হলুদ সাংবাদিকতা

আপনি যদি কোন অবৈধ ব্যবসায়ে জড়িয়ে পড়েন এবং ব্যবসার পরিধি যদি বড় হয়ে যায় তবে আপনার অবৈধ ব্যবসার নিরাপত্তার স্বার্থে এবং প্রতিপক্ষকে সবসময় দৌড়ের উপর রাখতে অবশ্যই একটা দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করতে হবে। কিংবা আপনি যদি কোন প্রেসের মালিক হন এবং প্রেসের জন্য উচ্চহারে কাগজ কিনে দেউলিয়া হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয় তবে অবশ্যই আপনাকে একটা পত্রিকা বের করতে হবে। এতে এক ঢিলে দুই পাখি মারা হবে, কম পয়সায় কাগজ পাবেন (অবশ্যই যতকপি পত্রিকা বের করবেন তার কয়েকশগুণ বেশী কাগজ) এবং হুমকি ধামকি কিংবা আঙ্গুল একটু বাঁকা করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বিজ্ঞাপন এনে খুব সহজেই ফুলে ফেপে মহীরুহে পরিণত হতে পারবেন। আর পত্রিকার সম্পাদক কিংবা সাংবাদিক হিসেবে সমাজে পাবে সমীহের আসন (সাংঘাতিক বিপজ্জনক ব্যক্তি হিসেবে আপনাকে সবাই সালাম দিবে)।

পত্রিকা বের করতে হলে আপনাকে কয়েকটি মূলনীতি মেনে চলতে হবে। পত্রিকা যেহেতু অবৈধ আয়ের রক্ষাকবচ এবং বাড়তি আয়ের উৎস তাই অবশ্যই পত্রিকায় অসত্য ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে নির্ভিক থাকতে হবে। যে কোন সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রেই প্রতিপক্ষের ক্ষতি যাতে নিশ্চিত হয় এমনভাবে সংবাদটিকে পরিবেশন করতে হবে। যদি আপনার পক্ষের কারো হাতে প্রতিপক্ষ নিহত হয় তবে অবশ্যই সংবাদটা এমনভাবে পরিবেশন করতে হবে যে পাঠকমাত্র বুঝতে পারে যে আপনার প্রতিপক্ষের মৃত্যুটা জাতির জন্য একটি বড় অর্জন। আর আপনার পক্ষের কেউ যদি আক্রমন করতে গিয়েও মারা যায় তবে প্রতিপক্ষের গুষ্ঠিশুদ্ধ যেন নির্বংশ হয় তার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। আর পরবর্তীতে যদি মিথ্যে সংবাদ পরিবেশনের জন্য দুঃখ প্রকাশও করতে হয় তবে পত্রিকার চিপায়-চাপায় লিখে দিলেই হলো, একই সংবাদের দ্বিতীয়টায় কেউ নজর বুলায় না বিধায় আপনার পরিবেশিত মিথ্যে গাল-গপ্পই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে।

পত্রিকার শুরুতেই একটা মিথ্যে শ্লোগান এটে দিতে হবে। চৌদ্দ পুরুষে কেউ মিথ্যা কয় নাই, আমি কাউরে ডরাই না, সব কিন্তু কইয়া দিমু, হাসিনার মতো নিরপেক্ষ ইত্যাদি শ্লোগান দেখেই যাতে পত্রিকা পাঠকরা বুঝে ফেলে আপনি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, আপনার কোন দল নেই। তবে অবশ্যই আপনাকে কোন না কোন রাজনৈতিক দলের লেজুরবৃত্তি করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রধান দুইটি দল আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির লেজুরবৃত্তি অনেক লাভজনক। দল ক্ষমতায় গেলে সরকারী বিজ্ঞাপনে ভেসে যাবেন আর বিরোধী দলে থাকলেও সমস্যা নাই, সাধারণ পাঠক সরকার বিরোধী সংবাদ পড়তেই ভালো বাসে, পাঠকই আপনার পত্রিকা বাঁচিয়ে রাখবে। আর অবশ্যই প্রচার সংখ্যায় যে আপনার পত্রিকা শীর্ষে তা লিখতে ভুলবেন না যেন।

