মানবাধিকার প্রতিবেদন ২০১০ (অধিকার)

সংক্ষিপ্ত বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদন
১ জানুয়ারি – ৩১ ডিসেম্বর ২০১০

১১ জানুয়ারি ২০০৭ থেকে ১৬ ডিসেম্বর ২০০৮ পর্যন্ত বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা বলবৎ ছিলো। জরুরি অবস্থা চলাকালীন সেনা সমর্থিত অনির্বাচিত তত্ত্ববধায়ক সরকারকে উচ্ছেদ করে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা বাংলাদশের জনগণের জন্যে সহজ কাজ ছিলো না। জরুরি অবস্থার পরবর্তীতে ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ এ অনুষ্ঠিত ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট অংশগ্রহণ করে এবং এই নির্বাচনে মহাজোটের বিশাল বিজয় হয়। এরপর ৬ জানুয়ারি ২০০৯ এ জেনারেল হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টিকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরও রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা, প্রয়োজনীয় এবং কার্যকর জাতীয় প্রতিষ্ঠানের অভাব এবং চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন ছিলো বাংলাদেশে গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। মহাজোটের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারে দেশে ন্যায়বিচার, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাসহ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের অঙ্গীকার করে। কিন্তু কার্যত ২০১০ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অনেক ঘটনা ঘটে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নারী নির্যাতনের ঘটনা ছিলো উল্লেখযোগ্য। ২০১০ এ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কার্যকর ও ফলপ্রসূ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গঠনের ব্যর্থতা গণতন্ত্রের চর্চাকে ব্যাহত করেছে। বর্তমান বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, গণতান্ত্রিক পন্থায় সরকার নির্বাচিত হলেই গণতন্ত্র চর্চা অব্যহত থাকবে তা বলা যায় না, যদিনা নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগসহ অপরাপর রাষ্ট্রীয় সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানসমূহ সাংবিধানিক, আইনী এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের প্রতিষ্ঠিত নীতিসমূহের আলোকে দায়িত্ব পালন করে।

জাতীয় সংসদ হলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অন্যান্য জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সকল আলোচনার মূল কেন্দ্র, যেখানে সংসদ সদস্যরা বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং আইন প্রণয়ন করে থাকেন। কিন্তু ২০১০ সালে জাতীয় সংসদের অধিবেশনগুলোতে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। মূলত নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকেই বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা ৩৯ কার্যদিবসের ২১ দিন অধিবেশনে যোগ দেয়। বিরোধী দলের এরকম লাগাতার সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি স্বরূপ। দুইটি প্রধান দলের মধ্যে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে যেমন মানবাধিকারের ঘটনাবলীতে একে অপরকে দোষারোপ করতে দেখা গেছে, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এবং মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে হুমকি। প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যরা সংসদে অনুপস্থিত থেকেও রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করছেন। এক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থে সরকার এবং বিরোধীদলকে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে। এছাড়াও আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে প্রধানমন্ত্রীসহ সংসদ সদস্য ও তাঁদের পরিবারের এবং রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের সম্পদের উৎস ও বিবরণী প্রতি বছর জনসম্মুখে প্রকাশের যে ঘোষণা দেয়া হয়েছিলো তা গত ২৪ মাসেও বাস্তবায়িত হয়নি।

স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরা সরাসরি জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। বাংলাদেশ সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, স্থানীয় প্রতিনিধিদের সংসদ সদস্যদের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করার আইনী কিংবা নৈতিক কোন বাধ্যবাধকতা সরকারের নেই, কিন্তু স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ) আইন ২০০৯ এ উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানদের নিয়ন্ত্রণের বিধান করে স্থানীয় সরকারকে দুর্বল এবং স্থানীয় প্রতিনিধি ও সংসদ সদস্যদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করেছে।

২০১০ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। আইনশৃংখলা পরিস্থিতিও ছিলো নাজুক। ২০০৯-এ ইউনিভার্সাল পিরিওডিক রিভিউ (ইউপিআর) এর শুনানিতে পরাষ্ট্রমন্ত্রী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ দেখানোর কথা বলেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধে সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তা অব্যাহতভাবে চলেছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মধ্যে অন্তর্কলহ, চাঁদাবাজী, টেন্ডারদখল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাস ও অবৈধ হল দখলের মতো ঘটনাগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক নির্যাতন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, রাজনৈতিক সহিংসতা, সভা-সমাবেশ বন্ধে ১৪৪ ধারা জারি, গুম, গার্মেন্টস শ্রমিকদের নির্যাতন ও গ্রেফতার, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠি ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে ২০১০ সালে।

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বাংলাদেশের ভূমি দখলসহ বাংলাদেশী নাগরিকদের হত্যা, নির্যাতন, অপহরণ চালিয়ে যাচ্ছে। দুটি দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সীমান্ত সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ গত কয়েক দশক ধরে চরম সংযম প্রদর্শন করে এই সমস্যা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের জন্যে আহবান জানিয়ে আসছে। কিন্তু ভারত সরকার বা তাদের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর দিক থেকে কোন আশাপ্রদ মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়নি। প্রতিনিয়ত সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফ বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা, নির্যাতন ও অপহরণের শিকার হয়েছেন। এছাড়াও ভারতের উওর-পূবাঞ্চলীয় বিভিন্ন রাজ্যের ‘আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার’ আদায়ের সংগ্রামে নিয়োজিত নেতাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকে গ্রেফতারের পর ভারতীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নিজেদের জীবন রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে ‘আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার’ আদায়ের সংগ্রামে নিয়োজিত এই ভিন্নমতাবলম্বী নেতারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ (১) এর গ অনুচ্ছেদে বলা আছে, “……..রাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ বা বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করিবেন।”

অধিকার এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১০ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে ক্রসফায়ারে র‌্যাব এবং নির্যাতনের ক্ষেত্রে পুলিশ ছিলো প্রধান অভিযুক্ত। সন্ত্রাস দমন আইন ২০০৯ ও বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন আইন ২০০৬ এর মাধ্যমে বিরোধীদের দমন এবং গোপনীয়তার অধিকারসহ অন্যান্য মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন করা হয়েছে। আদালত অবমাননা আইন ১৯২৬ এবং সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ এর ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতার সঙ্গে বিরোধপূর্ণ অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন আইনী সংশোধনীর মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানসমূহকে অকার্যকর, অগ্রহণযোগ্য ও নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়াস ছিল বছর জুড়ে।

মানবাধিকার রক্ষার আন্দোলনে সোচ্চার হওয়ায় ২০১০ সালে অধিকার সরকারের রোষাণলে পড়ে। পুলিশের বিশেষ শাখা এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা অধিকার এর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে এবং সংগঠনের সেক্রেটারি ও পরিচালক সম্পর্কে খোঁজ খবর নিচ্ছে। অধিকার এর দুটি প্রকল্প গত ৫ মাস যাবত এনজিও বিষয়ক ব্যুরো’র অনুমোদনের অপেক্ষায় আটকে আছে। এনজিও বিষয়ক ব্যুরো’র পরিপত্র অনুযায়ী প্রস্তাবিত প্রকল্প প্রাপ্তির ৪৫ দিনের মধ্যে প্রকল্পের অনুমোদন দেয়ার বিধান থাকলেও গত ৫ মাসেও তা আলোর মুখ দেখেনি।

২০১০ সালের মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র

১. বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধে সরকার বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা ২০১০ সাল জুড়েই অব্যাহত ছিল। আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী আইন ভঙ্গ করে সন্দেহভাজন ব্যক্তি, বিপ্লবী বামপন্থি এবং নিরীহ ব্যক্তিদেরকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করেছে। ২০১০ সালে ১২৭ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ডগুলো সংগঠিত হয়েছে র‌্যাব ও পুলিশ অথবা র‌্যাব পুলিশের যৌথ বাহিনী কর্তৃক। অধিকার এর তথ্যানুযায়ী ২০১০ সালে প্রতি ৩ দিনে গড়ে ১ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। অধিকার এর সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ১২৭ জনের মধ্যে তথাকথিত ‘ক্রসফায়ার’-এ ১০১ জন, নির্যাতনে ২২ জন এবং গুলিতে ২ জন এবং ২ জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এঁদের মধ্যে র‌্যাবের হাতে ৬৮ জন, পুলিশের হাতে ৪৩ জন, র‌্যাব-পুলিশের যৌথ অভিযানে ৯ জন, র‌্যাব-কোস্টগার্ডের যৌথ অভিযানে ৩ জন, র‌্যাব-পুলিশ- কোস্টগার্ডের যৌথ অভিযানে ৩ এবং বিডিআর এর হাতে ১ জন নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

২. নির্যাতন

২০১০ সালে ৬৭ জন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক নির্যাতিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এঁদের মধ্যে ১১ জন র‌্যাবের হাতে এবং ৫৬ জন পুলিশের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৬৭ জনের মধ্যে ২২ জন নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন।

