নীলকষ্ট (দুই)

ধানমন্ডি থানা হাজত থেকে যেদিন পুরান ঢাকার আদালতের বদ্ধসেলে চালান দিল, সেদিনের মতো বিস্মিত আর কখনো হয়েছি কি না মনে পড়ে না। অবশ্য পথে প্রিজন সেলে যেভাবে গাদাগাদি করে দাড়িয়ে উত্তপ্ত তাফালে ধানের মতো সিদ্ধ হলাম সেটা কোন অংশেই কম নয়, তবে পুলিশি ভ্যান বলে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম বলেই অতটা ধাক্কা খাইনি। কিন্তু আদালত, যেখানে সাধারণ মানুষ যায় ন্যায় বিচারের আশায় সেখানে যেভাবে বার্ড ফু আক্রান্ত মুরগীর মতো অন্ধকার বদ্ধ সেলে কবর দেয়া হলো তা আজো ভাবলে গা শিউরে উঠে।

সকালে যখন আমাদের আদালতের স্যাঁতসেঁতে সেলে ঢোকানো হলো তখন সেলে চলছে ভুতুড়ে লোডশেডিং। লোডশেডিং-এর সুযোগে জেলপালানো দাগী আসামীর মতো পানিও হাওয়া হয়ে গেছে। শাওলাপড়া দেয়াল, স্যাঁতসেঁতে ফ্লোর, বিড়ি-সিগারেট, ঘামের দুর্গন্ধ আর অপরিচিত ধোয়ার তীব্র গন্ধ সবাইকে পাগল করে দেয়। এর উপরে এই বদ্ধ সেলে অত্যাচারের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে দেয়ালের একপাশে দাড়িয়ে আছে উন্মুক্ত টয়লেট। দরজার পাল্লাটা নেই, কোন প্রস্তর যুগে ওটা য়ে গেছে তা আর কারো জানা নেই।

পানি নেই, পানির জন্য হাহাকার। কিন্তু প্রকৃতি আমাদের অনেকের উপরই বোধহয় বিরূপ হয়ে আছে, নইলে যাকে তাকে ডেকে বাথরুমেই বা ঢুকাবে কেন? এমন পরিবেশে প্রকৃতির ডাককে অগ্রাহ্য করার মতা আমার কিছুটা আছে, হয়তো পানির প্রতি ভালোবাসা কম বলেই। কিন্তু আমি ভাবি যারা ওখানে যাচ্ছে, পানি ছাড়া কিভাবে কাজটা শেষ করে? যাদের আবার ছোট বাথরুমে পায় তারা বাথরুমের সামনেই সবাইকে অগ্রাহ্য করে ছড়ছড় করে ভারমুক্ত হয়, ফাঁকে বাথরুমবাসীর কসরতও আড়চোখে একবার দেখে নেয়।

গাদাগাড়ি করে দাড়িয়ে আছে অনেকে, বসার সৌভাগ্য হয়েছে অল্প কারো। যারা একটু ভদ্র পরিবারের তারা পত্রিকা বিছিয়ে বসে পড়েছে। অবশ্য বাথরুমের দিকটায় ভীড় কিছুটা কম, বাথরুমের গা গুলানো দুগন্ধ ঠেলে, ময়দা পানিতে ভেঁজা ফোরে দাড়ায় এমন বুকের পাটা ক’জনারই বা হয়। তারপরও কয়েকজন ওখানে বসে আছে, চুপচাপ ভদ্র ছেলের মতো। বসে আছে, তবে এলোমেলো হয়ে নয়, শৃংখলাবদ্ধ হয়ে, একটা ছোট্ট বৃত্ত রচনা করে বৃত্তের ফাঁকদিয়ে হালকা ধোয়া বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে উড়ে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।

কিছুটা আগ্রহ নিয়েই একসময় ওদের দিকে এগিয়ে যাই, শান্ত লোকগুলো মাথা তুলে একবার আমার দিকে তাকিয়েই আবার কাজে মন দেয়, আমাকে পাত্তা দেয়ার সময়ই তাদের নেই। বৃত্তের মাঝে জ্বলন্ত মোমবাতি, দুর্বল লোকগুলোর কাঁপা হাতে দুটাকা পাঁকিয়ে বানানো পাইপ, সিগারেটের রাঙতা কাগজ, কাগজের উপরে পাউডার গলে ধোঁয়া বেরোচ্ছে, সেই ধোঁয়াগুলো টাকার পাইপ দিয়ে টেনে টেনে অসুস্থ ফুসফুস ভরে দিচ্ছে নির্লিপ্তভাবে।

ধীরে ধীরে দিন শেষ হয়ে আসে। আদালতে কি বিচার হচ্ছে, আমাদের জামিন হবে কি হবে না তা ভেবে উদ্বিগ্ন পাথর সময় গলে গলে যায়। উৎকট দুর্গন্ধের মাঝে আর কতোণ মানসিক ভারসাম্য রেখে টিকে থাকতে পারবো তা নিয়ে ভেবে ভেবে আকুল হই। অথচ বৃত্তেবন্ধী লোকগুলোকে কতই না সুখী মনে হয়। বদ্ধ সেলে বদ্ধ উন্মাদের মতো হাপিত্যেশ করি আর ভাবি, নেশার ছোবলে নীল হয়ে যাওয়া মানুষগুলো কতটাই না সুখী আসলে এমন পরিবেশে বেঁচে থাকার চেয়ে নেশায় নীল হয়ে অকালে ঝড়ে যাওয়াই বোধহয় অনেক ভালো।

সাধারণ মানুষ ন্যায় বিচারের জন্য যেদিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকে সেই পবিত্র আদালতের ভেতরেই অপরাধী-নিরপরাধী নির্বিশেষে সবাই বিচারের আগেই কঠোরতম শাস্তি পেয়ে যাচ্ছে তা উইগ আর কালো বোরখার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আদালত কি কোন কালেই জানতে পারবে না?

Be Sociable, Share!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।