একটি স্বপ্নের অপমৃত্যু

সন্তান জন্মের আগ থেকেই সন্তান ডাক্তার না ইঞ্জিনিয়ার হবে তা নিয়ে বাবা-মার মাঝে রিতিমত যুদ্ধ বেঁধে যায়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডাক্তারের জয় হয়। গ্রাম বাংলায় অসুখ বিসুখ অনিবার্য নিয়তি, তাই ডাক্তারের সাথেই সাধারণ মানুষ সখ্যতা, ডাক্তারই বিপদের বন্ধু, কখনো কখনো এদের ফেরেস্তা বলে মনে হয়। বাংলার ঘরে ঘরে তাই শিশুরা মাতৃগর্ভ থেকেই ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছে নিয়ে জন্ম লাভ করে, বেড়ে ওঠে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে, ডাক্তার হওয়াটা হয়ে যায় এইম ইন লাইফ এবং শেষতক এদের কেউ কেউ কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছেও যায়।

এমন একটা স্বপ্ন আমার হৃদয়েও স্থান করে নেয় বাবা-মার প্রবল আগ্রহে। প্রত্যন্ত গ্রামে চিকিৎসার অভাবে আবার কখনো বা ভুল চিকিৎসায় বংশের অনেককেই নির্মমভাবে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয়েছে বলে পরিবারে একজন ডাক্তারের অভাব প্রবলভাবে অনুভূত হচ্ছিল। আর এ অভাব পূরণের পুরো দায় একসময় আমার ঘাড়েই চেপে বসে, বিশেষ করে ক্লাস ফাইভে সেন্টার ফার্স্ট হয়ে ও ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়ে আমার দায়িত্বটা শতগুণ বেড়ে যায়। স্বপ্নটা আমারও যে খারাপ লাগতো তা নয়, বিশেষ করে মাত্র ছয় মাস বয়সে মৃতু্যর হাত থেকে ফিরে এসেছি ড. আতাই রাবি্বর কল্যাণে, তাই তাদের প্রতি একটা আলাদা শ্রদ্ধাবোধ সবসময় কাজ করতো। পেশা দিয়ে যদি প্রশান্তি ও কল্যাণ কেনা যায়, পেশা দিয়ে যদি শ্রষ্টাকে পাওয়া যায়, পেশা যদি হয় ইবাদত তবে ডাক্তারী পেশার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কি হতে পারে?

ডাক্তারদের মাঝে কেউ কেউ আবার অর্জন করে অপার্থিব ক্ষমতা, অন্তত আমার কাছে তাই মনে হয়। বিশেষ করে জাফর আঙ্কেলকে দেখেই অর্ধেক অসুখ সেরে যায়নি এমন রিপোর্ট খুব একটা পাওয়া যায় না। সাধারণ এমবিবিএস পাস এ ডাক্তার আঙ্কল বিপদে আপদে হোন্ডা সিডি এইটিটা চালিয়ে গ্রাম্য মেঠো পথ কিংবা জমির আল ধরে রোগী দেখতে ছুটে যান নি এমন ঘটনা বিরল, হোক না দিন কিংবা গভীর রাত। আবার অভাবী মানুষগুলোকে তিনি এতো আপন করে নিতেন এবং ছলে বলে সম্মানীটুকু ফেরত দিতেন যে আমাদের কাছে তাকে একজন স্বর্গের দূতই মনে হতো। অমন একজন ভালো ডাক্তার হয়ে হাজারো মানুষের দোয়া নিয়ে বেঁচে থাকতে কার না ইচ্ছে হয়? আজো তিনি যে স্টেশনেই কাজ করেন না কেন আমার এলাকার লোকগুলো তার কাছে ছুটে যায় সুচিকিৎসা লাভের আশায়।

ইন্টার পরীক্ষা দিয়েই ভর্তি হয়ে যাই নামকরা একটা মেডিকেল কোচিং-এ। বড় ভাইরা অমিত সম্ভাবনা দেখতে পেলেন আমার মাঝে, ঠাঁই দিলেন মেডিকেল হোস্টেলে। হোস্টেলে যদিও বহিরাগতদের থাকার কথা নয়, তবুও আমার জন্য কিভাবে যেন ব্যবস্থা হয়ে গেল। ফ্রি কোচিং আর ফ্রি যতসব গাইড বই পাওয়ায় ডাক্তার হওয়ার পথে কোন বাধাই রইলো না।

কিন্তু মেডিকেল হোস্টেলে প্রথম দিনই বড় ধরণের ধাক্কা খেলাম। ঠিক লাঞ্চের সময় হলে ঢুকলাম, বড় ভাইরা লাঞ্চ করছেন, খাওয়া থামিয়ে ইঙ্গিতে আমার সিট দেখিয়ে বললেন “খেয়ে এসেছে তো?” আমি অবাক, লাঞ্চের সময় সবে মাত্র শুরু, আর এসেছি বহুদূর পথ পাড়ি দিয়ে, লাঞ্চ করার সময় কোথায়। মিথ্যেই জবাব দিলাম, “হ্যা”। কোলকাতার গল্পগুলো যে এতটা বাস্তব হয়ে ধরা দেবে তা কখনোই বুঝিনি।

এভাবেই দিন যায়, আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব হয়, তুমুল আড্ডা চলে, দেখে মনে হয় একে অন্যের জন্য জীবন দেয়া কোন ব্যাপারই না। অথচ এ বন্ধুত্বের মাঝেও বিস্তর দূরত্ব ছিল। চায়ের দোকানে দাড়িয়ে চা থেতে খেতে তাদের সাথে আড্ডা হয়, মাঝে মাঝে চা-বিস্কিট খাওয়াই কিন্তু কখনোই নুন্যতম সৌজন্য দেখিয়েও তারা চায়ের অফার করে না।

একদিন মুখ ফুটে অনুযোগ করেই ফেলি। বড় ভাইয়েরা গুরুগম্ভীর হয়ে জবাব দেন, সারাদিন পড়াশুনার পর টিউশনি করতে হয়, এতো এতো টাকার বই কিনে পড়তে হয়, এতো কষ্ট করার পর আর সৌজন্য দেখানোর আগ্রহ থাকে না।

হোস্টেলে আমি যার দিকেই তাকাই, একরাশ অন্ধকার দেখি। যে কোন মূল্যে ডাক্তার হওয়াটাই এদের জীবনের একমাত্র টার্গেট, অতপর রোবটিক জীবন। কেন যেন মনে হয়, ওদের মাঝে থেকে থেকে একসময় আমিও মানবিকতা হারিয়ে ফেলব, কোনদিনও জাফর আঙ্কেলের মতো ফেরেস্তো হতে পারবো না। মাঝ রাতে অজপাড়া গা থেকে বিপন্ন মানুষগুলো এসে দরজায় করাঘাত করবে, কিন্তু আমার হৃদয় সিন্ধুতে মানবতার ঢেউ উঠবে না, চিকিৎসার অভাবে মৃতু্য যন্ত্রণায় ছটফট করে শেষ রাতে অঘোরে প্রাণ হারাবে অসহায় মানুষগুলো, ওদের শেষ নিঃশ্বাসটা অভিশাপ হয়ে আমার শরীর ঢেকে দিলেও আমার রোবটিক ভোঁতা স্নায়ুতে কোন অনুরণন হবে না, এমন জীবনের কথা ভেবে ভেবে অস্থির হয়ে উঠি।

অবশেষে আমার স্বপ্নের মৃতু্য হয়, হোস্টেল ছেড়ে, কোচিং ছেড়ে পালিয়ে বাঁচি। আজ আমি জাফর আঙ্কেলের মতো মহাপুরুষ হতে পারিনি বলে দুঃখ হলেও অমানুষ যে হইনি তা ভেবেই স্বস্তি পাই।

[এটি নিতান্তই রোবটিক ডাক্তারদের জন্য, সকল ডাক্তারদের উদ্দেশ্যে লেখা নয়]

Be Sociable, Share!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।