মিথ্যাচারের জন্য শেখ হাসিনার ক্ষমা চাওয়া উচিত

লেখাটি পড়ার আগে ভিডিওটি একবার দেখুন। লেখাটি পুরোপুরি পড়ার পর বারবার মিলিয়ে দেখুন,
কারণ শেখ হাসিনাও ভিডিওটি বারবার দেখেছেন এবং তিনি নিশ্চিত বক্তৃতাটি ৯৬ সালের।
আর আপনার মতটি জানাতে ভুলবেন না যেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন এমন এক বন্ধুর সাথে আজ কথা হলো। কথা প্রসঙ্গে তিনি জানতে চাইলেন, আসলেই কি প্রধানমন্ত্রী ১০ টাকা সের চালের প্রতিশ্রুতি ২০০৮ এ দিয়েছিলেন নাকি ৯৬ তে?  প্রধানমন্ত্র্র্রীর বক্তব্য বলে কথা; তিনি যখন জোর গলায় বলছেন ৯৬ সাল, তখন জ্ঞানী-গুণীরা একটু সতর্ক হবেন এটাই স্বাভাবিক। তবে আমার মনে কোন দ্বিধা ছিল না, কারন দেশের কোটি মানুষের মতো আমি নিজেও আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণায় দশ টাকা সের চালের প্রতিশ্রুতি শুনেছি এবং প্রযুক্তির কল্যাণে ভিডিও দেখেছি। শুধু দেখেছি বললে ভুল হবে, শতবার ভিডিওটি দেখেছি আর হতবাক হয়েছি, সাধারণ মানুষকে বোকা বানাতে সাবেক একজন প্রধানমন্ত্রী কিভাবে মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছেন। আর নির্বাচনে জয়ী হয়ে মুহুর্তের মাঝে ভোল পাল্টে ফেলেন শেখ হাসিনা। তিনি জানেন, গোল্ডফিস মেমোরির বাংলাদেশীরা অতি সহজেই ভুলে যাবে তার মিথ্যে প্রতিশ্রুতি এবং সময় সুযোগ মতো এটাকে বিরোধী দলের মিথ্যাচার বলে প্রচার করলেই হলো। সার্টিফাই করার জন্য বুদ্ধিজীবী আর বউ পাগলা মিডিয়া টাইকুনদের কিনতে কতক্ষণ!

ভিডিওটির শব্দে কিছুটা অস্পষ্টতা আছে, তবে কম ভলিয়্যুমে কয়েকবার শুনলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে শেখ হাসিনার বক্তব্য বিগত চারদলীয় জোট সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরের পরের কোন সময়ের। তিনি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, ” … বিদ্যুতের সমস্যা, আওয়ামী লীগের আমলে বিদ্যুৎ বানিয়েছিলাম, ইনশাআল্লাহ আবার যদি আসতে পারি, বিদ্যুতের উৎপাদন আমরা বাড়াতে পারবো। রাস্তা-ঘাট, পুল, ব্রিজ, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদরাসা, যেভাবে উন্নয়ন করেছিলাম, ঐ বক্তৃতার উন্নয়ন না,  সত্যিকারভাবে মানুষ যাতে সুফল পায় সে উন্নয়ন আমরা করবো। ……. আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব। বিশ টাকা চাল খাব না, ধানের শীষে ভোট দেব না। নৌকা মার্কায় ভোট দেব দশ টাকায় চাল খাব।”

যারা কট্টর আওয়ামীপন্থী তারা ইতোমধ্যে নিশ্চয়ই নড়েচড়ে বসেছেন। বলবেন, আওয়ামী আমল বলতে এখানে শেখ হাসিনা স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামী শাসনামলের কথা বলেছেন। হ্যা, এমনটা মনে হওয়াই স্বাভাবিক এবং এ কথা রাষ্ট্র করেও দেয়া যেত যদি না শেখ হাসিনার ডায়াসে এসটিভি ইউএস-এর মাইক্রোফোনটি না থাকতো। সচেতন মহল নিশ্চয়ই জানেন এটিএন বাংলা ১৯৯৭ সালের ১৫ জুলাই মুম্বাইয়ের এটিএন মিউজিক-এর ব্যানারে সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টা পর্যন্ত ১ ঘণ্টার সময় (চাংক) জিটিভির কাছ থেকে কিনে নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্যাটেলাইট চ্যানেলের জগতে যাত্রা শুরু করে। এর পরে ১৯৯৯ সালে চ্যানেল আই এবং ২০০০ সালে একুশে টেলিভিশন অন এয়ারে আসে, যাদের পথ ধরে এখন বাংলাদেশে স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের ছড়াছড়ি। সম্ভবত ২০০৪ সালের দিকে আমেরিকা ভিত্তিক স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল এসটিভি ইউএস যাত্রা শুরু করে এবং ২০০৭ সালের মাঝামাঝি বাংলাদেশেসম্প্রচার বন্ধ করতে বাধ্য হয়। তবে তখনো টিভি চ্যানেলটির অস্তিত্ব ছিল এবং নিয়মিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানের রিপোর্ট আমেরিকায় সম্প্রচার করতো। চ্যানেলটি আজ আর বেচে আছে কি না জানা নেই। এবার ভাবুন যেখানে ১৯৯৭ সালের পূর্বে পৃথিবীর কোথাও বাংলা স্যাটেলাইট টিভির অস্তিত্বই ছিল না সেখানে কি করে শেখ হাসিনার বক্তৃতা রেকর্ড করার জন্য ৯৬ সালেই ক্যামেরা নিয়ে হাজির হলো এসটিভির ক্রু। উপন্যাসের পাতা থেকে টাইম মেশিন কখন যে বাংলাদেশে চলে এলো দেশবাসী টেরও পেল না?

ভিডিও বিশ্লেষণের বাইরে সরকারী নথিপত্রও স্বীকৃতি দেয় যে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতিটি ৯৬ সালের নয় মোটেই। সরকারি প্রতিষ্ঠান টিসিবির তথ্য মতে, ’৯৬ সালে মোটা চালের সর্বনিম্ন দর ১০ টাকা আর সর্বোচ্চ ১৫ টাকা ছিল। এমনকি ২০০১ সালেও মোটা চাল বিক্রি হয়েছে ১৪ টাকা কেজিতে। চারদলীয় জোট ক্ষমতা ছাড়ার সময় ২০০৬ সালে সর্বনিম্ন দর ছিল ১৭ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১৯ টাকা। আর এ কারণেই নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ঘুরে ফিরে বারবার ১০ টাকা কেজি চালের শ্লোগানে উত্তাল ছিল আওয়ামী সভা-সমাবেশ। গোপালগঞ্জে জনসভায় শেখ হাসিনা কৃষকদের বিনামূল্যে সার এবং বয়স্কদের যাতায়াত ফ্রি করে দেয়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন যা আওয়ামী বান্ধব পত্রিকা প্রথম আলোতেই প্রকাশিত হয়েছিল।

১৯৯৮ সালে হাউজ অব রিপ্রেজেনটাটিভসে মার্কিন রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটন ইমপিচমেন্টের মুখোমুখি হন। হোয়াইট হাইজের শিক্ষানবীশ মনিকা লিউনস্কির সাথে অবৈধ যৌনসম্পর্কের জের ধরে তাকে অপদস্ত হতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রে যৌনতা যদিও ততটা গুরুত্বপূর্ন বিষয় নয় তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিল ক্লিনটন মনিকার সাথে যৌন সম্পর্কের বিষয়ে গণমাধ্যমে মিথ্যে কথা বলে শপথ ভঙ্গ করেন অভিযোগে তাকে ইমপিচমেন্টের মুখোমুখি করা হয়। একজন রাষ্ট্রপতি মিথ্যে বললে তা সত্য বলেই প্রতিষ্ঠা পায় এবং বিল ক্লিনটনের এ মিথ্যাচার প্রথমে সত্য বলেই সাধারণ মানুষ গ্রহণ করেছিল। বাংলাদেশে ঠিক একই রকম পরিস্থিতি বর্তমানে চলছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দেয়া ভাষণ নিয়ে মিথ্যাচার করেছেন। তবে পার্থক্য এই যে, ক্লিনটনের মিথ্যা কথাকে যেমন প্রথমে কেউ ধরতে পারে নি, শেখ হাসিনার মিথ্যে কথাটি বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের কাছে সূর্যালোকের মতোই দীর্ঘদিন ধরেই স্পষ্ট।

লাশ আর মিথ্যাচার এ দুই মূলমন্ত্রে দীক্ষিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আর মিথ্যে বলার ক্ষেত্রে নেতানেত্রীদের মাঝে যেন অঘোষিত প্রতিযোগিতা লেগেই আছে।এ ক্ষেত্রে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যখন জাতীয় সংসদে দাড়িয়ে মিথ্যে কথা বলেন, যা সংসদ টিভির মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে ভুল তথ্য সম্প্রচার করে, তখন তার বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব আনা একান্ত জরুরী। আশাকরি বিরোধী দল চলতি অধিবেশনে সংসদে যোগদান করে প্রধানমন্ত্রীর মিথ্যাচারের তথা দশ টাকা চাল খাওয়ানোর মিথ্যে প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশ জাতিকে বোকা বানানোর অপরাধে তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনবে। এটা ঠিক যে অনাস্থা প্রস্তাবটি সংসদে বাতিল হয়ে যাবে ,কারণ মিথ্যাবাদীদের দল আওয়ামী লীগই ওখানে সংখ্যাগরিষ্ট। কিন্তু সংসদের ইতিহাসে এটি লিপিবদ্ধ থাকুক যে, শেখ হাসিনা মিথ্যেবাদী, মিথ্যে প্রতিশ্রুতির অপরাধে তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়েছিল এটি সংসদে নথিভুক্ত হোক, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম মুখোশের আড়ালের বিভৎস চেহারাটি চিনে রাখতে পারে।

সত্য সমাগত, মিথ্যা অপসৃত, সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী।

 

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“মিথ্যাচারের জন্য শেখ হাসিনার ক্ষমা চাওয়া উচিত” লেখাটিতে 10 টি মন্তব্য

  1. Shohid বলেছেন:

    ভাল লগলো একটা বিশ্লষনধর্মি লেখা উপহার দেয়ার জন্য

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    ধন্যবাদ। অনুপ্রাণিত হলাম। দোয়া করবেন যেন সত্যের পক্ষে আমৃত্যু লিখে যেতে পারি।

    [উত্তর দিন]

  2. চার্চিল বলেছেন:

    মিথ্যা কাকে বলে, কত প্রকার ও কিকি; এবিষয়ে জাতিকে Teaching দিচ্ছেনঅ। সুতরাং মাইন্ড করবেন না। তাঞলে না যুদ্ধাপরাধী মামলার আসামী হবেন কিনতু।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    একদম খাঁটি কথা। আসলে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে বাধাগ্রস্থ করতেই ১০ টাকা সের চালের ভিডিও বিরোধীদল ছড়াচ্ছে 😉

    [উত্তর দিন]

  3. yasir বলেছেন:

    aita ki notun kota……….onito kotai kotai mitta bole,,,,,,,,

    [উত্তর দিন]

  4. yasir বলেছেন:

    shariar bai k onek mubarak bad……..sotto nisto,,,,,,,,,songbad procar korar jonnay

    [উত্তর দিন]

  5. aTOz বলেছেন:

    ২০০৯ সালের মে মাসে আমি সংসার শুরু করেছি। প্রতি মাসে আমি আর আমার বউ বেতন পাবার দিনই বাজারে যেতাম। আমার স্পস্ট মনে আছে সংসারের প্রথম মাসের বাজারে চাল কিনেছিলাম প্রথম আইটেম। মিনিকেট কিনেছিলাম ৩২ / কেজি দরে এবং ৫ কেজি। ঠিক পাশে রাখা ছিল নাজিরশাইল যার দাম লেখা ছিল ৩৫ টাকা/কেজি।

    এবার একটু ভিন্ন কথা। এখানে চালের দাম নিয়ে আমরা সবাই আলোচনা করতেছি, সাধারনত এইসব ক্ষেত্রে চিনিগুড়া / বাসমতি চালের দাম মেনশন করেনা ।যেটা করে তা হল একদম গরিব মানুষ যেটা খায় সেই মোটা চালের কথা। আমার প্রশ্ন হল মিনিকেট মোটামুটি ভাল মানের চাল সেটার দাম ২০০৯ এর মে মাসে ৩২ হলে, মোটা চাল ৪০ ক্যামনে হয়?? তাও আবার ২০০৮ সালে।

    আমার যদি কোন ভুল হয়ে থাকে একটু দয়া করে কেউ ভুল খন্ডন করে দেবেন।

    আপডেটঃ সেই ৩৫ টাকার নাজিরশাইল এই মাসে কিনলাম ৪৮ করে|

    [উত্তর দিন]

  6. K Rahman বলেছেন:

    Tahnks for nice writings

    [উত্তর দিন]

  7. sayed বলেছেন:

    hasina akta mitha badi. protimontri kamrulislam akta pagol.

    [উত্তর দিন]

  8. আবু জাফর খান বলেছেন:

    ধন্যবাদ এত তথ্যবহুল লেখার জন্য

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন