বেঁচে থাকার অপরাধে মৃত্যুদন্ড

আপনাদের কি মনে আছে ২০০০ সনের আগস্ট মাসের সেই টান টান উত্তেজনায় বিশ্ব কাঁপানো দিনগুলোর কথা? সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ হুমড়ি খেয়ে দিনের পর দিন পড়েছিল বিবিসি, সিএনএন, টিভি রেডিওর সামনে। বিশ্বের প্রতিটি কোনে কোনে সময় সচেতন মানুষেরা প্রাথর্ণা করেছিল মৃত্যুর সাথে অসীম সাহসে যুদ্ধরত ১১৮টি অকুতোভয় সৈনিকের শুভ কামনায়। হ্যা, আমি কুরস্ক দূর্ঘটনার সেই দুঃস্বপ্নের দিনগুলোর কথা বলছি। সেদিন ১১৮জন নাবিক নিয়ে পারমানবিক ডুবোজাহাজ কুরস্ক ডুবে যাওয়ার দু’ঘন্টা পরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কৃষ্ণ সাগরে দীর্ঘকালীন অবকাশ যাপনের গেলেও মানবিক বোধসম্পন্ন কোটি কোটি মানুষের দৃষ্টি ছিল টেলিভিশনের পর্দায়। সেদিন বাংলাদেশী দর্শকরাও স্বজন হারানোর ব্যাথা নিয়ে উদ্ধার অভিযানের খবরাখবর নিতে ছিলেন উদগ্রীব। আসলে ক্ষমতায় থাকলে মানবতাকে বুঝি ঝেটিয়ে বিদেয় করতে হয় নইলে অমন চাঞ্চল্যকর দূর্ঘটনায় নির্বিকারভাবে সরকারের প্রধান ব্যক্তিটি কি করে হেসে খেলে বেড়ালেন অবকাশযাপন কেন্দ্রে। কুরস্ক দূর্ঘটনায় পুতিনের সেদিনের নির্বিকার আচরণ সাধারণ মানুষকে বিক্ষুদ্ধ করে, এক সপ্তাহে পুতিন সরকার ৮% জনপ্রিয়তা হারায়। প্রকৃত বিষয় এই যে, রাজনীতিবিদেরা শুধুই রাজনীতি বোঝেন, মানুষ বোঝেন না।

গতবছর আগস্টে এমন আরেকটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় বিশ্ববাসী। ৫ আগস্ট চিলির উত্তরাঞ্চলের সান হোসে খনি ধসে ৩৩ জন শ্রমিক ৬২২ মিটার মাটির নিচে আটকা পড়েন ৷ এত নিচে শ্রমিকরা আটকা পড়ায় উদ্ধারকর্মীসহ সবারই ধারণা ছিল শ্রমিকদের জীবিত তো নয়ই, এমনকি তাদের লাশও উদ্ধার করা সম্ভব নয় ৷ ধারণা করা হয়েছিল এত গভীরে উদ্ধার অভিযান চালাতে ছ মাস লেগে যেতে পারে, ততদিন হয়তো আর কেউ বেঁচে থাকবে না। এই যে চীনে প্রতিনিয়ত কয়লা খনিতে দূর্ঘটনা হয়, কজন শ্রমিক বাঁচে? অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বে স্বগর্বে মাথা উচু করা চীন প্রতিনিয়ত পত্রিকার শিরোনাম হয় খনি দূর্ঘটনা নিয়ে, সেখানে চিলি কিই বা করে দেখাবে? তবু দমে যান নি তারা, বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়ে ঠিকই দীর্ঘ ৬৯ দিন পর সবকজন শ্রমিককে জীবিতাবস্থায় তুলে আনেন ভালোবাসায় পূর্ণ মুক্ত পৃথিবীতে। অথচ চিলির দূর্ঘটনায় সবাই মারা গেলেও কারো কিছু বলার ছিল না, কিন্তু তারাই অদম্য প্রচেষ্টা আর ভালোবাসাকে পুঁজিকরে বিশ্বের বাঘা বাঘা পরাশক্তিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ঠিকই উড়িয়েছিল ভালোবাসার বিজয় কেতন।

অথচ আমরা বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ আজ বিবেকশূণ্য পাথরের ভাস্কর্যে পরিণত হয়েছি যেন। ভাস্কর্য যেমন শোভা বাড়ায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কোন কোন মন্ত্রী তেমনি শোভা বাড়িয়ে চলেছেন। আবার কেউ কেউ লোক হাসাতে ভালবাসে, গোপালভাড়ের মতো। হাজারো কথামালায় এরা টিভি ক্যামেরায় দাত কেলিয়ে দূর্গন্ধময় থুথু ছড়ায় তবু কাজের কাজ কিছুই এগোয় না। দীর্ঘ একটি মাস পেরিয়ে গেলেও জলদস্যুদের হাতে বন্দী হওয়ায় আমার দেশের সোনার ছেলেদের মুক্ত করার আজো কোন কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে পারে নি সরকার। একের পর এক দুঃসংবাদ আসে, দ্রুত মুক্তিপন না দিলে খাদ্য-পানীয় সরবরাহ বন্ধ করে দেবে, উপোষ করিয়ে তিলে তিলে হত্যা করার হুমকি দিয়েছে দস্যুরা। অথচ এতবড় দূর্ঘটনার পরও সরকারের টনক নড়ছে না। ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে জাহাজ মালিকের পা জড়িয়ে কাঁদছেন মা তবু মালিকপক্ষের মন গলে না, সরকারের মন গলে না, উদ্ধারাভিযানের কোন সুসংবাদ আজো তাই শোনাতে পারেনি সরকার।

আওয়ামী লীগ সরকারকে যে ভারত সব সময় বন্ধুসরকার বলে জোড় গলায় প্রচার করে তাদের নাকের ডগা দিয়ে জাহাজটি ছিনতাই হলো, যে সমুদ্রে রয়েছে তাদের শক্তিশালী নৌ বাহিনীর নিশ্চিদ্র প্রহরা, হেলিকপ্টার গানশীপ পাঠিয়ে যেখানে দ্রুত ধরে ফেলা যেত জলদস্যুদের, সেখানে কিভাবে জাহাজটি নিয়ে নাগালের বাইরে চলে গেল দস্যুরা তা আশ্চর্য বিষয়। জাহাজটি ছিনতাই হওয়ার পর বারবার টিভি পর্যায় দেখেছি কোন রুট দিয়ে জাহাজটি কত দূরে চলে যাচ্ছে তার হিসেব কষে দেখাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা অথচ তখনও কি পার্শ্ববতী দেশগুলোর সহায়তায় উদ্ধারাভিযান চালানো যেত না? বিশেষ করে যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আমাদের চৌকষ যোদ্ধারা সাফল্যের সাথে শান্তিমিশনে কর্মরত, আমরা কি জাতিসংঘ কিংবা অন্য কোন সংস্থার সহযোগিতা নিয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে পারতাম না? আর যদি কোন কিছু করার নাই থাকে তাহলে দস্যুদের দাবী আদায়ে কি আন্তরিক হওয়া যেত না? দাবী তাদের যতই হোক না কেন ২৬টি জীবনের চেয়ে নিশ্চয়ই তার দাম কিছুতেই বেশী নয়। অবশ্য সরকারের কাছে জনগণের জীবনের কোন মূল্য আদৌ আছে কি না তা চিন্তার বিষয়। লাশ মানেই তাদের কাছে দশ হাজার টাকার অনুদান, অবস্থা ভেদে যা কখনো কখনো লাখ ছুঁয়ে যায়। ২৬টি পরিবার যেখানে সর্বোচ্চ ২৬ লাখে কেনা সম্ভব সেখানে ৬০ কোটি জরিমানা দিতে বয়েই গেছে সরকারের।

অবস্থা দেখে মনে হয় বেঁচে থাকাটাই ওদের বড় অপরাধ। আজ যদি জাহান মনির নাবিকেরা জাহাজ ছিনতাই হওয়ার সময়েই নিহত হতো তবে নিদেনপক্ষে ৩ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষিত হতো, প্রধানমন্ত্রী নিহতের সন্তানদের নিজের সন্তান বলে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বাহবা কুড়াতেন সুযোগ থাকলে জানাযার আগেই বঙ্গভবনে কোন না কোন নিহতের সন্তানের বিয়ের ব্যবস্থা করে রঙ্গ দেখাতেন। কিন্তু তা হয় নি, জাহান মনির নাবিকেরা এখনো বেঁচে আছেন। ওরা যদি ফিরে আসে তবে তাতে কোন চমক নেই, বিধ্বস্ত চেহারায় ফিরে আসার চেয়ে ওরা যদি জলদস্যুদের নির্মমতায় ক্ষুৎ পিপাসায় ধুকে ধুকে মৃত্যুকে বরণ করে নেয় তবে লাশের রাজনীতিতে অভ্যস্ত আওয়ামী সরকারের ঢের সুবিধে, অন্তত লাশ নিয়ে কয়েকদিন কুমিরের অস্ত্রুজলে বাংলাদেশে বন্যা বইয়ে দিতে পারবেন।

রাষ্ট্রীয় শো-পিস দিপু মনিরা সরকারী পয়সায় বছরের অধিকাংশ সময় বিদেশে আমোদ করে বেড়ায় অথচ একবারও ভাবে না যে মানুষগুলোর রক্ত বেঁচা টাকায় চলে উড়োজাহাজ সেই মানুষগুলো শুধুমাত্র একটা সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে ধীরে দীরে মৃত্যুর ওপারে চলে যাচ্ছে। এমন ঘটনা যদি ঘটে যেত পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রে তবে হয়তো এতক্ষণে যুদ্ধ বেঁধে যেত কিংবা এ ঘটনা যদি আমেরিকায় হতো তবে বাংলাদেশের মিডিয়াগুলো নিয়মিত অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে সিএনএনএর লাইভ রেসকিউ অভিযান সম্প্রচার করতো, নামী দামী কোম্পানীগুলো স্পন্সর করতো স্ক্রলবারের সংবাদ শিরোনামে। অথচ আজ আমার দেশের সন্তানেরা যখন জলদস্যুদের নির্মমতায়, ক্ষুৎ-পিপাসায় কাতর হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুণছে তখন সরকার কিংবা বিরোধী দল কিংবা মানবাধিকার সংস্থাগুলো কিংবা পত্রপত্রিকা কেউই গুরুত্বের সাথে এ বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলছে না।

লাশের রাজনীতির পঁচাগন্ধে বিষাক্ত বাংলাদেশ। জীবনের মূল্য নেই এ দেশে, কেবলই মরা মানুষের খেলা। জাহান মনির নাবিকেরা, আফগানিস্তানের শ্রমিকেরা, বেঁচে থাকাটাই তোমাদের বড় অপরাধ। তোমাদের ক্ষমা নেই, মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করছে তাই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“বেঁচে থাকার অপরাধে মৃত্যুদন্ড” লেখাটিতে 2 টি মন্তব্য

  1. সজীব বলেছেন:

    “রাজনীতিবিদেরা শুধুই রাজনীতি বোঝেন, মানুষ বোঝেন না” একেবারে খাঁটি কথা। অনেক ভালো মানের পোস্ট। আমার বুকে শেয়ার করলাম।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    ধন্যবাদ। আদৌ কি ফিরবেন জাহান মনির নাবিকেরা? সরকারের কি কোন দায়িত্ব নেই? বিরোধী দলেরও কি কোন মাথাব্যাথা নেই?

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন