ইসলামী ব্যাংকিং-এ জীবন ইসলামীয় দর্শনঃ উদ্দেশ্য কি? (এক)

মাদারীপুরের সাবেক গোবিন্দপুর নিবাসী আমার পরিচিত জনৈক ফকির মাঝে মাঝে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে পাখি ডাকা, ছায়াঘেরা অপরূপ প্রকৃতির টানে কিংবা কোষ্টকাঠিন্যের জ্বালায় টাট্টিখানায় গভীর ধ্যানে মগ্ন হন। এভাবেই তিনি আবিস্কার করেন মহা মহা যত সমস্যার অলৌকিক সমাধান।

একদিন তিনি আমাদের বললেন, চুল ছোট-বড় রাখা জায়েজ কেন জানো? আমরা নতুন রহস্যেও গন্ধ পাই, তাই কৌতুহলে জিজ্ঞেস করি কেনো কেনো? তিনি বেশ আগ্রহ ভরে বলেন, “আমি টাট্টিখানায় গভীর ধ্যানে মগ্ন হয়ে দেখি আল্লাহর রাসূল (সাঃ) নাজ্জাশির দরবারে হাজির। নাজ্জাশী রাসূলের (সাঃ) কোকড়া চুল টেনে ঘাড় পর্যন্ত লম্বা করে ফেললেন, আবার চুল ছেড়ে দিতেই তা কুকড়িয়ে কানের লতি পর্যন্ত ছোট হয়ে গেল, এ জন্যই চুল বড় ছোট রাখা জায়েজ”।

সচেতন পাঠক ইতোমধ্যেই বুঝে গেছেন কতটা ভন্ড ও প্রতারক ছিল আমার পরিচিত এই ফকিরটি। কারন রাসূল (সঃ) তার জীবদ্দশায় কখনোই নাজ্জাশির দরবারে যান নি, তাই চুল নিয়ে এমন মস্করার প্রশ্নই আসে না।

সমপ্রতি দৈনিক ভোরের কাগজের সাংবাদিক জনাব জীবন ইসলাম কোরআনের নতুন একটি আয়াত আবিস্কার করেছেন। ১৩ আগস্ট ‘০৬ তারিখে দৈনিক ভোরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত ‘ধর্মের নামে গ্রাহক প্রতারণা (১), ‘ভাড়া’র আড়ালে ইসলামী ব্যাংকে দেদার চলছে সুদী কারবার’ শিরোণামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জনাব জীবন ইসলাম এই নতুন আয়াতটি তুলে ধরেন। তার আবিস্কৃত আয়াতটি হলো: ‘কাউকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বা যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ প্রদান করে তার পরিবর্তে নির্দিষ্ট হারে অর্থ আদায় করে নেওয়াকে সুদ বলা হয়।”

আমার পরিচিত ভন্ড ফকিরটি কোষ্টকাঠিন্যের জ্বালায় টাট্টিখানায় নতুন নতুন মাসয়ালা আবিস্কার করে সাধারণ জণগনের সাথে প্রতারণা করতেন কিন্তু কোরআন নাজিলের চৌদ্দশত বছর পরে জনাব জীবন ইসলাম কিসের প্রভাবে দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকা অফিসের চীপায়-চাপায় এমন নতুন আয়াত খুঁজে পেলেন তা আমার বুঝে আসে না? যদি নতুন কোন মাদকের প্রভাবে হয়ে থাকে তবে কোন কথা নেই, কারন মাতালের কথায় কিছু যায় আসে না, কিন্তু যদি সচেতনভাবে কোরআনে নতুন আয়াত সংযোজনের চেষ্টা চালিয়ে থাকেন তবে এমন স্পর্ধা দেখানোর সাহস তিনি কোথায় পেলেন তা ভেবে দেখা দরকার।

ইসলামী ব্যাংকিং শুরুর প্রারম্ভ থেকেই জীবন ইসলামেরা ইসলামী ব্যাংকিংকে অকার্যকর ও অবাস্তব বলে প্রচারে নেমেছেন। কিন্তু ১৯৮৩ সালে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড নামে দণি-পূর্ব এশিয়ায় প্রথম সুদমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হয় যা বর্তমানে ১৬৯টি শাখা নিয়ে দেশের সেরা ব্যাংকে পরিণত হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকিংয়ে ইসলামী শরীয়াহ্ পরিপালন সম্পূর্ণরূপে করার নিয়ম আর এ নিয়মকে পূঙ্খানুপুঙ্খরূপে পরিপালন করেই ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডসহ বিভিন্ন ইসলামী ব্যাংক এদেশে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে জীবন ইসলামদের যে গাত্রোদাহ শুরু হয়েছে তা স্পষ্ট। একজন মুর্খও ভাড়া এবং সুদের পার্থক্য বুঝেন কিন্তু জীবন ইসলাম কিছুতেই ভাড়াকে সুদ থেকে আলাদা করতে পারছেন না, তাই ভাড়াকে সুদ হিসেবে প্রমাণ করার জন্য তিনি কোরআনের নতুন আয়াত আবিস্কারেরও ধৃষ্টতা দেখাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, সারা বিশ্বে ইসলামী ব্যাংকিং-এর যেসকল নীতিমালা আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে স্বীকৃত সেই নিয়ম-নীতিগুলোকেও আরবী নামের আড়ালে প্রতারণার ফাঁদ হিসেবে চি্ি#৮২০৬হ্নত করার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছেন। অথচ সচেতন পাঠকমাত্রই জানেন যে ইসলামী ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমে ইসলামী শরীয়াহর পরিপূর্ণ পরিপালন হচ্ছে কি না তা তদারকির জন্য দেশের বরেণ্য আলেম ও ইসলামী অর্থনীতিবিদদের নিয়ে শরীয়াহ কাউন্সিল রয়েছে। কিন্তু শরীয়াহ কাউন্সিল নিলেও জনাব জীবন ইসলাম আপত্তি তুলেছেন এবং তাদের নিয়ে ভিত্তিহীন অপপ্রচারে মেতে উঠেছেন।

জনাব জীবন ইসলাম “ধর্মের নামে গ্রাহক প্রতারণা” সিরিজের দ্বিতীয় পর্বে ইসলামী ব্যাংকের সাথে জঙ্গী অর্থায়নের অভিযোগ আনেন। অথচ যারা প্রকৃতপ েব্যাংকিং সম্পর্কে ধারণা রাখেন তারা যানেন এটি কতবড় মিথ্যে প্রচারণা। জনাব জীবন ইসলাম এবছরের মার্চ মাসে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত তথ্য সন্ত্রাসকে আরো উস্কে দিতে তার দ্বিতীয় সিরিজটি প্রকাশ করেন। জেএমবি’র নেতা শায়খ আবদুর রহমানের সিলেটস্থ সাময়িক আবাসস্থল সূর্যদীঘল বাড়ীতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড-এর চেকবই প্রাপ্তিকে কেন্দ্র করে তৎকালীন সময়ে কয়েকটি সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিপর্যয় ঘটানোর চক্রান্ত করে। এমনকি ইসলামী ব্যাংক থেকে গ্রাহকরা টাকা তুলে নিচ্ছে, ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার বাজারে ধ্বস ইত্যাদি উস্কানীমূলক বক্তব্য প্রকাশ করেও ইসলামী ব্যাংকের অগ্রগতিকে রুদ্ধ করতে পারে নি, বরং জঙ্গী অর্থায়নের অভিযোগ প্রকাশের পরবর্তী মাসে ইসলামী ব্যাংকে রেকর্ড সংখ্যক গ্রাহক ইসলামী ব্যাংকের সাথে লেনদেন চালু করে। ইসলামী ব্যাংকের প্রতি সাধারণ জনগণের বিশ্বাস ও আস্থায় যে নু্যনতম চীর ধরেনি তা এ ধটনার পরে ব্যাংকের আমানত গ্রহণ, বিনিয়োগ প্রদান ও বৈদেশিক বাণিজ্যে অভুতপূর্ব সাফল্য দেখেই বুঝা যায়। জঙ্গী অর্থায়নের দায়ে ইসলামী ব্যাংককে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এ তথ্যটিও বিভ্রান্তি কর কেননা ব্যাংকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেই জরিমানা সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিযোগ তুলে ধরা হয় যা নিম্নরূপ:

“মানি লন্ডারিং প্রতিরোধা আইন ২০০২ এর ১৯ (১) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ সার্কুলার নম্বর ০২ তারিখ ১৭/০৭/২০০২-এর নির্দেশনা যথাযথভাবে পরিপালন করতে না পারায় বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডকে জরিমানা ধার্য করেছে।
যে কোন তফসিলী ব্যাংক উপরোক্তা আইন পরিপালনে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যাংক বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহন করেছে এবং করে আসছে।”

মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন যথাযথভাবে পরিপালন যে কতটা কষ্টকর তা এ আইন যথাযথভাবে পরিপালনে ব্যর্থ হয়ে জরিমানাপ্রাপ্ত ব্যাংকগুলোর বিশাল তালিকা দেখলেই বুঝা যায়। প্রচলিত সুদী ব্যাংকের কয়েকটি মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন যথাযথভাবে পরিপালন না করার জন্য দরিমানা শিকার হওয়ার পর পত্রিকাগুলো এ আইনটি পরিপালন খুবই কষ্টসাধ্য বলে স্বীকার করে, কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের জন্যও যে এটা কষ্টকর তা তারা বেমালুম ভুলে যায়।

আর জঙ্গীরা বাংলাদেশের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় টাকা পাঠানোর েেত্র ব্যাংক একাউন্ট ব্যবহার করলে পুরো ব্যাংকটাকেই জঙ্গীদের মদদদাতা সাব্যস্ত করা মোটেই যৌক্তিক নয়। কেননা জঙ্গীরা যদি মানি অর্ডার করে টাকা পাঠায় কিংবা ট্রেনে বা বাসে বা কুরিয়ারের মাধ্যমে টাকা পাঠায় তবে কিছুতেই পোস্টাপিস, কুরিয়ার সার্ভিস, পরিবহন ব্যবস্থাকে জঙ্গী-অর্থায়নের জন্য দায়ী করা যায় কি? আবার একটি দৈনিকে শিরোনাম করা হয়, “নেতৃত্বে জেএমবি, টাকা আসে ইসলামী ব্যাংক থেকে”। ইসলামী ব্যাংকের কোন একাউন্ট হোল্ডার তার টাকা অন্যায় কাজে ব্যবহার করলে তার দায় কেন ইসলামী ব্যাংককে বহন করতে হবে? জঙ্গীরা দেশব্যাপী বোমা বিস্ফোরণে ব্যবহার করে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ককে। তাহলে কি এ অভিযোগ করা যায়, “নেতৃত্বে জেএমবি, নির্দেশ আসে মোবাইল কোম্পানী থেকে”? না তা কেউ অভিযোগ করে না কারন তাদের ব্যাপারে কারো এলার্জি নেই, যত এলার্জি ইসলাম নিয়ে।

ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের দরপতনের জন্য পরিকল্পিতভাবে পত্রিকায় রিপোর্ট করার পরও শেয়ারের দরপতন না হওয়ায় আরেকটি দৈনিক বিস্ময় প্রকাশ করে শিরোনাম করে, তারা ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের দরপতন না হওয়াটাকেও জঙ্গী কানেকশন হিসেবে চি্ি#৮২০৬হ্নত করে, কি বিচিত্র এদেশের হলুদ সাংবাদিকতা।

দ্বিতীয় পর্বেই জনাব জীবন ইসলাম ২০০৩ সালের চেয়ে ২০০৪ সালে ব্যাংকের অনুদান প্রদানের হার অত্যধিক বেড়ে যাওয়াকে জঙ্গী অর্থায়ন হিসেবে চি্ি#৮২০৬হ্নত করেন। অথচ ২০০৪ সালে দেশব্যাপী ভয়াবহ বন্যায় ইসলামী ব্যাংক প্রধান মন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ৪০ লাখ টাকা প্রদান করে, এছাড়া ব্যাংকের ১৫১টি শাখার মাধ্যমেও সরাসরি বন্যাদূর্গতদের মাঝে ত্রাণ সাহায্য প্রদান করে যা তৎকালীন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। দেশের দুর্যোগে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান সাহায্যের হাত বাড়ালেও যদি জীবন ইসলামেরা জঙ্গী অর্থায়নের গন্ধ শোকেন তবে এদের জন্য আফসোস করা ছাড়া উপায় কি?

জনাব জীবন ইসলাম তার ৩য় পর্বেও অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন ডেস্কনির্ভর তথ্য প্রচার করে দেশের সচেতন নাগরিকদের বিভ্রান্ত করতে চেয়েছে। অভিযোগগুলো এতটাই ভিত্তিহীন যে এর জবাব দেয়ার কোন অর্থই হয় না।

জনাব জীবন ইসলাম তার প্রতিবেদনের ৪র্থ পর্ব ইসলামী ব্যাংককে জামায়াত-শিবিরের স্বর্গরাজ্য বলে প্রমাণের চেষ্টা চালিয়েছে। এমনকি ব্যাংকের নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গীর একটা চিত্র তুলে ধরতে চেয়েছেন। অথচ বাংলাদেশে হাতেগোনা যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কোন প্রকার ঘুষ বা দূর্ণীতি ছাড়াই চাকুরী পাওয়া যায় বলে দেশে বিদেশে প্রসংশিত তার মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড শীর্ষস্থানীয়। ইসলামী ব্যাংকে অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন নিয়োগ ব্যবস্থা রয়েছে এবং এেেত্র যোগ্যতাকেই সবচেয়ে বেশী প্রাধান্য দেয়া হয়। ইসলামী ব্যাংকে কর্মরত আমার বেশ কিছু বন্ধু আছে যারা ছাত্রজীবনে দিনের শুরুতে দু’একটা শিবির কর্মীকে না পিটিয়ে সকালের নাস্তা করতো না। ছাত্রাবস্থায় ছাত্রদল-ছাত্রলীগ এমনকি বামরাজনীতির সাথে যুক্তছিল এমন প্রচুর অফিসার এখন ইসলামী ব্যাংকে কর্মরত আছেন। তারা তাদের যোগ্যতার বলেই ব্যাংকে চাকুরী পেয়েছেন, শিবির পরিচয়ে নয়।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“ইসলামী ব্যাংকিং-এ জীবন ইসলামীয় দর্শনঃ উদ্দেশ্য কি? (এক)” লেখাটিতে একটি মন্তব্য

  1. Rusafie বলেছেন:

    প্রথমেই বলে নিচ্ছি, আমার মন্তব্যকে আক্রমণাত্বক ভাববেন না ।

    ‘কাউকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বা যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ প্রদান করে তার পরিবর্তে নির্দিষ্ট হারে অর্থ আদায় করে নেওয়াকে সুদ বলা হয়।”
    আমি তো জানতাম যে এইটা একটা হাদীস । আমি সিহাহ সিত্তার কোন একটিতে এটি দেখেছি, তবে এখন সঠিক মনে নাই । এটি যদি মিথ্যা হয়, তাহলে সুদ এর আসল সং্যা কি? জানাবেন আশা করি ।

    জানানোর পরে আর একটি প্রশ্ন করব ইনশাআল্লাহ ।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন