জিয়াকে নামানো হলো তবু বঙ্গবন্ধুর নামে বাতি জ্বালাতে মাটি মেলে না

১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১০ তারিখে মন্ত্রী পরিষদের বৈঠকে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করার সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়। ২২ ফেব্রুয়ারী রাতে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সাইনবোর্ড থেকে জিয়া নামিয়ে ফেলা হলো, পর দিন কাপড়ের ব্যানারে লেখা হলো শাহজালাল (রঃ) এর নাম। বিরোধী দলকে শিক্ষা দিতেই বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করেছি তাতেই তাদের জ্বালা উঠেছে। ২৫২টি প্রতিষ্ঠানেরই নাম পরিবর্তন করা হলে অবস্থাটা কেমন হবে।” তবে প্রকাশ্যে শেখ হাসিনা যা-ই বলুন না কেন শুধুমাত্র স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নামটি মুছে দিতেই বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। অথচ ১ হাজার ৩০০ একর জমির ওপর নির্মিত দেশের সর্ববৃহৎ এ বিমানবন্দরের নির্মানকাজ জিয়া শাসনামলে শেষ হলেও নামকরণটি কিন্তু বিএনপি করে নি। জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর তার প্রতি দেশের কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা ও আবেগকে শ্রদ্ধা জানাতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার বিমানবন্দরটি উদ্বোধন করে এর নাম জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রাখেন।

জিয়া নামে বিমানবন্দরটির নাম পরিবর্তনটা যেমন আওয়ামী লীগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তারচেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নামে বিমানবন্দরটির নামকরণ করা। বিশেষকরে এ বিমানবন্দর ব্যবহারকারী সারাবিশ্বের মানুষের কাছে বঙ্গবন্ধু নামটি পরিচিত থাকবে, যেখানে শুধু এ বিমানবন্দরটি বছরে প্রায় ৫ লাখ যাত্রী ব্যবহার করেন। কে না জানে, প্রচারেই প্রসার। বলা বাহুল্য, প্রবাসী বাংলাদেশীরা এবং সাধারনত উচ্চবিত্তরাই বিমানে ওড়াউড়ি করেন আর এ বিশাল জনগোষ্ঠির মনে জিয়াউর রহমান একটা দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যান জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কল্যাণে। আর এ জন্যই জিয়ার পরিবর্তে মুজিব নামটি প্রতিস্থাপন অত্যন্ত জরুরী ছিল শেখ হাসিনার কাছে।

আওয়ামী লীগের একটি বড় সুবিধা এই যে, দুষ্টবুদ্ধিসম্পন্ন বেশকিছু পরামর্শক দলে ও প্রশাসনযন্ত্রে রয়েছে, যারা কখনো কখনো চমকপ্রদ কিছু বুদ্ধি দেন যা কখনো আওয়ামী লীগের জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনে, কখনো বা তাদের চরমভাবে লাঞ্ছিত করে। জিয়া নাম বদলে বঙ্গবন্ধু আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দর যে কিছুতেই সাধারণ মানুষ মেনে নেবে না তা তারা স্পষ্টতই বুঝতে পেরেছিল আর তাই অদ্ভূত কৌশলের আশ্রয় নেয় সরকার। বিমানবন্দরটির নাম রাতারাতি দেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর আবেগের স্থল হযরত শাহজালাল (রহঃ) এর নামে বদল করা হলো। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সিলেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর, এবং সিলেটের কোন বিষয়ে সহজে কোন বিরূপ মন্তব্য করতে সরকার কিংবা বিরোধীদল কখনোই সাহসী হয় না। আর নির্বাচনী প্রচারাভিযান শুরু, সেতো শাহজালাল (রহঃ) এর মাজার জেয়ারতের মাধ্যমে শুরু করাটাই রেওয়াজ হয়ে গেছে। এইতো সেদিন হবিগঞ্জ উপনির্বাচনী প্রচারাভিযানে স্বৈরশাসক এরশাদ বললেন, মৃত্যুর পর শাহজালাল (রহঃ) এর পাশে কবর দিও। তবে সকলের মনরক্ষা করা শাহজালাল (রহঃ) একার পক্ষে সম্ভব নয় বলে একটি দলই সরকার গঠন করে, একজনই মাত্র সাংসদ নির্বাচিত হয়, একই আসনে একাধিক সাংসদ থাকার নিয়ম নেই যে।

