আলোকিত নেতা মওদূদী (রহঃ) : ডাইরেক্ট একশন

কাদিয়ানীদের অমুসলিম সংখ্যালঘু ঘোষণার দাবীতে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় কনভেনশন ১৯৫৩ সালের ২৭ ফ্রেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত হয়। মাওলানা মওদূদী (রহঃ) কাদিয়ানী সমস্যাকে পৃথকভাবে বিবেচনা না করে বরং ইসলামী সংবিধান প্রণয়ন আন্দোলনের মধ্যেই শামিল করার জোর দাবী জানান। কিন্তু একের পর এক অনুরোধ, মিটিং, মিছিল প্রভৃতি করেও যখন কাদিয়ানীদের অমুসলিম সংখ্যালঘু ঘোষণার জন্য পাকিস্তান সরকারকে সম্মত করা অসম্ভব হয়ে দাড়ায় তখন সর্বদলীয় কনভেনশন সরকারের বিরুদ্ধে ডাইরেক্ট একশন ঘোষণা করে বসে। মাওলানা মওদূদী (রহঃ) কিংবা জামায়াতে ইসলামী কোনভাবেই ডাইরেক্ট একশনের পক্ষে ছিল না বরং সর্বদলীয় কনভেনশন থেকেই জামায়াত কনভেনশনের সাথে তাদের সম্পর্কচ্ছেদ করে। এমনকি ৪ ও ৫ মার্চ, ১৯৫৩ তারিখে অনুষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার অধিবেশনে ডাইরেক্ট একশনের তীব্র নিন্দা করা হয় এবং এর ভয়াবহ পরিণতির কথা বিশ্লেষণ করে জনসাধারণকে ডাইরেক্ট একশন থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ জানানো হয়।

ডাইরেক্ট একশন ঘোষণার পরের দিন করাচীতে ডাইরেক্ট একশনের নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করে ফলে করাচী শহরে ডাইরেক্ট একশন কর্মসূচী ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। কিন্তু পাঞ্জাবে এ আন্দোলন রক্তাক্ত পরিনতির মাধ্যমে শেষ হয়। সরকার বিরোধী এ আন্দোলনের শুরু থেকেই পুলিশ মারমুখী অবস্থান গ্রহণ করে এবং ৪ মার্চ ১৯৫৩ তারিখে জনসাধারণের আন্দোলনে লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ করে।

মূলত: পাঞ্জাবের প্রাদেশিক সরকার ক্ষমতা হারানোর ভয়ে জনসাধারণের দাবীকে যে কোন মূলে দমনের জন্য শান্তিপূর্ণ পথ পরিহার করে শক্তি প্রয়োগের জন্য পুলিশ বাহিনী নিয়োগ করে। এদিনই জনৈক ছদ্মবেশী পুলিশ আন্দোলন কারীদের উস্কে দেয়ার জন্য মিথ্যে গল্প ফাঁদে যে, পুলিশ এক স্থানে মিছিলে গুলি চালিয়েছে এবং জনৈক মিছিলকারীর গলায় বাধা কোরআন শরীফ লাথি মেরে ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছে। এমনকি ঐ ছদ্মবেশী পুলিশ কিছু ছেড়া কোরআনের পাতা সবাইকে প্রমাণ স্বরূপ দেখিয়ে আন্দোলনের আগুণে ঘি ঢেলে দেয়। এর ফলে সাধারণ জনতার পাশাপাশি সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে।

একই দিন ডাইরেক্ট একশন আন্দোলনকে চুড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে একটি জীপ গাড়ি থেকে আমজনতার উপর ব্যাপক গুলি বর্ষণ করা হয়। পরে জানা যায় জীপের আরোহীরা সবাই কাদিয়ানী এবং এটা একটি পরিকল্পিত আক্রমন। এসব কারণে সরকার বিরোধী এ আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ডাইরেক্ট একশন দমাতে পাঞ্জাব পুলিশ জনতার উপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। এতে ৪ থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত ব্যাপক গোলযোগ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ৬ই মার্চ সামরিক আইন জারী হয় এবং সেনা ও পুলিশের গুলিতে ১১ জন সাধারণ লোক নিহত ও ৪৯ জন আহত হয়।

কাদিয়ানীদের অমুসলিম ও সংখ্যালঘু ঘোষণার দাবীতে সর্বদলীয় কনভেনশন কর্তৃক আহূত ডাইরেক্ট একশন সেনা হস্তক্ষেপে অবশেষে সমাপ্ত হয়। এ আন্দোলনে পুলিশ ও সেনাদের গুলিতে ১১ জন নিহত হলেও এখনো অপপ্রচার রয়েছে যে হাজার হাজার কাদিয়ানী এ গোলযোগে প্রাণ হারায়। আবার জামায়াতে ইসলামী এবং মাওলানা মওদূদী (রহঃ) ডাইরেক্ট একশনের বিরোধী হওয়ার পরও কোন এক অদৃশ্য কারনে মওদূদী ও জামায়াতে ইসলামীর ঘাড়ে এ ঘটনার দায় চাপানোর চেষ্টা চালানো হয়। অথচ সরকারী নথিপত্র এবং তৎকালীন পত্রপত্রিকা প্রমাণ করে যে জামায়াতে ইসলামীর এ আন্দোলন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। আবার এ ডাইরেক্ট একশন কোনক্রমেই কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে ছিল না বরং এটা ছিল কাদিয়ানীদের অমুসলিম সংখ্যালঘু ঘোষণার দাবীতে সরকার বিরোধী একটি কর্মসূচী কিন্তু এটাকে কাদিয়ানী দাঙ্গা নাম দিয়ে আজো ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টা চলছে।

আসলে দ্বীনের পথে যারা কাজ করেন, আল্লাহ রঙে যারা নিজেদেরকে রাঙাতে চান, যারা কাউকে ভালোবাসেন কিংবা ঘৃণা করেন কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অথর্াৎ যাদের প্রতিটি পদক্ষেপ হয় আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য তাদের পথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না, আজো নেই। ইসলামের পক্ষে দাড়ালে, শান্তির পক্ষে দাড়ালে যুগে যুগে বাধা এসেছে, আক্রমন এসেছে, মিথ্যে প্রচার প্রপাগান্ডার জোয়াড় বয়ে গেছে কিন্তু আল্লাহর পথের সৈনিকদের সত্যের পথ থেকে বিন্দুমাত্র বিচু্যত করা যায় না। কারণ তারা জানেন, সত্যের জয় অবিস্মম্ভাবী।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন