আলোকিত নেতা মওদূদী (রহ:) : সংবিধান প্রনয়ণ আন্দোলনে

সদ্য স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের নাক পর্যন্ত ডুবে ছিলো হাজারো সমস্যায়। এর মধ্যে দেশের জন্য একটি আদর্শ শাসনতন্ত্র প্রণয়ন ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মুসলমানদের ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করা হয়। যারা ভারতীয় উপমহাদেশে একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রকৃত পক্ষে ইসলামী রাষ্ট্র সম্পর্কে তাদের সত্যিকারের ধারণা বা সদিচ্ছা ছিল কিনা তা একটি বিশাল প্রশ্ন হয়ে আছে। যারা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সাধারণ মুসলমানদের ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করেছেন, যারা ইসলামের নাম নিয়ে লাখো মুসলমানকে ভারত থেকে পাকিস্তানে হিযরত করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন, সাতচলি্লশে যাদের জন্য হাজার হাজার সাধারণ মুসলমান শিখ ও হিন্দুদের সম্মিলিত দাঙ্গায় শহীদ হয়েছেন, লক্ষ লক্ষ লোক পৌত্রিক ভিটেমাটি হারিয়ে পাকিস্তানে উদ্বাস্তু হয়েছেন, তারাই পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর মুখোশ খুলে স্বরূপে আবির্ভূত হন।

“লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান, দস্তর হোগা আল কোরআন”। পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংবিধান হবে কোরআনের আইন অনুযায়ী এমন স্বপ্নে বিভোর হয়ে যে সকল সাধারণ মুসলমান পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সবের্াচ্চ ত্যাগ ও কুরবানীর নজীর স্থাপন করেছেন তারাই এক সময় দেখতে পেলেন যে তাদের স্বপ্নের পাকিস্তান আসলে কোন ইসলামী রাষ্ট্র হবে না বরং পাকিস্তানকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পাকিস্তান নেতৃবৃন্দ তলে তলে অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। ইসলামী সংবিধান প্রণয়ন যে আদৌ সম্ভব নয় এ ব্যাপারে তারা বিভিন্ন যুক্তি সরকার নিয়ন্ত্রিণ প্রচার মাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করতে থাকে। (বিস্তারিত: টীকা ১ দ্রষ্টব্য) ফলে সাধারণ জনতা পাকিস্তান সরকারের এমন দূরভিসন্ধি জানতে পেরে ব্যাপক বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং পাকিস্তানের সংবিধান কোরআনের আইনের ভিত্তিতেই হতে হবে এমন দাবী নিয়ে দূর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন।

মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহঃ) পাকিস্তান সরকারের দূরভিসন্ধির বিপক্ষে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি সংবিধান প্রণয়ন নিয়ে জটিলতায় বিচলিত হয়ে রচনা করেন “ইসলামী শাসনতন্ত্র প্রণয়ন” এবং “ইসলামী শাসনতন্ত্রের মূলনীতি” শীর্ষক দু’টি অসাধারণ বই। স্বাভাবিক ভাবেই পাকিস্তান সরকারের কোপানলে পড়েন তিনি, দেশটি স্বাধীন হওয়ার কিছুকাল পরেই অর্থাৎ আটচলি্লশ সালের ৪ মে নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করে ঊনিশ মাস পচিশ দিন কারানির্যাতন চালিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান প্রতিষ্ঠার পথকে নিষ্কন্টক করতে মরিয়া হয়ে ওঠে।

১৯৫১ সালের ২১ জানুয়ারী পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় একুশ জন প্রসিদ্ধ আলেম করাচী মহানগরীতে সমবেত হয়ে পাকিস্তান সংবিধানের ২২দফা মূলনীতি প্রণয়ন করে সরকারের নিকট পেশ করেন যা পাকিস্তানে ইসলামী শাসনতন্ত্রের শক্তিশালী ‘চার্টারে’ পরিগণিত হয়। সরকারী ইসলাম বিরোধী প্রচার প্রপাগান্ডা আলেমদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হলেও সংবিধান প্রণয়ন তিমিরেই থেকে যায়। ফলে জামায়াতে ইসলামী ৯ দফা (বিস্তারিত টীকা ২ দ্রষ্টব্য) দাবী আদায়ের জন্য জগগণের স্বাক্ষর অভিযান শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় একান্ন সালের ২১ নভেম্বর মাওলানা মওদূদী (রহঃ) করাচীতে ৯ দফা দাবীতে অনুষ্ঠিত সমাবেশে দীপ্ত কন্ঠে ঘোষণা করেন যে, যদি এবারের শাসনতন্ত্রের খসড়াটি পূর্বের মতোই অনৈসলামিক হয়, তাহলে ইসলামী জনতা উক্ত খসড়া তার প্রণেতাদের মুখের উপরই ছুঁড়ে মারবে।

এরই বছর খানেক পর ইসলামী সংবিধান প্রণয়নের দাবীর পাশাপাশি “কাদিয়ানীদের সংখ্যালঘু ঘোষণার দাবীতে আরো একটি আন্দোলন দানা বেধে ওঠে। মওদূদী (রহঃ) কাদিয়ানী সমস্যা সমাধানে আলাদা আন্দোলনের পক্ষপাতি ছিলেন না বরং একে তিনি সংবিধান প্রণয়ন আন্দোলনেরই অংশ মনে করতে।

(চলমান)

টীকা ১:
সংবিধান প্রণয়নে সরকারের অনীহার কয়েকটি সরকারী যুক্তি:
ক) কাশ্মীর বিপন্ন, সংবিধান প্রণয়ন অসম্ভব।
খ) পাকিস্তান বিপন্ন, অতএব এটা জিহাদের সময়, সংবিধান প্রণয়নের নয়।
গ) মোল্লাদের শাসন হলেই তা ইসলামী হয় না বরং যে কোন মুসলমানের শাসনই ইসলামী শাসন।
ঘ) আধুনিক যুগে কোন প্রগতিশীল রাষ্ট্রে ইসলামী আদর্শে সংবিধান প্রণয়ন অযৌক্তিক।
ঙ) মুসলমানদের মাঝে বিভিন্ন মাযহাবী ঝামেলা থাকায় ইসলামী রাষ্ট্র সম্ভব নয়।
চ) ইসলামী সংবিধান হলে আধুনিক দূনিয়া উপহাস করবে।

টীকা ২:
জামায়াতে ইসলামীর ৯ দফা:
ক) ইসলামী শরীয়তই হবে দেশের শাসনতন্ত্রের প্রকৃত উৎস।
খ) শরীয়তের খেলাপ কোন আইন প্রণয়ন চলবে না।
গ) সকল শরীয়ত বিরোধী আইন-কানুন বাতিল করতে হবে।
ঘ) সরকারের দায়িত্ব হবে সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ করা।
ঙ) আদালতের বিচার ছাড়া কোন নাগরিক অধিকার হরণ চলবে না।
চ) শাসন বিভাগ ও সরকারী কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আদালতে বিচার প্রার্থনা করার অধিকার সকল নাগরিককে দিতে হবে।
ছ) বিচার বিভাগে শাসন বিভাগের হস্তক্ষেপ চলবে না।
জ) মানুষের মৌলিক ৫টি প্রয়োজন পূরণের পূর্ণ দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে।
ঞ) কাদিয়ানীদের অমুসলিম সংখ্যালঘু ঘোষণা করতে হবে।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন