রমজান নিয়ে ভাবনা

বছর ঘুরে রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের বারতা নিয়ে পশ্চিমাকাশে উদিত হয়েছে একফালি বাঁকা চাঁদ। তাই
রমজানকে ঘিরে মুসলিম আম-জনতার মাঝে উৎসাহ উদ্দীপনার শেষ নেই। রমজানকে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করার জন্য সকলের মাঝেই এক ধরণের ব্যাকুলতা, অনাবিল আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে সবার মনে, যার কোন শেষ নেই, পরিসীমা নেই।
রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস মাহে রমজান। মানবজাতির হেদায়েতের জন্য আল্লাহ তায়ালার পবিত্র বাণী
সম্বলিত কিতাব আল-কুরআন নাজিলের মাস মাহে রমজান। রমজান মাস সিয়াম সাধনার মাস, আত্মশুদ্ধির মাস,
ধৈর্যের মাস, সহিষ্ণুতার মাস, অন্যের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার মাস, ইসলামী ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের মাস। এ মাসের মধ্যেই রয়েছে এমন একটি রাত যে রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। আর এ মাসের ১৭ তারিখেই বদর প্রান্তরে সংঘটিত হয়েছিল ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধ, যে যুদ্ধে মাত্র ৩১৩ জন জানবাজ আল্লাহর অকুতোভয় মুজাহিদ বদর প্রান্তরে গোটা পৃথিবীর বাতিল মতাদর্শী শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, ছিনিয়ে এনেছিল ইসলামের প্রথম বিজয়।
এ মাসের উদ্দেশ্য সম্পর্কে মহান রাব্বুল আ’লামীন পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের
উপর রোযা ফরজ করা হয়েছে যেভাবে করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা তাকওয়া
(পরহেজগারী) অর্জন করতে পার।”
যুগে যুগে সকল নবী-রাসুল ও তাঁদের উম্মতদের জন্য রোজা পালন করাকে ফরজ করেছেন পরম করুণাময় আল্লাহ তা’য়ালা, যাতে মানুষ অর্জন করতে পারে খোদাভীতি ও তাকওয়া, পায় সঠিক পথের দিশা । মূলত রোজা রাখা বা না রাখা, নামাজ পড়া বা না পড়া, ন্যায়ের পথে চলা বা না চলা এর কোন কিছুতেই আল্লাহ তা’য়ালার লাভ বা তি নেই। আল্লাহ মানুষের জন্য যতগুলো ইবাদত নির্ধারণ করেছেন এ সকলই মানুষের কল্যাণের জন্য। তাই একজন বান্দা হিসেবে মানুষের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে আল্লাহ তা’য়ালার কাছে নিজেকে সঁপে দেয়া, আত্মসমর্পন করা, তাঁর নির্ধারিত পথে চলা, অন্যায়কে পরিহার করা ও ন্যায়ের পথে চলা।
প্রকৃতিগতভাবে প্রত্যেক মানুষ আস্তিক হয়ে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু সময়ের পরিভ্রমনের সাথে সাথে অনৈতিক পরিবেশ তাদেরকে আল্লাহর বিধান সম্পর্কে গাফেল করে ফেলে। তাই সঠিক পথে ফিরে আসতে তার দরকার হয়ে পরে এমন একটি সময়ের, এমন একটি পরিবেশের যখন অন্যায়ের ও অসত্যের দাপট থাকে অনেকটা কম, সত্যের সুবাতাস প্রবাহিত হয় চারিদিকে। আর তেমনি একটি সময় হচ্ছে পবিত্র মাহে রমযান। এ মাসে শয়তানকে শৃংখলিত করে রাখা হয়। রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “যখন রমযান মাস আসে, জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানদেরকে শৃংখলিত করে রাখা হয়”। ফলে সাধারণ দিনগুলোর চেয়ে রমযান মাসে মানুষ আল্লাহর অনেক সাহ্নিধ্যে চলে আসে। আর এর তো প্রমাণ আমরা রমযানের প্রতিটি দিনই দেখতে পাই। এ মাসে মসজিদগুলো কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়, যেন ফারাক্কা বাধ খুলে দিয়ে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে পদ্মার দু’কুল।
রমযান মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে সাওম পালন করা। রোযার মাস হচ্ছে ইবাদত-বন্দেগীর মাস। রোজার মাসে একটি নফলের মর্যাদা সাধারণ মাসের ফরযের সমান, আর ফরযের মর্যাদা সাধারণ মাসের ৭০ টি ফরযের সমান। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত রোযার মাসের তাৎপর্য ও মাহত্মকে সামনে রেখে পূর্ণ মর্যাদার সাথে রোজা পালন করা। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) রোজাকে ঢাল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ঢাল যেমন যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর আঘাত থেকে যোদ্ধাকে রা করে, পিকেটারের ইটার আঘাত থেকে রা করে দাঙ্গা পুলিশকে ঠিক তেমনি রোজাও মুসলমানদেরকে রা করে যাবতীয় অন্যায়, অশ্লীলতা, পাপাচার ও মিথ্যা থেকে। আর যদি রোজা রাখার পরও একজন মুসলমান অন্যায় ও অশ্লীলতাকে পরিহার করতে পারলো না, তার চেয়ে দূর্ভাগা আর কে হতে পারে।

রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও খারাপ কাজ বর্জন করেনি, তার পানাহার ত্যাগ করায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই”।
রাসুল (সাঃ) এর এ সুস্পষ্ট ঘোষণার পরও আমরা সমাজের দিকে তাকালে হতাশ না হয়ে পারি না। আমাদের সমাজে এক শ্রেণীর লোক পবিত্র রমজান মাসকে পুঁজি করে অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে টাকার কুমির হওয়ার চিন্তায় এগারোটি মাস পার করে দেয়। রমযান আসলেই এ সকল অসাধু ব্যবসায়ী নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিতে তৎপর থাকে। অথচ রাসূল (সাঃ) এ ধরণের হীণ কাজ করা থেকে সকলকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন, আর সৎ ব্যবসায়ীদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। অথচ এসকল লোক জান্নাতের চেয়ে দুনিয়াকেই আসল ঠিকানা মনে করে বসে আছে, রোজাকে বানিয়ে রেখেছে ব্যবসায়ের হাতিয়ার। এদের সাথে হাত মিলিয়েছে আড়ৎ ব্যবসায়ী সমিতি, খালাসী ও পুলিশ বাহিনী। এ সকল অসাধু ব্যবসায়ীরা কাাঁচাবাজারে পর্যাপ্ত দ্রব্যসামগ্রীর সরবরাহ থাকলেও বিভিন্ন অযুহাতে চড়া দামে জিনিসপত্র বিক্রি করছে।
রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “রোজাদারের জন্য দু’টি খুশী। একটি খুশী ইফতারের সময়, অপরটি পরওয়ারদিগারের সাাৎ লাভের সময়”। তাই রোজাদারের এ দু’টি খুশির একটি থেকে বঞ্চিত করার অধিকার কারও নেই।

রমজান মাসকে পুঁজি করে ইদানিং পত্রপত্রিকাগুলো নোংরা প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। দেশের প্রধান প্রধান
