যেতে হবে বহুদূর …

তীক্ষ্ণ আর্তনাদের শব্দে ঘুম ছুটে যায়। এক ঝটকায় লেপটাকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে জানালার গ্রীলের পাশে দাড়াতে বুঝতে পারি, মজিদ শেখের বাড়ীটা থেকেই আসছে কান্নার শব্দটা। তীব্র আর্তচিৎকার। একদল মাতাল হায়েনার অট্টহাসির শব্দ, শরাবের পেয়ালার টুংটাং আওয়াজ। আর থেকে থেকে কিশোরীদের গোঙানী, কান্নার শব্দ, আল্লাহর কাছে সাহায্যের আহ্বান। দিন দিন নির্যারিত মা-বোনদের আর্তচিৎকার শুনে মাঝে মাঝে মনে হয় বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যাব। উন্মাদ! এভাবে বিবেকের সাথে প্রতিনিয়ত প্রতারণা করে বেঁচে থাকার চেয়ে উন্মাদের মতো নেংটো হয়ে ঘুরে বেড়ানোই ভালো নয় কি?

আজও নিশ্চয় নরপিশাচরা ধরে এনেছে অসহায় গরীব কোন কৃষকের বাগানের সেরা গোলাপটি। অসহ্য সৌন্দর্য অন্ধ করে দিয়েছে ওদের, নির্দয় নিয়তি হয়তো আজ কিছুতেই বেঁচে থাকতে দেবে না সদ্য প্রস্ফুটিত গোলাপটিকে, জীবনের দায় মেটাতে হবে পবিত্র ইজ্জতের দামে। খুবলে খুবলে খাবে হায়েনারা আজ হরিনীর মতো অসহায় কিশোরীকে।

এভাবেই যুগ যুগ ধরে চলছে শিকার। আঠের বিঘা জমির বিশাল ভিটিতে প্রাসাদসম অট্টালিকা মজিদ শেখের। না, এটা পূর্ব পুরুষের ভিটে নয়, পাশের রাজ্যে বসবাস ছিল তার। তাদের পূর্বপুরুষের অত্যাচার চেঙ্গিশ খানকেও হার মানাতো। এক সময় প্রতিপক্ষ শরফরাজ খানের হাতে নির্মমভাবে পরাজিত ও বিতারিত হয়ে জোড় পূর্বক আস্তানা গেড়েছে এ গ্রামে। এখানে আস্তানা করলেও মজিদ শেখ চলে যায় আমেরিকায়, জমিদারী দেখাশোনার দায়িত্ব রেখে যায় পিশাচ দু’টো ভাগ্নে হাতে।

মজিদ শেখের অট্টালিকার পাশেই রয়েছে জোর করে দখল করা কয়েকশ বিঘা উর্বরা ধানী জমি। তারপরও আশে পাশের দরিদ্র কৃষকদের জমি লোভ দেখিয়ে, ভয় দেখিয়ে না হয় জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে দখল নিচ্ছে। যারা প্রতিবাদ করে, কিংবা যাদের মনে করে পথের কাটা, দক্ষ জেলেদের মতো জাল ছড়িয়ে খেলিয়ে খেলিয়ে ধীরে ধীরে গুটিয়ে আনে তাদের কেন্দ্রের দিকে। জালের ফাঁসের ভেতর রূপালী ইলিশের মতো তড়পায় অসহায় কিশোরীর দল। কিশোরী-তরুনীদের ওপর সারারাত ধরে চলে নির্মম, নিষ্ঠুর অত্যাচার। দলবেধে হায়েনাগুলো মেয়েদের ইজ্জত নিয়ে লুফোলুফি করে, আখের মতো চুষে নেয় জীবনের সবটুকু রস, ছোবড়াগুলোও নিস্তার পায় না। বিধ্ব:স্ত, অসহায় কিশোরীদের নিস্তেজ দেহের উপর চলে, পৈশাচিক শিল্পচর্চা। বিবস্ত্র স্পর্ধিত যৌবনকে ক্ষুরের তক্ষী্ণ ফলা দিয়ে নিপুনভাবে কেটে ফেলা হয় ফুটবলের শেপে, চলে বল ছোড়াছুড়ি, লোফালুফি, তরল আগুন ঢেলে নিশ্চিহ্ন করা হয় পরম প্রাপ্তি মাতৃত্ব। কত শৈল্পিক অত্যাচার যে ওরা রপ্ত করেছে তা হালাকু-চেঙ্গিসদেরও বুঝি অজানা।

ছোট বোন রহিমা এসে খবর দিল পাশের বাড়ীর করিম ফকিরের মেয়ে হালিমাকে ধরে নিয়ে গেছে মজিদ শেখের দল। মুহূর্তেই চোখে ভেসে ওঠে ষোড়ষী সুন্দরী হালিমার সলাজ নিষ্পাপ মুখচ্ছবি। ছোটবেলার পুতুল খেলা থেকে একসাথে বেড়ে ওঠা অভিমানী এ মেয়েটি কখন যে ছোট বোনের আসনটি দখল করেছে তা আর মনে পড়ে না। সেই ছোট বোনটার নিয়তি আজ মজিদ শেখের হায়েনাদের হাতে, শুনে মনে হলো, রক্তের ভেতর কেউ এসিড ঢেলে দিয়েছে, দাউ দাউ করে সমস্ত শরীরে জ্বলছে প্রতিশোধের আগুন। কান্নায় ভেঙে আসে বুকটা কিন্তু চিৎকার করে কান্না ছাড়া কি কিছুই করার নেই আমার?

ঘরের কোনায় সজতনে লুকিয়ে রাখা বল্লমটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি উঠোনে, পায়চারীরত ফজল ভাইর একেবারে সামনে। দেশ বিদেশের বিভিন্ন খবরাখবর রাখেন তিনি, প্রগতিশীল না কি যেন কন নিজেকে। চিন্তা নাকি অনেক পরিস্কার, আকাশের মতো মুক্ত। তবে মজিদ শেখের সাথে গোপন সম্পর্ক আছে বলেও গ্রামে একটা কানাঘুষা আছে।

ফজল ভাই পথ আগলে দাড়ান। হাত চেপে ধরে জানতে চান, কোথায় যাস?
রহিমার মুখটা আমার চোখে আরেকবার ভেসে ওঠে, বলি মজিদ শেখের বাড়ী, কেন শুননায়? রহিমারে ওরা ধইর্যা নিছে?
ভ্রুকুটি করেন ফজল ভাই। বলেন, তুমি একলা পারবা ওগো লগে? খালি খালি এলাকায় অশান্তি শুরু করতে চাও?
আমি অবাক হয়ে তাকাই ফজল ভাইর দিকে। এই ফজল ভাই না কথায় কথায় মুক্তচিন্তার কথা কয়, দেশপ্রেমের কথা কয়?
“আমি জানি একলা কিছুই পারুম না, তয় গ্রামের সবাইরে তো জানাইতে পারুম মজিদ শেখের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানো দরকার।” নির্ভীকভাবে জবাব দেই আমি।
কি যে হয় ফজল ভাইর জানি না, চিৎকার করে ওঠেন, “খবরদার, আর এক পাও আগাবা না, মজিদ শেখ তোমার মায়রে গ্রামবাসীর সামনে ধর্ষণ করছিল, কি করতে পারছিলা তার? নিজের মায়ের ইজ্জতের বদলা নিবার পারো নাই, অহন অন্য মাইনষের মাইয়্যাগো লাইগ্যা দরদ উতলাইয়্যা উঠছে, না?”
ফজল ভাই যেন চিতার আগুনে ঘি ঢেলে দিলেন। অস্পষ্টভাবে ভেসে উঠল মায়ের করুন মুখ। মাকে যেদিন মজিদ শেখের দল উঠিয়ে নিয়ে যায় সেদিন এই আমি তিন বছরের শিশু, ইজ্জতের কি-ই বা বুঝেছি? কিন্তু এখন আমি জানি ইজ্জতের দাম সারা দূনিয়া দিয়াও পোষানো যায় না।

অশ্রুসজল চোখে দৃঢ়তার সাথে ঘুরে দাড়িয়ে বলি, “ফজল ভাই, তুমি তো জানো, তখন আমি শিশু আছিলাম, কোন প্রতিকার করতে পারি নাই, অহন গায়ে তাগত আছে, রক্ত টগবগ করে, অহন রহিমার ইজ্জতই আমার মায়ের ইজ্জত, রহিমার ইজ্জতের জন্য দরকার হইলে জীবন দিমু।

ফজল ভাই পথ আগলে কোমর থেকে চকচকে গুপ্তিটা বের করে শাসান, নিজের মায়ের ইজ্জতের বদলা নিবার পারো না, অন্যের ইজ্জতরে নিজের মায়ের ইজ্জত কও, বেজন্মা কোথাকার, যা বাড়ীত যা, বাড়ী গিয়া কুত্তার নাহান চাইট্যা চাইট্যা গু খা।

ফজল ভাইর কথা আর আমার কানে শুনতে পাই না, আমার কানে তীব্রভাবে ভেঙে পড়ে প্রচন্ড ঘুর্ণির আওয়াজ। সুনীল সমুদ্র প্রচন্ড আক্রোশে আছড়ে পড়ে সুদৃঢ় বেড়ি বাঁধে, বানের তোড়ে আগাছার মতো ভেসে যায় বেড়ি বাঁধে বেড়ে ওঠা যত বৃক্ষলতা, আমার প্রতিটি ধমনী সপ্রীংয়ের মতো খেলা করে, পেশিগুলো ইস্পাতের মতো কঠিন হয়ে যায়, মুষ্টিবদ্ধ হাতের মাঝে আহত নাগিনীর মতো ফুঁসে ওঠে জংধরা বল্লম, বিদু্যৎগতিতে এফোড় ওফোড় করে মুক্ত করে দেয় ফজল ভাইয়ের যত দূষিত মুক্তচিন্তা।

একসাগর দূষিত রক্তেভেসে বেড়ানো ফজল ভাইয়ের দেহটা ডিঙিয়ে আমি এগিয়ে চলি, পথ যে এখনো অনেক বাকী, মফিজ শেখের বাড়ী এখনো অনেক দূর।

Be Sociable, Share!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।