৩. জেল বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে মৃত্যু

২০১০ সালে ১১০ জন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে মারা গেছেন। এঁদের মধ্যে ০৬ জন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে থাকাকালীন সময়ে ক্রসফায়ারে, ২২ জন নির্যাতনে এবং ০১ জন গুলিতে মারা গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া এই সময়ে ৬০ জন ব্যাক্তি জেল হেফাজতে ‘অসুস্থতাজনিত’ কারণে মারা গেছেন। এ সময়ে ০২ জন ব্যক্তি কোর্ট হেফাজতে, ০২ জন থানায় এবং ০১ জন র‌্যাব হেফাজতে মারা গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিডিআর বিদ্রোহের অভিযোগে আটক ১৫ জন বিডিআর সদস্য জেল ও অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে মারা গেছেন।

৪. গুম

২০১০ সালে ১৬ জন ব্যক্তি আইন শৃংখলা বাহিনীর হাতে গুম হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ভিকটিমের পরিবারগুলোর অভিযোগ উল্লিখিত ব্যক্তিকে সাদা পোষাকধারী আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা র‌্যাব ও পুলিশের পরিচয় দিয়ে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।

৫. রাজনৈতিক সহিংসতা

২০১০ সাল জুড়েই প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতার মাত্রা ছিলো ব্যাপক। প্রধান দল দুটি উভয়েই একে অপরকে দোষারোপ করতে ব্যস্ত থেকেছে। অধিকার এর তথ্য অনুযায়ী ২০১০ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় ২২০ জন নিহত এবং ১৩,৯৯৯ জন আহত হয়েছেন। এ সময়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ৫৭৬টি এবং বিএনপি’র ৯২টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে ৩৮ জন নিহত এবং ৫৬১৪ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ সংঘাতে ৭ জন নিহত ও ১১৪৬ জন আহত হয়েছেন। এ সময়ে সভা-সমাবেশ বন্ধ করতে প্রশাসন বিভিন্ন এলাকায় ১১৪ বার ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করে।

৬. নির্বাচনী সহিংসতা

অধিকার এর তথ্যানুযায়ী ভোলা-৩ আসনের উপ-নির্বাচনে নির্বাচনী সহিংসতায় ২১৮ জন আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে প্রাক নির্বাচনী সহিংসতায় ১০৯ জন, নির্বাচনের দিন ৪৬ জন এবং নির্বাচনোত্তর সহিংসতায় ৬৩ জন আহত হয়েছে বলে জানা গেছে।

৭. হরতাল

২০১০ সালের জুন ও নভেম্বর মাসে বিএনপি তিনটি হরতাল আহ্বান করে। হরতাল চলাকালে বিএনপি’র সমর্থকদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। এতে সারা দেশে হরতাল সমর্থকসহ ৩৫৫ জন আহত হন এবং পুলিশ ১৬৭ জন পিকেটারকে আটক করে। এছাড়া হরতালের আগের দিন হরতাল সমর্থনকারীরা যানবাহন ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।

৮. সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা

২০১০ সালে সাংবাদিকরা বিভিন্নভাবে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সময়ে ০৪ জন সাংবাদিক নিহত, ১১৮ জন সাংবাদিক আহত, ৪৩ জন লাঞ্ছিত ও ৪৯ জন হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন। এ সময় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে ১৭ জন সাংবাদিকের ওপর হামলা, ০২ জনকে গ্রেফতার, ০১ জন অপহৃত ও ১৩ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

৯. তৈরি পোশাক শিল্প শ্রমিকদের অবস্থা

২০১০ সাল জুড়ে ছিলো তৈরি পোষাক শিল্প কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা। শ্রমিকদের বকেয়া বেতন এবং ন্যূনতম মজুরি ৫ হাজার টাকার দাবিতে সৃষ্ট শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাঁধে। সংঘর্ষে ৭ জন শ্রমিক নিহত এবং ২৫৩৮ জন শ্রমিক আহত হয়। এসব ঘটনায় শ্রমিক নেতা মন্টু ঘোষ, মোশরেফা মিশু, বাহারানে সুলতান বাহার সহ ২৫৯ জন শ্রমিককে গ্রেফতার করা হয় এবং তাঁদেরকে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

১০. বিএসএফ কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘন

২০১০ সালে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এ বছর ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ৭৪ জন বাংলাদেশীকে হত্যা করে। এঁদের মধ্যে ২৪ জনকে নির্যাতন এবং ৫০ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সময়ে ৭২ জন বিএসএফএর হাতে আহত হয়েছেন। বিএসএফ’র হাতে আহত ৭২ জনের মধ্যে ৩২ জন নির্যাতিত ও ৪০ জন গুলিবিদ্ধ হয়। একই সময়ে ৪৩ জন বাংলাদেশী বিএসএফ’র হাতে অপহৃত হয়েছেন।

১১. নারীর প্রতি সহিংসতা

২০১০ সালে নারীর প্রতি সহিংসতা অব্যাহত ছিল। এ সময় বহু নারী ধর্ষণ, যৌতুক, এসিড সন্ত্রাস এবং যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। মূলতঃ নারীর প্রতি সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী, আইন ও বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা, ভিকটিম ও সাক্ষীর নিরাপত্তার অভাব, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্নীতি, নারীর অর্থনৈতিক দূরবস্থা, দুর্বল প্রশাসন ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে নারীরা নির্যাতিত হচ্ছেন ও ভিকটিম নারী বিচার না পাওয়ায় অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছে ও গাণিতিকহারে সহিংসতার পরিমান বেড়েই চলেছে।

ধর্ষণ : ২০১০ সালে মোট ৫৫৬ জন নারী ও মেয়ে শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে জানা গেছে। এঁদের মধ্যে ২৪৮ জন নারী এবং ৩০৮ জন মেয়ে শিশু। উক্ত ২৪৮ জন নারীর মধ্যে ৬১ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং ১১৯ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এছাড়া ২ জন নারী ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন। ৩০৮ জন মেয়ে শিশুর মধ্যে ৩০ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং ৯৩ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এছাড়া ৪ জন মেয়ে শিশু ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করে।

যৌতুক সহিংসতা: ২০১০ সালে ৩৮৭ জন নারী ও শিশু যৌতুক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এঁদের মধ্যে ২৪৩ জনকে যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে এবং ১২২ জন বিভিন্নভাবে অমানবিক আচরণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময়ে ২২ জন নারী যৌতুকের কারণে নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন।

যৌন হয়রানি: ২০১০ সালে ৩২৬ জন নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। এঁদের মধ্যে ৭ জন বখাটেদের হাতে নিহত, ১২৯ জন লাঞ্ছিত/আহত, ২৫ জন আত্মহত্যা, ৫ জন অপহৃত হন। এ ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে ১৪ জন পুরুষ যৌন হয়রানিকারী বখাটেদের হাতে আক্রান্ত হয়ে নিহত এবং ১২৭ জন আহত হন।

১২. এসিড সহিংসতা

২০১০ সালে ১৩৭ জন এসিড সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এঁদের মধ্যে ৮৪ জন নারী, ৩২ জন পুরুষ এবং ২১ জন শিশু। এছাড়া ২১ জন শিশুর মধ্যে ১৬ জন মেয়ে শিশু এবং ৫ জন ছেলে শিশু এসিডদগ্ধ হয়।

১৩. ধর্মীয় জাতিগত সংখ্যালঘ গোষ্ঠীর মানবাধিকার লঙ্ঘন

২০১০ সালে ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ২ জন নিহত এবং ২৪৪ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ২৩টি মন্দির ভাংচুর হয়েছে। অপরদিকে জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর হামলার ঘটনায় ৬ জন নিহত এবং ১৪০ জন আহত হয়েছেন।

১৪. গণপিটুনীতে মৃত্যু

২০১০ সালে ১৭৪ জন ব্যক্তি গণপিটুনীতে মৃত্যুবরণ করেছেন।

১৫. বিডিআর সদস্যদের বিচার

২০১০ সাল জুড়েই অধিকার বিডিআর বিদ্রোহের মামলার তদন্ত ও বিচার কাজ পর্যবেক্ষণ করেছে। এ সময়ে ১১টি রাইফেলস ব্যাটালিয়নে বিডিআর সদস্যদের বিচার সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে পঞ্চগড় ২৫ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন, ঠাকুরগাঁও ২০ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন, ফেনী ১৯ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন, সাতক্ষীরা ৭ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন, রাঙামাটি ১২ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন, সুনামগঞ্জ ৮ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন, লালমনিরহাট ৩১ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন, বান্দরবান ১০ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন, জয়পুরহাট ৩ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন, সিলেট ২১ রাইফেলস ব্যাটালিয়ন ও সিলেট ৩৮ রাইফেলস ব্যাটালিয়নে বিচারের রায় ঘোষণা করা হয়েছে।

পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পড়তে ক্লিক করুন

শেষ

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন