নানা রঙের দিনগুলি (এক)

ক্লাস ওয়ানে বছরের একেবারে শেষ দিকে ভর্তি হলাম। সে এক স্বপ্নের দিন। বাবার হাত ধরে স্কুলে ঢুকে আমি অবাক। এতো ছেলে মেয়ে, এতো হৈ-চৈ, এতো আনন্দ দেখে আমার প্রাণটা খুশিতে ময়ুরের মতো পেখম মেলে নেচে ওঠে।

ক্লাস টিচার নীনা আপা আমার বাবারই ছাত্রী, তাই ক্লাসে ঢুকতেই তিনি আমাকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করলেন। আমি মুগ্ধ, মুহূর্তেই আপাকে ভালোবেসে ফেলি। আজো মনে পড়ে, আমার ভাইবোনের সংখ্যা জিজ্ঞেস করলে নীনা আপাকেও পরিবারের একজন হিসেবে গুণতাম, যদিও বড়রা মুখটিপে হাসাহাসি করতো।

স্কুলটা নতুন হলেও তেমন ভয় লাগে নি, বিশেষ করে আমার পাড়ার একঝাঁক ছেলেমেয়েকে পেয়ে গেলাম স্কুলে। কাসে ছেলেমেয়েরাও দ্রুত আপন করে নিল। কিন্তু এতো ভালোবাসা, এতো আনন্দের মাঝেও আমার কষ্টের কোন সীমা ছিল না। বছরের শেষ দিকে ভর্তি হওয়াতে ক্লাসের পড়াগুলো ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। বন্ধুরা একে একে পড়া বলে যায়, আমি থাকি নির্বাক। আজো মনে আছে ক্লাসে মাত্র এক দিনই উত্তর দিতে পেরেছিলাম তাই সেদিনের কৃতিত্ব আমাকে এতোটা আবেগাপ্লুত করেছিল যে আজো তা হৃদয় ছুয়ে যায়।

এরই মাঝে একদিন আমাদের স্কুলে হাসপাতাল থেকে একটা দল ডাইরিয়া সংক্রান্ত প্রচারণার জন্য এলেন। স্কুলের সব ছাত্র-ছাত্রীকে বড় হলরুমটায় বসানো হলো। হাসপাতালের অতিথিবৃন্দ, স্কুলের প্রধান শিক্ষক, আমার নীনা আপাসহ সকল শিক্ষকই উপস্থিত। একে একে বক্তারা ডায়েরিয়ার ভয়াবহতা ও এ থেকে প্রতিকারের উপায় নিয়ে বক্তৃতা করলেন, আমরা কিছু বুঝলাম, কিছু বুঝলাম না। না বুঝলেও এমন একটা মহামিলনে উপস্থিত হতে পেরে আমাদের বুক গর্বে ভরে গেল।

আলোচনার এক পর্যায়ে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ছাত্র-ছাত্রীদের আহ্বান জানালের খাবার স্যালাইন কি করে বানাতে হয় তা প্রাকটিক্যাল দেখানোর জন্য। কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে তেমন কোন সাড়া পাওয়া গেল না বরং সবাই ভয়ে জড়সড়, স্যার কাকে আবার নাম ধরে ডাক দেয়। অনুমানটা যে মিথ্যে নয় তার প্রমাণ পাওয়া গেল নীনা আপার ডাকে। আপা স্যারদের বললেন, ও যেহেতু প্রফেসর সাহেবের ছেলে ও পারলেও পারতে পারে।

ক্লাস ওয়ানের ছাত্র হিসেবে আমার ভয়ই পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আমি সাগ্রহে এগিয়ে গেলাম। কিছুদিন আগেও যখন আমরা গ্রামে ছিলাম তখন গ্রামে আমাদের বাড়ীতে স্বাস্থ্যকর্মীরা একবার কি করে খাবার স্যালাইন বানাতে হয় তা শিখিয়েছিলেন তাই আমার কাছে স্যালাইন বানানো খুব কঠিন বলে মনে হলো না। এছাড়া নীনা আপা থাকতে আমার ভয়ই বা কিসে? আমি এগিয়ে গেলাম আপার কাছে। আধা সের পানি নিলাম একটা পাত্রের ভেতর, তিন আঙুলের একচিমটি লবন নিলাম, শেষে একমুঠ গুড় ছেড়ে দিয়ে দিলাম পানিতে ঘুটা। ব্যস হয়ে গেল খাবার স্যালাইন।

মুহূর্তেই হাত তালিতে হলরুম ফেটে যাবার জোগার। স্যাররাও হাত-তালি দিলেন। আমি আনন্দে আর লজ্জায় একাকার হয়ে গেলাম। নীনা আপা আমাকে কোলে টেনে নিলেন, আদর করলেন। একটা চামচ হাতে দিয়ে বললেন একে একে সব স্যারকে স্যালাইন খাইয়ে দাও। আমি সবাইকে স্যালাইন খাওয়াই, স্যাররা আমায় আদর করে জড়িয়ে ধরে চুমো খান, স্বাস্থ্যকর্মীরাও কোলে তুলে আদর করলেন, নাম ঠিকানা লিখে নিলেন এবং উপহার হিসেবে দিলেন চকলেট ও সুন্দর একটা বই।

ক্লাসে পড়া না পারার বেদনা আমার মন থেকে উধাও হয়ে গেল, হৃদয়ের গহীনে উপলব্ধি করি অপার্থিব শক্তি। আমি পেরেছি, আমার এই পারার আনন্দ আমাকে সারাটা জীবন সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। যখনই কোন সমস্যায় পরেছি, অতীতের এ স্মৃতি আমাকে শক্তি যুগিয়েছে, আমি পেরেছি, আমি পারবো এ প্রত্যয় জন্মেছে হৃদয়ে।

আসলে ছোট্ট একটু সফলতা এবং সাফল্যের স্বীকৃতি যে কাউকে পৌঁছে দিতে পারে ইর্ষণীয় পূর্ণতায়।

Be Sociable, Share!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।