আপনার পত্রিকায় সাংবাদিক নিয়োগের ক্ষেত্রে অবশ্যই বামপন্হীদের নিয়োগ দেবেন। আপনি যে দলের সমর্থক বামপন্থী সাংবাদিকরা সে দলের স্তুতি এবং স্বার্থ রক্ষায় ডেস্ক নির্ভর সংবাদে পত্রিকার কাগজ আর কালি নিঃশেষ করে ফেলবে, এক্ষেত্রে তাদের সাফল্য ইর্ষণীয় । আপনি যদি দল পাল্টান আপনার পত্রিকার বাধ্যগত সাংবাদিকরাও সঙ্গে সঙ্গে খোলস পাল্টে আগের দলের গুষ্ঠি উদ্ধারে নেমে যাবে। আর বামপন্থিরা আপনার পত্রিকার চালিকাশক্তি হলে পাঠক সহজে আপনার পত্রিকা গ্রহণ করবে কারন বামপন্থীরা যেহেতু আওয়ামী লীগ বা বিএনপি নয় তাই সময় সুযোগমতো দুদলকেই সাইজ করতে পিছপা হবে না ওরা। ফলে পাঠক মনে করবে আপনার পত্রিকা নিরপেক্ষ, আপনার পত্রিকা আওয়ামী লীগ বিএনপি দুদলকেই সমান বাশ দেয়। এতে সাধারণ পাঠক দুই দলের প্রতি বিতশ্রদ্ধ হয়ে, গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাহীন হয়ে “ভোট নয়, গণযুদ্ধ” শ্লোগান দিতে দিতে হয়তো বাম আন্দোলনের দিকে ঝুকলেও ঝুকতে পারে।

আর একটা দিক অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। দেশে যত বিশৃংখলা, অপরাধ হোক না কেন তার সংগে যেন অত্যন্ত সুনিপুন ভাবে ইসলামপন্থীদেরকে জড়ানো যায়। বিরামহীণ প্রচার প্রপাগান্ডার পরও ইসলামপন্থীদের উত্থান রীতিমতো আতঙ্কজনক। তাই যদি অপরাধী ইসলামপন্থী নাও হয় তবে সে কোন ইসলামপন্থীর প্রতিবেশী কি না তা রসালোভাবে উল্লেখ করুন এবং তার মেয়ের সাথে একটা অবৈধ সম্পর্ক থাকতে পারে এমন ইংগিত দিয়ে ইসলাম পন্থীদের দায়ী করার চেষ্টা চালান। সবচেয়ে ভালো হয় যে কোন ঘটনার সংঘটিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসলাম পন্থী কোন সন্দেহভাজনকে টার্গেট করে অনুনন্ধানী রিপোর্ট করুন। এক্ষেত্রে অপরাধের ঘটনার সূত্র ধরে পিছনের দিকে না এগিয়ে বরং কোন একটা টার্গেট ধরে নিয়ে সে টার্গেট থেকে আস্তে আস্তে মূল ঘটনার দিকে এগোতে থাকুন। এটাকে অন্যরা ডেস্ক নির্ভর সংবাদ বললেও কিছু যায় আসে না কারন সাধারণ পাঠক গল্প চায়, আপনি একটি সফল গল্পের শুরু করতে পেরেছেন। আর আগেই বলেছি আপনার রিপোর্ট মিথ্যে হলেও কিছু যায় আসে না, কারন পরবর্তী যে কোন এক সময় অনুচ্চস্বরে ক্ষমা চেয়ে নিলেই হলো।

আপনার পত্রিকাটি যদিও আপনার অবৈধ ব্যবসা, চোরাচালানী, শিশু ও নারী-পাচার, মাদক ব্যবসা কিংবা জোর জবরদস্তিমূলক জমিদখলকে নিরাপদ করার জন্য করা করেছেন তবুও আপনাকে মনে রাখতে হবে আপনি জাত ব্যবসায়ী। ব্যবসায় আসলে ফেলনা বলে কিছ্ছু নেই, সবকিছুকেই রিসাইকেল করে ব্যবহার উপযোগী করতে হয়। আখ মাড়াই করে গুড় তৈরী করলেই কাজ শেষ হয়ে যায় না বরং আখের ছোবড়াগুলোকে জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করতে হয়, আবার সেই জ্বালানীর তলানী থেকে টুথ পাউডার তৈরী করে বাজারজাত করতে পারলেই আপনি একজন সফল ব্যবসায়ী হবেন। তাই পত্রিকা চালু করে কাড়ি কাড়ি টাকা এখানে অপচয় করলে তো হবে না বরং এটাকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। এজন্য আপনাকে সর্বপ্রথম বিজ্ঞাপন আদায়ে মাঠে নামতে হবে।

যেহেতু বাংলাদেশ দূর্ণীতিতে ইর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে সেহেতু ধরেই নেয়া যায় দেশের অধিকাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কলকারখানা, ব্যাংক-বীমা প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে দূর্ণীতি স্থায়ী আসন গেড়েছে। এক্ষেত্রে আপনি ঐ সকল প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করতে পারেন। প্রতিষ্ঠানটির কিছু দূর্বলতা খুঁজে বের করুন, এক্ষেত্রে দু’য়েকজন অফিসার বা কর্মকর্তাকে কিছু উপহার উপটৌকন দিতে হলেও পিছ পা হবেন না। যেহেতু দূর্বলতাগুলোর ডকুমেন্ট আপনার হাতে এসে গেছে তাই হুট করে আবার পত্রিকায় ছাপিয়ে বসবেন না যেন। প্রথমে প্রতিষ্ঠানের হর্তা-কর্তাদের সাথে আপোষরফা করার চেষ্টা চালাতে এক কাপ চায়ের জন্য দাওয়াত দিন। এবার আপনার কাঙ্খিত বড় অঙ্কের দাবীটা তাদের কাছে পেশ করুন এবং অবশ্যই সাথে হুমকি দিতে ভুলবেন না যে “কইয়া দিমু কিন্তু”। এতে যদি নতিস্বীকার করে তো খেল খতম আর টাকার অঙ্ক বেশি হয়ে যাচ্ছে বলে হাঙ্কি পাঙ্কি শুরু করে তবে অফিসে গ্রীণ সিগনাল পাঠিয়ে দিন। আপনার রিপোর্টের প্রথম পর্ব প্রকাশিত হওয়ার পরই দেখবেন সুড়সুড় করে আপোষরফা করতে হাজির হয়ে যাবে। আর যদি হর্তা-কর্তাদের ঘাড় একটু ত্যাড়া হয় তবে হয়তো কোটি টাকার বিজ্ঞাপন দিয়ে এর প্রতিবাদ জানাবে বিভিন্ন পত্রিকায়। বলা বাহুল্য, আপনার পত্রিকায় যেহেতু রিপোর্টটি এসেছে তাই বিজ্ঞাপন আর কেউ না পেলেও ঠিকই আপনার পত্রিকায় বিজ্ঞাপন এসে যাবে।

অবশ্য কিছু প্রতিষ্ঠান আছে যারা দূর্ণীতির মহোৎসব থেকে নিজেদেরকে দূরে সড়িয়ে রেখেছে সজতনে। কথায় আছে বেশী ভালো ভালো না কিংবা অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ। তাই এ সকল প্রতিষ্ঠানের ভদ্রতার কারণ অনুসন্ধান করুন। যদি প্রতিষ্ঠানটি কোন ধর্মীয় আদর্শের কারণে সততার সাথে কাজ করে থাকে তবে প্রতিষ্ঠানটি যে মৌলবাদী কোন গোষ্ঠীর সক্রিয় সমর্থক, অর্থের জোগানদাতা ইত্যাদি গুজব রটিয়ে দিন। প্রতিষ্ঠানের সুনাম যদি আকাশছোঁয়া হয় তবে এক্ষেত্রে আপনাকে একটু সতর্ক হতে হবে। আপনার সমমনা পত্রিকাগুলোর সাথে একটা সিটিং দিয়ে একটা নীলনকশা তৈরী করুন। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে একই সাথে সিন্ডিকেটেড সংবাদ পরিবেশন করতে থাকুন। যত বড় রুই কাতলা কিংবা সন্নাসীই হোক না কেন আপনার পায়ে এসে মাথা ঠেকাতে হবে তাদের। টাকা দিয়ে আপোষ রফা হলে ভালো আর না হলেও ক্ষতি নেই, আগের মতো অসংখ্য বিজ্ঞাপন আপনার পত্রিকাকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে।

এছাড়া ব্যাংকিং সেক্টরে টাকার ছড়াছড়ি। আবার অর্থঋণ আদালত আইন পাশ হওয়ায় আপনার জন্য খুলে গেছে বিজ্ঞাপন পাওয়ার সম্ভাবনার অফুরন্ত দ্বার। যেহেতু ব্যাংকগুলোয় হাজার হাজার ঋণ খেলাপী আছে তাই অর্থঋণ আদালতে মামলার পাহাড় জমে যাচ্ছে। এখন আপনাকে শুধু একটি কাজই করতে হবে আর তা হলো আদালতের সেরেস্তাদারকে একটা পার্সেন্টিজ ধরিয়ে দেয়া। আপনার পত্রিকা যত অখ্যাতই হোক না কেন সেরেস্তাদার আপনার পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়ার জন্য লিখে দেবে ব্যাংকগুলোকে যদিও আপনার পত্রিকার ঠিকানা খুঁজে পেতে বেচারাদের চৈত্র মাসে গরু খোঁজার মতো বিপদে পড়তে হবে। আর আপনার পত্রিকা যদি সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিকগুলোর একটি হয় তবে আউল ফাউল পত্রিকাগুলো আপনার নাকের ডগা দিয়ে সেরেস্তাদারকে টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন নিবে এটা হতে দেয়া যায় না। আপনি আরো বেশি পার্সেন্টেজ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিন অথবা “সব কিন্তু কইয়া দিমু” মার্কা ধমক দিন সেরেস্তাদারকে। এতে একদিকে যেমন আপনার পত্রিকার বিজ্ঞাপন বাড়বে তেমনি দেশের সবচেয়ে আস্থাশীল প্রতিষ্ঠান আদালতও দূর্নীতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত হবে। ফলে আপনার বিজ্ঞাপন পাওয়ার নতুন নতুন দ্বার উন্মোচিত হতে থাকবে।

এছাড়া বিভিন্ন স্থানে যে টেন্ডারবাজি হয় তাতে আপনি রাখতে পারেন অসামান্য অবদান। একটি টেন্ডার যদি শুধু একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান ও তার সহযোগি প্রতিষ্ঠানগুলো অংশগ্রহণ করতে চায় তবে ঐ টেন্ডার বিজ্ঞপ্তিটি সবার নজরে যাতে না আসে সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হয়। এক্ষেত্রে উক্ত প্রতিষ্ঠান আপনার পত্রিকার কাছে আসতে বাধ্য। আপনি আপনার পত্রিকায় বিজ্ঞাপনটি ছাপিয়ে কয়েকটি কপি তাকে ধরিয়ে দিন এবং অবশ্যই নিয়মিত সংখ্যাগুলো থেকে বিজ্ঞাপনটি ছাটাই করে ফেলুন। যদি সমস্যার সম্ভাবনা থাকে তবে উক্ত কপিগুলোতে “ক্ষ্যাত সংক্ষকরণ” মার্কা লেখা সেটে দিন, ঝামেলা চুকে যাবে।

আর আপনি যদি প্রেসের মালিক হিসেবে পত্রিকা বের করে থাকেন তবে তো আর কথাই নেই। একই পত্রিকার মাস্টহেড চেঞ্চ করে যত ইচ্ছে পত্রিকা বের করতে থাকুন। প্রয়োজনে নামী-দামী পত্রিকার মাস্টহেড লাগিয়ে টেন্ডারবাজিতে আপনার অবদান রাখুন।

আর সরকারী বিজ্ঞাপন পাওয়ার জন্য কি কি করতে হবে তা যদি না-ই জানেন তবে আপনি এ লাইনে পা রেখে ভুল করেছেন, অতএব সময় থাকতে মাফ চেয়ে পূর্বের লাইনে ফিরে যান।

বি:দ্র: পত্রিকা চালাতে যে কত্ত কেরামতি দেখাতে হবে তা এ দুই লেখায় পুরো বুঝানোসম্ভব নয়। তাই আবারো লিখছি “অসমাপ্ত”। সময় সুযোগ পেলে পরবর্তী অসমাপ্ত পাঠ দেয়া যাবে।

Be Sociable, Share!

7 Replies to “হলুদ সাংবাদিকতা”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।