পত্রিকাগুলো রমজানের শুরুতেই পাঠকের হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে রোজার আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক ঢাউস আকারের ঈদ সংখ্যা। তাদের বক্তব্য হচ্ছে রমজানের বোরিং কাটানোর জন্য সবাই একটা কিছু পড়ে সময় কাটাতে চায়। তাই তারা রমজানের শুরুতেই রমজান শপিং ব্যাগে একটি করে ম্যাগাজিন ঢুকিয়ে দিচ্ছে। আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি ঈদ সংখ্যার নামে প্রকাশিত এসকল পত্রিকায় কি লেখা রয়েছে? এদেশের ইন্টেলেকচুয়ালদের বাসায় শোভা পায় একটি নামি সাপ্তাহিক। যার সম্পাদক বিদেশী নোংরা সংস্কৃতি আমদানীতে সদা তৎপর। পত্রিকাটির ঈদ সংখ্যা বা বিশেষ সংখ্যাগুলোতে চোখ রাখলে অবৈধ পরকীয়া প্রেম, যৌন মিলন ও যৌন উদ্দীপক রগরগে লেখার প্রাধান্যই বেশী দৃষ্টিগোচর হয়। মূলত এরা ঈদকে হিন্দুরের দূগাপূজার মতো একটি উৎসব মনে করে। তেমনি এরা ইসলামকেও অন্যান্য ধর্মের মতো একটি মানুষের মনগড়া একটি সাধারণ ধর্ম মনে করে। এরাই মূলত ধর্ম ব্যবসায়ী অথচ এরা ধর্মের অনুসারীদেরকে ধর্মব্যবসায়ী বলে গালি দিতে অভ্যস্ত। তাহলে রমযানের এই পবিত্র মাসে হালাল পয়সা দিয়ে ইসলামী আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক এসকল ম্যাগাজিন আমরা
কেন কিনব, পাঠক একটু ভেবে দেখবেন।
রমযান মাস হচ্ছে কোরআন নাজিলের মাস। পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, “রমজান ঐ
মাস, যে মাসে কোরআন নাজিল করা করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য আগাগোড়াই হেদায়েত, যা এমন স্পষ্ট উপদেশে পূর্ণ যে, তা সঠিক পথ দেখায় এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য পরিস্কারভাবে তুলে ধরে”। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিৎ পবিত্র কুরআনকে ভালভাবে বোঝার চেষ্টা চালানো। কেননা কোরআনের একটি আয়াত শিা করা ৭০ রাকায়াত নফল নামাজের চেয়েও উত্তম। তাহলে বিদগ্ধ পাঠক একবার চিন্তা করে স্থির করুন, আপনি কোরআন পড়া ও কোরআন বুঝার চেষ্টা চালাবেন না কি ইন্টেলেকচুয়াল নোংরামিতে পূর্ণ ম্যাগাজিন পড়বেন।
রমজান মাসকে কেন্দ্র করে আর একশ্রেণীর বিকৃত চিন্তাচেতনার লোক বাংলা সিনেমা নামক অশ-ীল ও কুরুচিপূর্ণ পর্নো ছবি বানাতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। কিছুদিন পূর্বে মাদারীপুওে একটি সিনেমার পোস্টার দেখে হতবাক হয়ে যাই। দেয়ালে দেয়ালে সাটা ০০৭ নামের একটি সিনেমার অশ-ীল দৃশ্য। মৌথুনরত
সম্পূর্ণ নগ্ন পুরুষ ও মহিলা ছবি দেয়া আছে পোস্টারে। ভাবতেও অবাক লাগে একটি মুসলিম প্রধান দেশে প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন সিনেমা কিভাবে সেন্সর বোর্ডের অনুমোদন পায়।
দিনে দিনে বাংলাদেশে সিনেমা ব্যবসায় ধ্বস নামছে। সাধারণ দর্শক আজ আর অশ-ীল ছবি দেখতে চায় না। এরপরও কেন তারা এ ধরণের নোংরা ছবি প্রদর্শন করে তা বোধগম্য নয়।
দেশে রমজানকে কেন্দ্র করে যে হাজার ধরণের অপকর্ম সংঘটিত হয় তার কয়েকটি পাঠকদের সামনে তুলে ধরা
হলো। আশাকরি পাঠক এগুলোকে এড়িয়ে চলতে সম হবেন এবং রোজার প্রকৃত শিা গ্রহণে ব্রতী হবেন। তাহলেই আল্লাহ প্রতিশ্রুত রাইয়ান নামক দরজা দিয়ে আমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে সম হবো। রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি একদিন আল্লাহর পথে রোযা রাখবে, আল্লাহ তার মুখমন্ডল জাহান্নাম হতে ৭০ বছর দূরে সরিয়ে রাখবেন”।
আল্লাহ আমাদের সকলকে রোজার প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করে সঠিক নিয়মে রোজা পালনের তৌফিক দিন।
আমীন।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন