হাস্যজ্জল “বলতৈল গ্রামের জরিমন ও অন্যান্য”রা

খুব ঠেকায় না পরলে মোবাইলে কাউকে ফোন করেছি এমন দৃষ্টান্ত বিরল। অনেকে আমাকে কৃপন ভাবেন, তবে আমি যে কৃপন নই তার বড় প্রমাণ হলো এই যে, কার্পন্য করার মতো যথেষ্ট অর্থ আমার পকেটে কখনো আসে নি।

অথচ ১৩ অক্টোবর শুক্রবারটা ছিল অন্যরকম। মোবাইলের টাকা নিমেষেই হাওয়া হয়ে গেল কাছের মানুষদের ফোন করে করে। প্রথম বার বাংলাদেশ নোবেল জয় করেছে, এই প্রথম কোন বাঙালী তার মেধাকে বিশ্ব দরবারে মেলে ধরে অর্জন করেছে স্বীকৃতি, দেশের জন্য এরচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত আর একবারও ফিরে আসবে কি না আমার জানা নেই।

ড. ইউনুস প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে তর্ক-বিতর্ক রয়েছে, রয়েছে ভিন্ন মত এবং আমি নিজেও সুদভিত্তিক অর্থনীতির সমর্থক নই, কিন্তু দেশের আটষট্টিহাজার গ্রামের অবহেলিত, সুবিধা বঞ্চিত, অসহায় মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটানোর যে অকৃত্রিম প্রচেষ্টা তাঁর মাঝে বিশ্ব দেখেছে তার স্বীকৃতি দিতে কার্পন্য করার মতো কাপুরুষ আমি নই।

কিছুদিন আগে ড. ইউনুস সম্পাদিত “বলতৈল গ্রামের জরিমন ও অন্যান্য” বইটি পড়ে আবেগাপ্লুত হই। আমার দেশের মায়েরা কেমন করে ক্ষুধার সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকে, দারিদ্র্যের অভিশাপ কিভাবে আমাদের সন্তানদেরকে অনিশ্চিত অন্ধকারে হাকিয়ে হাকিয়ে নিয়ে যায়, পড়ে পড়ে আমার শরীরে শিহরণ জাগে, হৃদয়টা হু হু করে কেঁদে ওঠে।

এমন একটা সময় ছিল যখন জামানতবিহীন ঋণ দান ছিল অকল্পনীয়, দেশের কোন ব্যাংকই সাধারণ হতদরিদ্র মানুষের দুঃখ ঘোঁচাতে, তাদের সক্ষম দুটো হাতকে কাজে লাগাতে জামানতবিহীন টাকা নিয়ে এগিয়ে আসে নি, অভাবী মানুষগুলোকে কে-ই বা বিশ্বাস করতে চায়, টাকা নিয়ে চাল-ডাল কিনেই যে শেষ করে দেবে, ব্যাংকের টাকাগুলো যে জলে চলে যাবে এমনটাই ছিল তাদের চিন্তাধারা।

ড. ইউনুস সেই পুরুষ, যিনি স্বপ্ন দেখেছেন, ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্রমুক্ত, একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশের। দু’বেলা দুমুঠো খাবারের জন্য অনাহারী খেটে খাওয়া মানুষের হাহাকার তার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে, অস্থির করে তুলেছে তাঁকে। ছুটে বেড়িয়েছেন ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে কিন্তু কেউ ক্ষুৎপিপাসায় কাতর এই অচ্ছুৎ মানুষগুলোকে কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায় নি। কারণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাই হলো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বাড়তি সঞ্চয়টুকু হাতিয়ে নিয়ে মুষ্টিমেয় পুঁজিপতিদের হাতে সঁপে দেয়ার জন্য, এর উল্টোটা করার ফুসরৎ কই।

কিন্তু যিনি বাংলার হাহাকার কাছ থেকে দেখেছেন, যিনি বাংলার খেটে খাওয়া মানুষের বিশ্বস্ততায় বিস্মিত হয়েছেন, হাড্ডিসার এক এক জোড়া হাতে যিনি দেখেছেন বিদ্যুতের চমক, তিনি কখনো থেমে থাকতে পারেন না। সাধারণ মানুষকেও যে বিশ্বাস করা যায়, হাড্ডিসার এক একটি হাত যে সোনা ফলাতে পারে তা তিনি প্রমাণে মরিয়া হয়ে ওঠেন এবং ঠিকই প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে দেশের মানুষ ভিক্ষা চায় না, কাজ করে খেতে চায়, কাজ করার শক্তি আছে তাদের, তারা পুঁজি চায়।

তার অক্লান্ত পরিশ্রমে দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প। “জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্রঋণ বর্ষ ২০০৫, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ঋণের অগ্রদূত” পালিত হয়েছে দেশে দেশে শুধুমাত্র তাঁরই জন্য। তাঁর জন্য আজ ব্যাংকগুলো টাকা নিয়ে সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে হাজির হয়েছে লাভের আশায়। যে মানুষগুলোকে তারা বিশ্বাস করে নি সেই মানুষগুলোকে দেয়া ঋণের আদায়ের হার এখন সর্বোচ্চ ৯৯%। এমনকি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডও ১৯৯৫ সালে পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প নামে বিশেষ স্কীম চালু করে গ্রামের হতদরিদ্র মানুষের পাশে দাড়িয়েছে, যদিও তারা ঋণ সুবিধা না দিয়ে পণ্য বিনিয়োগ করছে। এরই ধারাবাহিকতায় অন্যান্য ব্যাংকগুলোও ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে মিছিল ধরেছে সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে।

দীর্ঘজীবী হোন ড. ইউনুস, আমৃত্যু কাটুক সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসায়, যাদের বিশ্বাস করা শিখেয়েছেন আমাদের । ক্ষুধামুক্ত বিশ্বগড়ার যে স্বপ্নে আপনি বিভোর করেছেন বিশ্বের সাড়ে ছয়শ কোটি মানুষকে, সে স্বপ্নের মশাল নিয়ে আমরা এগিয়ে যাব, এতটুকু অঙ্গীকার আপনার কাছে রাখতে চাই।

Be Sociable, Share!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।