ফেলানীর অপরাধের শাস্তি তার মা-বাবাকে দেবেন না, প্লীজ

কয়েকদিন আগে পশ্চিমবঙ্গে বহুজাতিক সমাজবাদী পার্টির বিধায়ক পুরুষোত্তম দ্বিবেদী ধর্ষণের অপরাধে গ্রেফতার হন। আর এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর রাজনৈতিক উত্তেজনায় দলিত মেয়েটির প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে ওঠে। সার্বক্ষণিক মিডিয়ার ক্যামেরার ঝলকানি, নেতা-নেত্রীদের আনাগোনা, ইন্টারভিউ ইত্যাদি ইত্যাদি মেয়েটিকে জীবনকে বিষিয়ে তোলে যে লোকালয় ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য ছটফটিয়ে ওঠে । তবু গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাবার সুযোগ মেলেনা। বাড়ির সামনে রীতিমতো শিবির গেড়ে বিজেপি, কংগ্রেস এবং সমাজবাদী পার্টির কর্মীরা পাহারা বসায়। এমনকি দুই বিধায়ককেও ২৪ ঘন্টা পাহারা দেয়ার বিশেষ নির্দেশ দেয়া হয়। না, মেয়েটির নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং মেয়েটি যাতে তার স্টেটমেন্ট পাল্টাতে না পারে তার জন্য এ ব্যবস্থা। এমনকি মেয়েটিকে ‘চোখে চোখে’ রাখতে মায়াবতী সরকারও দেড়শ পুলিশ মোতায়েন করে। এভাবেই ধর্ষণের ঘটনায় জমে ওঠে রাজনৈতিক নাটক।

৭ জানুয়ারী ২০১১। বিএসএফের হাতে পৈশাচিক নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হায়ার কিশোরী ফেলানী। গুলি খেয়ে কাঁটাতারে ঝুলে ছিল আহত মেয়েটি, দীর্ঘ সময় ধরে রক্তক্ষরণে বিএসএফের চোখের সামনেই প্রাণ হারায় ফেলানী। আর ফেলানীর ঝুলন্ত লাশে বিশ্ববাসী খুঁজে পায় নতজানু পররাষ্ট্রনীতির বাংলাদেশ। ফেলানীর রক্তে জেঁগে ওঠে বিশ্ব বিবেক, বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। শুধু কি তাই? যে সীমান্তে খুন হলো ফেলানী, সেখানকার ভারতীয় নাগরিকেরা বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য সিপিএমের জগাই সাহা বলেন, “ওই কিশোরী যে দেশেরই নাগরিক হোক না কেন, যেভাবে দেহটি বেড়ার উপরে ঝুলছিল তা চোখে দেখা যায় না”। অথচ আমাদের দেশের সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোন প্রতিক্রিয়া আসে নি। ফেলানীর অসহায় পিতাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য ছুটে যায় নি কোন আওয়ামী নেতা। অথচ আজ এতদিন পর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফেলানীর বাবাকে দেখতে যেতে প্রস্তুতি নিয়েছেন। কি জন্য?

সাহারা খাতুনের সফরের খবরে ফেলানীর বাড়িতে আওয়ামী নেতাদের পাহারা শুরু হয়ে গেছে। পুলিশ-বিজিবি আর গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন একপ্রকার এলাকাটি ঘিরে রেখেছে। বাড়ী ঘুরে গেছেন জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এমনকি কুড়িগ্রাম-১ আসনের এমপি এ. কে. এম. মোস্তাফিজুর রহমানও। উদ্ধেশ্য একটাই, ফেলানীকে নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তুলে নেয়া। আর এরই মাঝে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না ফেলানীর বাবা নুরু মিয়াকে, বন্ধ রয়েছে তার মোবাইল, যদিও রামখানা ইউনিয়নের মেম্বারের তথ্য মতে ফেলানীর বাবাকে পুলিশি হেফাজতে নেয়া হয়েছে । স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি তবে ক্রসফায়ারে দিতে যাচ্ছেন ফেলানীর বাবাকে? অবৈধভাবে বর্ডার ক্রস করে ভারত থেকে তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন এ অপরাধে?

ফেলানীর মৃত্যুতে ঘুমন্ত বাংলাদেশ জেগেছে, বিশ্ব বিবেক জেগেছে কিন্তু ফেলানীর পরিবারের তাতে ক্ষতি বৈ কোন লাভ বয়ে এনেছে কি? আজ ফেলানীর বাবার ভিটেমাটি নেই, শ্বশুরের ভাংগা বাড়িতে আদরের সন্তানের শোকে বিলাপ করছেন। ভারত থেকে দেশে এসেছেন, স্ত্রী জাহানারা, মেয়ে মালেকা (১৩), জান উদ্দিন (১০), আরফান (৮), আক্কাস (৬) ও কাজলী (৪) কে রেখে এসেছেন ভারতে, রুটি রুজির একমাত্র দোকানটিও ফেলে এসেছেন, এখন আর ফিরে যাওয়া কি সম্ভব? ভারতের আসাম রাজ্যে বঙ্গাই ভাওলকুড়ি টুনিয়ারপাড়া গ্রামে মুদির দোকান ও রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন তিনি। সেখানকার মানুষের সাথে পরিচয় ঘটলে দোকানের মালিকের কাছ থেকে বাকিতে জিনিসপত্র ক্রয় করে দোকান চালাতেন এবং রিকশা ভাড়া নিয়ে মাঝে মাঝে সংসার চালাতেন। কিন্তু ফেলানীর হত্যাকান্ডে বিশ্বব্যাপী ভারতের ইমেজ সংকট সৃষ্টি হওয়ায় এবং গণমাধ্যমে ফেলানীর মৃত্যুর খবর প্রকাশ ও প্রচার হওয়ায় স্থানীয় লোকজন তাদেন সম্পর্কে জানতে পারায় তারা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। আজ পর্যন্ত মেয়ের কবরটিও  চোখের জলে ভেজানোর সুযোগ হয়নি হতভাগী মা আর ভাই-বোনদের। ফেলানীর বাবা কান্নাজাড়িত কণ্ঠে বলেন, বহু ক্যামরায় ছবি তোলেন, পত্রিকায় খবর উঠান কিন্তু আটকা পড়া স্ত্রী-সন্তানদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেন না কেন?

ফেলানী চলে গেছে, ফিরে আর আসবে না রাজনৈতিক পৃথিবীতে। মরে গিয়ে অপরাধ করেছে ফেলানী, ভারতকে ইমেজ সংকটে ফেলে দিয়েছে, তাঁরকাটায় ঝুলে আওয়ামী সরকারকে নতজানু সরকার হিসেবে প্রমাণ করে গেছে। কিন্তু ফেলানীর অপরাধে সন্তানহারা নুরু ইসলামদের কেন মানসিক যাতনা সইতে হবে? কেন তাকে সাহারা খাতুনদের নিরাপত্তা হেফাজতে বন্দী হতে হবে? ক্রস ফায়ারের ভয় দেখিয়ে কী কথা জোর করে বলাতে চায় সাহারা খাতুন?

ফেলানীর জন্য যদি সরকার কিছু করতেই চায়, তবে ফিরিয়ে আনছে না কেনো ফেলানীর জনমদুঃখী মা আর হতভাগা ভাই-বোনদের, কেন ক্ষতিপূরণ আদায় করছে না তাদের প্রভূদের কাছ থেকে, কেন গড়ে দেয়া হচ্ছে না স্থায়ী ঠিকানা। এসব না করে নিছক রাজনৈতিক উদ্দেশপ্রনোদিত হয়ে ফেলানীর কবর জেয়ারতে বিশেষ কি কোন সুবিধা পাবে ফেলানীর পরিবার? সাহারা খাতুনকি কি কোনদিনও বুঝবেন না, টিভি স্ক্রীনে তাকে দেখে দেখে ক্লান্ত বাংলাদেশ?

দয়া করে এবার থামুন, নাটক বন্ধ করুন, কৃ্ত্রিম সমবেদনার হাতটি সরিয়ে নিন, নুরু ইসলামদের নিজেদের মতো করে প্রাণ খুলে বিলাপ করতে দিন।

Be Sociable, Share!

One Reply to “ফেলানীর অপরাধের শাস্তি তার মা-বাবাকে দেবেন না, প্লীজ”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।