রহমানের লাশ দেখে আর দেরি করেন নি। দ্রুত হাজারীবাগ রিক্সা শ্রমিক লীগের সভাপতি পরিচয়দানকারী নূরু মিয়াকে মনির হোসেনর পিতা পরিচয়ে পাঠান মর্গে। হাবিবুর রহমানের লাশকে তার সন্তান মনির হোসেনের লাশ বলে হাবিবুর রহমানকে আওয়ামী লীগের কর্মী বানানোর নাটকে অভিনয় শুরু করে।

পৃথিবীতে সবচেয়ে ভারী বস্তু কি এ প্রশ্নের জবাবে সবাই একবাক্যে বলবেন যে পিতার কাধে সন্তানের লাশই সবচেয়ে ভারী। অথচ যারা টিভিতে নূরু মিয়ার সাক্ষাৎকার দেখেছেন তাদের কারো পক্ষেই কি মেনে নেয়া সম্ভব নূরু মিয়া ঐ লাশের পিতা? সুস্থ, স্বাভাবিক, শোকাতাপহীন একজন পিতার আচরণ করেছেন তিনি, যেন তার সন্তান ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে আর তিনি তার ছেলের সাফল্য বর্ণনা করছেন।

কিন্তু মিথ্যে দিয়ে কখনোই সত্যকে ঢেকে রাখা যায় না যেমন ঢেকে রাখা যায় নি আওয়ামী লাশের রাজনীতির নাটক। হাবিবুর রহমানের স্ত্রী আসিয়া, সন্তান রুবেল ও তানজিলার শোকার্ত, বিধ্বস্ত উপস্থিতি নিমিষেই মিথ্যের মুখোশ উন্মেচিত করে দেয়। নূরু মিয়া আর তার দোসর আর গডফাদাররা নিমিষেই হাওয়া হয়ে যায়, তাদের লাশের রাজনীতি ভেস্তে যাওয়ায় জনধিক্কার কুড়াতে কুড়াতে ওরা পালিয়ে যায়।

২৮ অক্টোবর আওয়ামীদের গুলি, লগি বৈঠা আর ইটের আঘাতে পল্টনে আহত হয় ছয় শতাধিক জামায়াত-শিবির কর্মী। এদের অনেকেই আহত হয় বুলেটের আঘাতে। অপরপক্ষে আওয়ামী অপশক্তির আহত হয় মাত্র জনা ত্রিশেক কর্মী। জামায়াত-শিবির যদি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে থাকে তবে তার আঘাতে একজনও ১৪দল কর্মী মারা গেল না, একজনও আহত হলো না, বরং আহত হলো জামায়াত-শিবির কর্মী, এটা কেমন করে হয়? অথচ আওয়ামী অপশক্তির গুলির আঘাতে ওখানেই নিহত হয় তিন জন, মুজাহিদ নিহত হয় বর্বর লগি বৈঠার আঘাতে। জামায়াত-শিবির যদি আগ্নেয়াস্ত্রই ব্যবহার করে থাকবে তবে জামায়াত-শিবিরের কয়েকশ কর্মীর সামনে মুজাহিদকে পৈশাচিক উন্মত্ততায় হত্যা করা হলো, তখনও জামায়াত-শিবিরের পক্ষ থেকে মুজাহিদকে রক্ষা করার জন্য একটা ফাঁকা গুলি করা হলো না এটা সুস্থ বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন কারো পক্ষেই মেনে নেয়া সম্ভব নয়।

আওয়ামী অপশক্তির হাতে রয়েছে শক্তিশালী ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া। সাদাকে কালো করার জন্য প্রয়োজন এমন কোন অস্ত্রের ঘাটতি নেই ওদের। সময় সুযোগ পেলেই ওরা তথ্য-সন্ত্রাসের বাক্স খুলে মনগড়া, ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রনোদিত চটকদার ডেস্কনির্ভর সংবাদের ডালি সাজিয়ে বসে সহজ-সরল নিরীহ মানুষের সামনে। একই ছবির ক্যাপশন উল্টো করে দিয়ে আওয়ামী অপশক্তির অপকর্মের দায় কত সহজেই যে ওরা ইসলামী আন্দোলনের ঘাড়ে ছুড়ে মারতে পারে তা লাশ নিয়ে আওয়ামী তথ্য সন্ত্রাস ও রাজনীতি সচক্ষে না দেখেছে তাদের পক্ষে বুঝে ওঠা কতই না কঠিন।

Be Sociable, Share!

One Reply to “তথ্য সন্ত্রাস ও বর্বরতার শিকার ইসলামী আন্দোলন”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।