আওয়ামী লীগের কৌশল ছিল শাহজালাল (রহঃ) এর নামের কারনে বিএনপি মর্মপীড়ায় জ্বললেও কিছু বলতে পারবে না, আর যদি বলে তো সাধারণ মানুষের আবেগ বিশেষ করে সিলেটী আবেগকে কাজে লাগিয়ে একটা গন্ডগোল বাধানোর সুযোগ পেত আওয়ামী লীগ। যদিও বিএনপি সে পথে হাটে নি। তবে একজন আধ্যাত্মিক পুরুষকে ষড়যন্ত্রে জড়ানোর কারণে মনে হয় আল্লাহই আওয়ামী লীগকে শিক্ষা দিয়েছেন। জিয়ার নাম নেই, নাম হয়েছে আধ্মাত্মিক পুরুষের, তাতে বিএনপির খুব একটু ক্ষতি হয় নি, বিশেষ করে ইসলামপ্রিয় জনতা বিএনপি ঘেষা। বরং কোন হিন্দু সাধুর নামে কিংবা অতীশ দীপঙ্করের নামে বিমানবন্দরটি হলে আওয়ামী লীগ কিছুটা সুবিধে পেত। কিন্তু আওয়ামী লীগের লাভের লাভ কিছুই হয় নি। আসলে আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর নামে একটি বিমানবন্দরই চাচ্ছিল তাই আড়িয়ল বিলে ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বিমানবন্দর স্থাপনের সিদ্ধান্তও গ্রহণ করে, যদিও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে নতুন আরেকটি বিমানবন্দরের আদৌ কোন প্রয়োজন নেই। কিন্তু পদ্মার উত্তরপাড়ের মানুষে বঙ্গবন্ধুর ইজ্জত রাখেনি। একাত্তরে যেমন তারা পাক হানাদারদের রুখেছিল, এবারও ঠিক স্বাধীনতার আবেগ ব্যবসায়ী আওয়ামী সরকারের ভূমিদস্যুতাকে রুখে দিয়েছে। অথচ সর্বদলীয় এ গণঅভ্যুত্থানকে যুদ্ধাপরাধীদের আন্দোলন বলার মতো ধৃষ্টতা দেখিয়েছে আওয়ামী লীগ।

স্বৈরাচার যত শক্তিশালীই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত জনতার কাছে মাথানত করতেই হয়। শেখ হাসিনাও জনতার দাবী মেনে নিয়ে, বিরোধী দলীয় নেত্রীর দাবী মেনে নিয়ে আড়িয়ল বিলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মানের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন। প্রধানমন্ত্রী অভিমানের সুরেই বলেছেন, বাতি যখন জ্বালাতেই হবে তখন পদ্মার ওপারে (ফরিদপুরে) জ্বালব। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা মেনেই নিলেন আওয়ামী লীগের ফরিদপুর অঞ্চল ছাড়া আসলে কোনস্থানে ঠাই নেই, যায়গা নেই। রংপুর সফরে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, রংপুরে দায়িত্ব আমি নিলাম, তবু রংপুর বাসী তাকে গ্রহণ করেনি, চারদলীয় জোট সমর্থিতদেরই মেয়র নির্বাচিত করে, এমনকি তার ভাইও (** মাসতুতো ভাই) চরমভাবে পরাজিত হন, মাত্র ১টি পৌরসভায় জয়লাভ করে। এভাবেই আওয়ামী লীগ ধীরে ধীরে ফরিদপুরের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আর হবে না-ই বা কেন? প্রশাসনের সকল স্থানে যদি ফরিদপুরে লোকজনে ঠাসা থাকে তখন ফরিদপুরটুকুই যে আওয়ামীলীগের বাংলাদেশ হয়ে যায়।

কিন্তু আসলেই কি পদ্মার ওপারে আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর বাতি জ্বালানোর মতো যায়গাটুকু পাবে? ফরিদপুরের যে সকল বিলে শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর বাতি জালানোর যায়গা খুঁজছেন সেগুলো কিন্তু আড়িয়ল বিলের মতোই সাধারণ মানুষের রুটির রুজির উৎস। বর্ষাকালীন মৎস্য সম্পদ, অর্থকরী সোনালী আঁশ পাট, শীতকালে সরিষা, ইরি, বোরো, রবিশষ্য এতোকিছু কি শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত হবে সাধারণ মানুষ? কি পাবে বিনিময়ে তারা? দিনরাত বিমানের ওঠানামা দেখেতো আর পেট ভরে না বরং দু’ একদিন ভালো লাগতে পারে মাত্র। শেখ হাসিনা বিমানে করে দিল্লি যাবেন, ফরিদপুরবাসী জমায়েত হয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানাবেন, দিল্লি থেকে আবার দাদাবাবুরা আসবেন, তাদেরও দলবেধে বরণ করবেন, এগুলো বছরে দু’য়েকবার ভালো লাগবে কিন্তু উপোষ পেটে দিনের পর দিন এমন নাটক সাধারণ মানুষকে মোহান্ধ করতে পারবে না কিছুতেই।

পদ্মার দক্ষিণ পাড়ে বরিশালে বিমানবন্দর আছে, কোন বিমান চলে না, মাঝে মাঝে গরু-ছাগল চড়ে বেড়ায়। বরিশালে বিমানে চড়ার মতো পয়সা যে কারো নেই তা নয় কিংবা বিমানে ডেক সার্ভিস (লঞ্চের মতো) চালু না করলে বরিশালবাসী বিমানভ্রমন করবেন না এমন ও নয়, বরং সরকারের অবহেলায় দিনে দিনে বিমানবন্দরটি হারিয়ে যাচ্ছে। পদ্মার ওপাড়ে আরেকটি বিমানবন্দর এমন পরিণতিতে পড়বে না তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়? আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলে স্বাভাবিকভাবেই ঢাকার যাত্রী বেশী হবে। ভাংগায় বিমানবন্দরে নেমে যাত্রীদের হাজী শরীয়তুল্লাহ সেতু, পদ্মাসেতু (যদি বিমানবন্দরের আগে নির্মিত হয়), ২য় ও ১ম ধলেশ্বরী সেতু, বুড়িগঙ্গা সেতু পার হয়ে যানজটের রাজ্য আমিনবাজার কিংবা সায়েদাবাদ হয়ে মূল ঢাকায় প্রবেশ করতে হবে। এরপরে বণিক ও ধনিক শ্রেণীর যাত্রীদের যেতে হবে আরো ২-৩ ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরায়। সেতু পারাপারে টোল বাবদ অতিরিক্ত আড়াই হাজারের মতো খরচ হবে যদিও যানজটের তুলনায় তা নস্যি। এখন ভাঙ্গায় যদি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করতেই হয় তবে আরো কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে, তথা ফরিদপুরবাসীর হৃদয় থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলতে হবে (জোর করে বঙ্গবন্ধু নাম গেলাতে গেলে হৃদয় থেকে উগড়ে দেয়াই স্বাভাবিক), ঢাকার পরিবর্তে টুঙ্গিপাড়ায় রাজধানী সরিয়ে নিতে হবে, উন্নত আবাসন সৃষ্টি করতে হবে যা হবে লক্ষ কোটি ডলারের মহাযজ্ঞ।

ভাবতে ভালোই লাগে, কৃষিজমিতে ঝলমলে বিমানবন্দর হবে, নদী খাল বিল ভরাট করে যমুনা-বসুন্ধরা প্রকল্প হবে, দেশের মানুষ কৃষি ছেড়ে রিক্সা চালাবে, কৃষি উৎপাদন বাদ দিয়ে ভদ্রলোকদের মতো বিদেশ থেকে আমদানি করা চাল খাবে আর খেতে না পারলে ৭৪-এর মতো দূর্ভিক্ষে মরে মরে দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।

আজ পর্যন্ত এমন কোন পাগল দেখি নি যে রাস্তায় বাস ট্রাকের তলায় পিষ্ট হয়েছে বরং শত পাগলামির মাঝেও নিজেকে নিরাপদ রাখতে জানে ওরা। কারন পাগলামিরও সীমা আছে। বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দরের নামে আওয়ামী লীগের পাগলামির কোন সীমা পরিসীমা আছে কি না সে প্রশ্ন আপাতত আগামীর রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের জন্য তোলা থাক।

টুঙ্গীপাড়া টু নিউইয়র্ক ভায়া দিল্লি সার্ভিস

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“জিয়াকে নামানো হলো তবু বঙ্গবন্ধুর নামে বাতি জ্বালাতে মাটি মেলে না” লেখাটিতে 2 টি মন্তব্য

  1. delwar jitu বলেছেন:

    jara mokti jodda ,tader kotha sara bangla manuser hridoye ace , kintu hasina jor kore tar nam manuser hridoye likhate chay ,
    kintu ta kon din sofol hobe na ,karon amra rokto dite sikheci proyjon bodhe abar rokto dibo

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    বঙ্গবন্ধুর নাম জোর করে মানুষের হৃদয়ে স্থান দেয়ার আদৌ কি কোন প্রয়োজন আছে? তিনি ইতিহাসের অংশ হয়ে আজীবন বাঙ্গালীর মাঝে বেঁচে থাকবেন। কিন্তু লেবু তেঁতো করার মতো করে আওয়ামী লীগ জোরজবরদস্তি করে শেখ মুজিবের ইমেজকেই বরং প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন