নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি স্বীয় দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করায় দেশের আপামর জনতা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে, দেশ পেয়েছে অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি। কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষ খুশী হলেও জনবিচ্ছিন্ন কিছু অসাধারণ মানুষেরা, মগজের ভারে যারা চলৎশক্তি হারিয়ে ফেলেছে তারা রাষ্ট্রপতির এ মহতি উদ্যোগকে অসাংবিধানিক ও অনৈতিক বলে অভিহিত করেছেন।

রাষ্ট্রপতি যখন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিযুক্তির জন্য একের পর এক উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হচ্ছিলেন তখন সর্বশেষ অপশন হিসেব স্বীয় দায়িত্বের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার ব্যাপারে সাংবিধানিক ব্যাখার জন্য এটর্ণি জেনারেলের সাথে আলোচনা করলে বিরোধী দলীয় নেত্রী মন্তব্য করেন যে এটর্নি জেনারেল সরকার মনোনীত অতএব তার ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়। শেখ হায়েনা মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে ড. কামাল হোসেন, ব্যরিস্টার আমিরুল হকসহ ১৪ দলীয় ৪জন আইনজীবীর ব্যাখ্যা জেনে নিতে উপদেশ দেন। এটর্নি জেনারেল নিরপেক্ষ নন আর ড. কামাল হোসেন, ব্যরিস্টার আমিরুল হক নিরপেক্ষ এমন সমীকরণ শেখ হায়েনা বুঝলেও আমাদের মতো অজ্ঞ সাধারণ পাবলিকের পক্ষে মেনে নেয়া খুবই কঠিন।

আবার আওয়ামী লীগ সংবিধান লংঘন বলে যে মায়া কান্না শুরু করেছে তা বেসুরো মনে হয়। সংবিধানের প্রতি যদি তাদের এতই দরদ তাহলে তো সংবিধান অনুযায়ী সর্ব প্রথম অবশন বিচারপতি কে. এম. হাসানকেই মেনে নিতেন। তাদের যুক্তি হচ্ছে কে. এম. হাসান নির্দলীয় নন এবং তাকে প্রধান উপদেষ্টা করার জন্য বিএনপি-জামায়াত সরকার চাকুরীর বয়সসীমা বাড়িয়েছে। অথচ সংবিধানে স্পষ্ট করে বলা আছে কি করে সংবিধান সংশোধন করতে হয়। সংসদের দুই তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতিতে সংবিধান সংশোধন করা যায় এবং চারদলীয় জোটকে তা করার অধিকার বিগত নির্বাচনে জনগণ দিয়েছে। এতো বড়ো বাঘা বাঘা সংবিধান বিশেষজ্ঞ ১৪ দলে তবে তারা সংবিধানের এ ধারাগুলো ভুলে গেলেন কেন? আর আপনাদের যদি এতে আপত্তি থাকে তবে জনগণের ম্যান্ডেন নিয়ে দুই তৃতীয়াংশ আসন কেন লাভ করলেন না? জনগণ আপনাদের চায় নি, অথচ চার দলীয় জোটকে সংবিধান সংশোধন করার মতো ক্ষমতা দিয়েছে, এটা মানতে আপনাদের এতো কষ্ট কেন? তাহলে কি আপনার সংবিধানের কিছু অংশ মানেন আর কিছু অংশ প্রত্যাখ্যান করতে চান? যদি তাই চান তবে মনে রাখবেন জনগনও আপনাদের ছেড়ে কথা বলবে না।

আবার কে. এম. হাসানকে দলীয় বলে আপনারা তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন অথচ বিচারপতি হাবিবুর রহমানকে আপনারাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান মনোনীত করেছিলেন। অথচ তিনি আওয়ামী লীগের নমিনেশন চেয়েছিলেন বলে সবাই জানে।

সে যা-ই হোক দেশের দূর্দিনে, যখন সাধারণ মানুষ কুকুড়-বেড়ালের মতো অকাতরে আওয়ামী হায়েনাদের বৈঠার আঘাতে প্রাণ বিসর্জন দিচ্ছিল, যখন আওয়ামী ধর্ষকদের হাতে বিবস্ত্র হয়ে ইজ্জত হারাচ্ছিল দেশের মানুষ তখন দেশের জনগণের জান-মাল-ইজ্জতের হেফাজতের জন্য মহামান্য রাষ্ট্রপতির এ উদ্যোগের চেয়ে সাংবিধানিক আর কিছু হতে পারে না। রাষ্ট্রপতির এ উদ্যোগের সাথে সাথেই দেশ শান্ত হয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থেমেছে, হিংসাত্মক যুদ্ধ বন্ধ হয়েছে, এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কি হতে পারে?

সংবিধান মানুষের জন্য, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, মানুষের জান-মাল-ইজ্জতের হেফাজতের জন্য। আর জনগনের জান-মাল-ইজ্জতের জন্য যদি মহামান্য রাষ্ট্রপতি ওদের কথামতো সংবিধান লংঘন করেই থাকেন তবে এভাবে সংবিধান লংঘিত হোক বারে বারে, যুগে যুগে জাতির প্রতিটি ক্রান্তিকালে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ মহামান্য রাষ্ট্রপতি গ্রহণ করায় অনেকেই সংবিধানের বিচ্ছিন্ন অংশ জোড়াতালি দিয়ে মনগড়া ব্যাখ্যা করে জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। আসুন আমরা দেখি বাংলাদেশের সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে কি বলা হয়েছেঃ

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারঃ
৫৮খ। (১) সংসদ ভাংগিয়া দেওয়ার পর বা মেয়াদ অবসানের কারণে ভংগ হইবার পর যে তারিখে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কার্যভার গ্রহণ করেন সেই তারিখ হইতে সংসদ গঠিত হওয়ার পর নূতন প্রধান মন্ত্রী তাঁহার পদের কার্যভার গ্রহণ করার তারিখ পর্যন্ত মেয়াদে একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকিবে।
(২) নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার যৌথভাবে রাষ্ট্রপতির নিকট দায়ী থাকিবে।
(৩) (১) দফায় উল্লেখিত মেয়াদে প্রধান উপদেষ্টা কর্তৃক বা তাঁহার কর্তৃত্বে এই সংবিধান অনুযায়ী প্রজতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা, ৫৮ঘ(১) অনুচ্ছেদে বিধানাবলী সাপেক্ষে প্রযুক্ত হইবে এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরামর্শ অনুযায়ী তৎকর্তৃক উহা প্রযুক্ত হইবে।
(৪) ৫৫(৪), (৫) ও (৬) অনুচ্ছেদের বিধানাবলী (প্রয়োজনীয় অভিযোজন সহকারে) (১) দফায় উল্লেখিত মেয়াদে একইরূপ বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হইবে।
৫৮গ। (১) প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে প্রধান উপদেষ্টা এবং অপর অনধিক দশজন উপদেষ্টার সমন্বয়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হইবে, যাহারা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন।
(২) সংসদ ভাংগিয়া দেওয়ার বা ভংগ হইবার পরবর্তী পনের দিনের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্যান্য উপদেষ্টাগণ নিযুক্ত হইবেন এবং যে তারিখে সংসদ ভাংগিয়া দেওয়া হয় বা ভংগ হয় সেই তারিখ হইতে যে তারিখে প্রধান উপদেষ্টা নিযুক্ত হন সেই তারিখ পর্যন্ত মেয়াদে সংসদ ভাংগিয়া দেওয়ার বা ভংগ হইবার অব্যবহিত পূর্বে দায়িত্ব পালনরত প্রধানমন্ত্রী ও তাঁহার মন্ত্রী সভার তাঁহাদের দায়িত্ব পালন করিতে থাকিবেন।
(৩) রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিগণের মধ্যে যিনি সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত হইয়াছেন এবং যিনি এই অনুচ্ছেদের অধীন উপদেষ্টা নিযুক্ত হইবার যোগ্য তাঁহাকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করিবেনঃ
তবে শর্ত থাকে যে, যদি উক্তরূপ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে পাওয়া না যায় অথবা তিনি প্রধান উপদেষ্টা পদ গ্রহণে অসম্মত হন, তাঁহা হইলে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির অব্যবহিত পূর্বে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করিবেন।
(৪) যদি কোন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে পাওয়া না যায় অথবা তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণে অসম্মত হন, তাহা হইলে রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারকগণের মধ্যে যিনি সর্বশেষে অবসরপ্রাপ্ত হইয়াছেন এবং যিনি এই অনুচ্ছেদের অধীন উপদেষ্টা নিযুক্ত হইবার যোগ্য তাঁহাকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করিবেনঃ
তবে শর্ত থাকে যে, যদি উক্তরূপ অবসরপ্রাপ্ত বিচারককে পাওয়া না যায় অথবা তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণে অসম্মত হন, তাহা হইলে রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারকগণের মধ্যে সর্বশেষে অবসরপ্রাপ্ত অনুরূপ বিচারকের অব্যবহিত পূর্বে অবসরপ্রাপ্ত বিচারককে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করিবেন।
(৫) যদি আপিল বিভাগের কোন অবসরপ্রাপ্ত বিচারককে পাওয়া না যায় অথবা তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণে অসম্মত হন, তাহা হইলে রাষ্ট্রপতি, যতদূর সম্ভব, প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহের সহিত আলোচনাক্রমে, বাংলাদেশের যে সকল নাগরিক এই অনুচ্ছেদের অধীনে উপদেষ্টা নিযুক্ত হইবার যোগ্য তাঁহাদের মধ্য হইতে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করিবেন।
(৬) এই পরিচ্ছেদে যাহা কিছু থাকুক না কেন, যদি (৩), (৪) ও (৫) দফাসমূহের বিধানাবলীকে কার্যকর করা না যায়, তাহা হইলে রাষ্ট্রপতি এই সংবিধানের অধীন তাঁহার স্বীয় দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করিবেন।
(৭) রাষ্ট্রপতি-
(ক) সংসদ সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হইবার যোগ্য
(খ) কোন রাজনৈতিক দল অথবা কোন রাজনৈতিক দলের অঙ্গীভূত কোন সংগঠনের সদস্য নহেন
(গ) সংসদ সদস্যদের আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী নহেন এবং প্রার্থী হইবেন না মর্মে লিখিতভাবে সম্মত হইয়াছেন
(ঘ) বাহাত্তর বৎসরের অধিক বয়স্ক নহেন।
(৮) রাষ্ট্রপতি প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শ অনুযায়ী উপদেষ্টাগণের নিয়োগ দান করবেন।
(৯) রাষ্ট্রপতির উদ্দেশ্যে স্ব-হস্তে লিখিত ও স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে প্রধান উপদেষ্টা বা কোন উপদেষ্টা স্বীয় পদ ত্যাগ করিতে পারিবেন।
(১০) প্রধান উপদেষ্টা বা কোন উপদেষ্টা এই অনুচ্ছেদের অধীন উক্তরূপ নিয়োগের যোগ্যতা হারাইলে তিনি উক্ত পদে বহাল থাকিবেন।
(১১) প্রধান উপদেষ্টা প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদা এবং পারিশ্রমিক ও সুযোগ সুবিধা লাভ করিবেন এবং উপদেষ্টা মন্ত্রীর পদমর্যাদা এবং পারিশ্রমিক ও সুযোগ সুবিধা লাভ করিবেন।
(১২) নূতন সংসদ গঠিত হইবার পর প্রধানমন্ত্রী যে তারিখে তাঁহার পদের কার্যভার গ্রহণ করেন সেই তারিখে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্ত হইবে।
৫৮ঘ। (১) নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি অন্তবর্তীকালীন সরকার হিসাবে ইহার দায়িত্ব পালন করিবেন এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিগণের সাহায্য ও সহায়তায় উক্তরূপ সরকারের দৈনন্দিন কার্যাবলী সম্পাদন করিবেন এবং এইরূপ কার্যাবলী সম্পাদনের প্রয়োজন ব্যতীত কোন নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবেন না।
(২) নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সংসদ সদস্যগণের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য যেরূপ সাহায্য ও সহায়তার প্রয়োজন হইবে, নির্বাচন কমিশনকে সেইরূপ সকল সম্ভাব্য সাহায্য ও সহায়তা প্রদান করিবেন।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন