মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা কত?

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে
বাংলার স্বাধীনতা আনলো যারা
আমরা তোমাদের ভুলবো না..

না, শহীদদের প্রতি কৃত আমাদের এ ওয়াদা আমরা রক্ষা করতে পারিনি, তাদেরকে স্মরণে রাখতে পারি নি, এমনকি তাদের নামগুলো পর্যন্ত আমরা সংরক্ষণ করতে পারি নি, শুধু তাদের নামকে ব্যবহার করে আখের গোছাতে পেরেছি।

কেউ কি সত্যি করে বলতে পারেন, একাত্তরে কতজন দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করে শহীদ হয়েছিলেন? “ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতা”, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, গবেষণাপত্র আর ইতিহাস গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। কিন্তু তা সুস্পষ্ট কোন জরিপের ভিত্তিতে নয় বরং রাশিয়ার একটি পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী বলা হয়ে থাকে, স্বাধীনতার পরে শেখ মুজিবুর রহমানও ত্রিশ লক্ষ শহীদের দাবী করেছিলেন।

সংখ্যা দিয়ে কি বর্বরতা পরিমাপ করা যায়? লাশের সংখ্যা কম বেশিতে কি অপরাধের মাত্রা কমে যায়? না, যায় না, অন্যায়ভাবে একটি প্রাণ কেড়ে নেয়া পুরো মানব সভ্যতাকে হত্যা করারই নামান্তর। অন্যায় ভাবে সমগ্র বিশ্ববাসীও যদি নিরপরাধ কাউকে হত্যা করে, তবে বিশ্বের প্রতিটি মানুষই হত্যাকারী, অপরাধী। মানব প্রাণ সে যত ছোটই হোক না কেন, যত নীচু জাতের হোক না কোন, যত গরীবই হোক না কোন, সে মানুষ, তার জীবনের মূল্য পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত শাসকের চেয়েও কোন অংশে কম নয়। তাই সংখ্যা নয়, হত্যাকারী দোষী হত্যার জন্য, কতজনকে হত্যা করলো তা বিবেচেনায় আনা জরুরী নয়।

আমি অবাক হয়ে যাই, স্বাধীনতার পরে চল্লিশটি বছর দেশের রথি-মহারথিরা, মুক্তিযুদ্ধের ফেরীওয়ালারা শাসন করে গেছেন, অথচ স্বাধীনতা যুদ্ধে যে সকল বীর সন্তানরা শহীদ হয়েছেন তাদের সঠিক সংখ্যাটি আজও জাতি জানতে পারে নি, জানতে পারে নি সর্বমোট কতগুলো নিরীহ বাঙ্গালী পাক হানাদার ও ওদের দোসরদের হিংস্র ছোবলে জীবন দিয়েছিল। প্রকৃত তথ্য জানার অধিকার প্রতিটি শহীদ পরিবারের রয়েছে, প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের রয়েছে, প্রতিটি বাংলাদেশীর রয়েছে। আজ একুশে টেলিভিশনে রিপোর্ট দেখলাম, দাবী করা হয়েছে একাত্তরে নিহতের সংখ্যা অনুমিত ত্রিশ লাখের চেয়ে অনেক বেশী। আবার কেউ কেউ দাবী করেন, শহীদের সংখ্যা দুই থেকে তিন লাখের মাঝে সীমাবদ্ধ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যারা শহীদ হয়েছে তারা তো  প্রায়একলক্ষ আটচল্লিশ হাজার বর্গকিলোমিটারের বাংলাদেশেরই সন্তান, আজো যাদের অধিকাংশেরই পরিবার পরিজন, আত্মীয়-স্বজন বেঁচে আছেন। তাহলে এটা কি খুবই কঠিন ছিল, দীর্ঘ চল্লিশটি বছরেও আমরা আমাদের শহীদদের তালিকাটি তৈরী করতে পারলাম না কেন?

কে দেশপ্রেমী? এ প্রশ্নের উত্তর শুধুমাত্র কাজেই প্রমাণ মেলে। আর দেশপ্রেমের সর্বোত্তম উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন একাত্তরে রনাঙ্গনে যারা সশস্ত্র যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, যারা সশস্ত্র যুদ্ধ করে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য ছিনিয়ে এনেছেন, যারা মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য, রসদ, আশ্রয়, চিকিৎসা ও তথ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন। এর বাইরে সে সকল সাধারণ মানুষকেও মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নেয়া যায় যারা যুদ্ধ না করলেও, পাকহানাদার ও তাদের দোসরদের নির্যাতনে নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন।

দেশপ্রেমের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত যারা স্থাপন করেছেন, যারা নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিয়ে দেশ প্রেম প্রমাণ করেছেন তাদের তালিকা দীর্ঘ চল্লিশটি বছরেও করা সম্ভব হয় নি, এর চেয়ে দূর্ভাগ্য আর কি হতে পারে? অথচ যারা সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নি তারাই আজ মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট নিয়ে ভন্ডামী করছে? যারা স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছে তাদের অবস্থানও স্পষ্ট, তারা অখন্ড পাকিস্তানের জন্য যুদ্ধ করেছে, পাকিস্তানীদের দৃষ্টিতে তারাও শহীদ, তারাও দেশ প্রেমিক এবং অবশ্যই বাংলাদেশের শত্রু ছিল। কিন্তু সেই সব শান্ত শিষ্ট ভদ্রলোকদের কি বলবো, যারা একাত্তরে বাধ্য ছেলের মতো কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশপ্রেমের কেতাবী শিক্ষা নিযেছেন? যারা বউয়ের আচলে মুখ লুকিয়ে ঘর-সংসার করেছেন?  যারা পাকিস্তান সরকারের অধীনে  বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত চাকুরী করেছেন, বেতন-ভাতা নিয়েছেন? এদের মাঝে অল্প কিছু সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন, এবং কেউ কেউ চাকুরী না করলে হয়তো মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হতো। কিন্তু বাকীদের কি বলবো? কাপুরুষ বললে নিশ্চয় বেশি বলা হবে না। অথচ সেই সকল কাপুরুষেরাই যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আগড়ম বাগড়ম করে তথ্ন ঘৃণায় মুখ ভরে ওঠে। এই দলটি যে আসলে রাজাকারদের চেয়েও ভয়ংকর তা অবোধগম্য নয়। বাংলাদেশ যদি স্বাধীন না হতো, তবে এরাই অখন্ড পাকিস্তান ও পাক হায়েনাদের গুণকীর্ত্তনে মুখে ফেনা তুলে ফেলতো। আসলে এরা মুনাফিকদের মতো, সুযোগ সন্ধানী, অপেক্ষায় থাকে কে জিতে যায় যুদ্ধে, তার পায়ে তেল মর্দনের জন্যই ওদের আমরণ প্রতীক্ষা।

স্বাধীনতার পরে ৪টি আদম শুমারী হয়েছে, প্রতিটি নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা হাল নাগাদ করা হয়েছে, দেশব্যাপী জাতীয় পরিচয় পত্র তৈরী করা হয়েছে,  বছর জুড়েই কোন না কোন জরিপ লেগেই আছে, অথচ দেশের গর্ব, জাতির আবেগের স্থল একাত্তরের শহীদদের কোন তালিকা আজো করা হলো না? কেন? তার মানে কি সরকারগুলো বিশ্বাস করে না যে একাত্তরে ত্রিশ লক্ষ শহীদ হয়েছিল? তালিকা করলেই এ সংখ্যা কমে যাবে? নাকি তারা পাকিস্তানীদের অপরাধ লঘু করতে প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে কম সংখ্যা দেখাচ্ছে যেমনটা দাবী করা হচ্ছে, শহীদের সংখ্যা ত্রিশ লাখের বেশি হবে। সরকারের একটি মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ও আছে, মুক্তিযুদ্ধের সর্বসত্ত্ব সংরক্ষক বলে দাবীদার আওয়ামী সরকার এ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকাটিও করতে পারলো না?

২০০১ সালে, সবে ইন্টারনেট ব্যবহার শিখেছি, দিনরাত ইন্টারনেট নিয়ে ঘাটাঘাটি করে একদিন ঢুকে পড়েছিলাম পাকিস্তানের একটি রাজনৈতিক দলের ওয়েবসাইটে। তাদের দল পাকিস্তানের কোন কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে, কোন কোন রনাঙ্গনে তাদের কতজন শহীদ (তাদের ভাষায়) হয়েছে, তাদের ছাত্র সংগঠনের কারা কারা একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ করেছে তার বিশদ তালিকা দেখেছিলাম। অবাক হওয়ার মতো বিষয় এই যে, সেখানে শুধুমাত্র তাদের ছাত্রদেরই ১০ হাজার শহীদ (তাদের ভাষায়) হওয়ার  কথা উল্লেখ আছে এবং তার পূর্ণাঙ্গ তালিকাও দেয়া ছিল, যেখানে বাংলাদেশের কোন জেলার কোন গ্রামের কোন পিতার সন্তান তারা, তারও বিশদ উল্লেখ ছিল। দুঃখের বিষয় সংগঠনটির সে ওয়েবসাইটটি আজ আর খুঁজে পাই না, মিরর সাইটে সেই তালিকাগুলোও আর নেই। আজকের মতো যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে এতো হৈ চৈ তখন হলে তালিকাটি সংরক্ষণ করে রাখতে পারতাম।

আমাদের প্রতিপক্ষ তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য ধরে রাখতে জানে, কিন্তু আমরা আজো জাতিকে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি তালিকা উপহার দিতে পারিনি, আজো শহীদদের প্রকৃত সংখ্যাটি, তালিকাটি নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে পারিনি, পারিনি প্রকৃত স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার আলবদর আলশামসের তালিকা তৈরী করতে। শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বকে নিজেদের বিরত্ব বলে জাহির করে, মহান মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে সাধারণ জনতার প্রচন্ড আবেগকে ব্যবসায়ের পুঁজি বানিয়ে রাজনীতি করে গেছে ওরা। আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য যাকে তাকে রাজাকার, রাজাকার বলে যুদ্ধাপরাধের মুলো ঝুলিয়ে নির্যাতন করার মাধ্যমে পাক হায়েনাদের মতো ক্ষতবিক্ষত করা হচ্ছে দেশটাকে।

আমরা রাজনীতিমুক্ত মুক্তিযুদ্ধ চাই, যে মুক্তিযুদ্ধ ছিল শুধুই দেশপ্রেমি বাংগালীদের, একক কোন দলের নয়। আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা চাই, একাত্তরে শহীদ হওয়া বীর বাঙালীর পরিচয় জানতে চাই, শ্রদ্ধাভরে তাদের স্মরণ করতে চাই। শহীদদের প্রকৃত তালিকা করে দেশপ্রেমী বাংলাদেশীদের উপহার দেয়ার ন্যূনতম সৎ সাহসটুকুও কি দেখাবে না আওয়ামী সরকার?

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন