সাধারণ মানুষ যুদ্ধাপরাধের বিচার চায় কি?

“আপনি কি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চান?”

আমার পরিচিত এক বিশিষ্ট আওয়ামী বুদ্ধিজীবীর কাছে প্রশ্ন করেছিলাম, যিনি একাত্তরে স্বশস্ত্র যুদ্ধ করেছেন। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বলতে যা বোঝায়, তিনি আসলে তা-ই, মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট আছে, আছে আর্মস এন্ড এ্যামিউনিশন জমা দেয়ার সার্টিফিকেটও এবং এলাকার অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারাও গর্ব করেন তার বীরত্ব নিয়ে।

“অবশ্যই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই”। অকপটে একবাক্যে জবাব দিলেন তিনি। জবাবটি এতটাই স্বতস্ফূর্ত যে, যে কেউ খুব সহজেই বুঝতে পারবেন তিনি আওয়ামী বুদ্ধিজীবী।

“তাহলে আপনি কি আপনার চাচাজানের বিচার হোক তা কি চান?”

এমন প্রশ্নে তিনি অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন, অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন, অবশেষ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জবাব দিলেন, “না তার বিচার হোক তা কিছুতেই চাই না।”

অবশ্য না চাওয়ার পেছনে যথেষ্ট যুক্তিও আছে, এলাকায় যুদ্ধের আগেও তিনি যেমন সম্মানিত ছিলেন, যুদ্ধের পরেও ততোধিক দাপটের সাথে, সম্মানের সাথে, শ্রদ্ধার সাথে এলাকায় বসবাস করেছেন। রাজনৈতিক ভিন্নতার কারণে তিনি পাকিস্তান সরকারের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন, শান্তি কমিটির প্রভাবশালী নেতা ছিলেন তবে যুদ্ধের আগে বা পরে তার বিরুদ্ধে কোন অপকর্মের কোন নজীর এলাকাবাসী আদৌ খুঁজে পায় নি। দোষ তার ঐ একটাই, একাত্তরে শান্তিকমিটি করেছিলেন। কিন্তু জীবনসায়াহ্নে প্রায় নব্বই বছর বয়সে তাকে যুদ্ধাপরাধী বলে বিচারের কাঠ গড়ায় দাড় করানো হবে তা ভাবতেই যেন তিনি শিউরে ওঠেন।

“আপনি আপনার চাচার বিচার চান না তাহলে কি করে আশা করেন যে দেশের অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীদের আত্মীয় স্বজন তাদের বিচার চাইবে?”

আসলেই যুদ্ধাপরাধ ইস্যুটি এত পুরনো একটি জটিল সমস্যা যে ইচ্ছে করলেই এর সরল সমাধান টানা যাবে না, তাতে সুতোয় আরো জট লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রকট।

সেদিন বিকেলে কাঁচাবাজারে ঢুকছি। কয়েকজন (৬/৭ জন) লোক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবী সম্বলিত একটি ব্যানার টানিয়ে, রিক্সায় মাইক লাগিয়ে লোকজনকে যুদ্ধাপরাধ বিচারের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে সাধারণ মানুষ এখন আর যুদ্ধাপরাধ ইস্যুটিকে দেশ কিংবা দেশের জনগনের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য কোন জরুরী বিষয় মনে করে না, বিশেষ করে সাধারণ মানুষের মাঝে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবী সম্পূর্ণরূপে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক শ্লোগান, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মরচে ধরা পুরণো হাতিয়ার এমনটাই মনে করে।  কেউ কেউ একে শহুরে লোকদের বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুন প্রজন্মের আলোচ্য বিষয় বলে মনে করেন। যারা পেপার পত্রিকা বেশি ঘাটেন তাদের ধারণা এর ফলে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করা ছাড়া ফায়দা কিছুই হবে না, যাকে বলে দেশকে দুটি বিপরীত মেরুতে বিভক্ত করা, যা কখনো কখনো গৃহযুদ্ধের মতো ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয় জাতিকে।

আসলে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস যাই বলি না কেন বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে নিদেন পক্ষে প্রতিটি পরিবারে দু’একজন খুঁজে পাওয়া যাবে, আর এরা দীর্ঘ চল্লিশ বছরে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা যাদের নামে সবচেয়ে বেশী যুদ্ধাপরাধের লেবেল সাঁটা হয় তারাই সমাজে সবচেয়ে বেশী শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব এবং আরো আশ্চর্য বিষয় এই যে এরাই দেশের আদর্শিক রাজনীতি কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠাগুলোতে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। আরো মজার ব্যাপার এদের বিরুদ্ধে একাত্তরে যুদ্ধাপরাধ ছাড়া যুদ্ধের পূর্ব কিংবা যুদ্ধ পরবর্তী এই দীর্ঘ চল্লিশটি বছরে আর কোন বড় ধরণের অপরাধের দাগ লেগে নেই।

আর আত্মীয়তার বন্ধন এমন যে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তার বেয়াইয়ের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে বলছেন, তার বেয়াই রাজাকার হলেও যুদ্ধাপরাধী নয়। তাহলে এবার বুঝুন, প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত আত্মীয়তার বন্ধনকে উপেক্ষা করে বেয়াইকে যুদ্ধাপরাধী বলে গালি দিতে পারেন না তার বিচার কামনা করতে পারেন না বরং তার নিরাপত্তার জন্য তাকে যুদ্ধাপরাধী নন বলে ঘোষণাও করছেন, সেখানে সাধারণ মানুষের পক্ষে যুদ্ধাপরাধী বলে বলে নিজেদের বাপ-চাচা-দাদা আত্মীয় স্বজনদের মাঝে খুঁজে খুঁজে বিচারের কাঠ গড়ায় দাড় করানো আদৌ কি সম্ভব?

যুদ্ধাপরাধ বিচারের নামে এই যে মহা আয়োজন তার সাথে আসলেই সাধারণ মানুষের কোন চাওয়া পাওয়ার সমন্বয় আছে কি না কিংবা সাধারণ মানুষ আদৌ যুদ্ধাপরাধ ইস্যুটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে কি না কিংবা তারা একে রাজনৈতিক ব্যর্থতাকে ঢেকে দেয়ার অপকৌশল মনে করে কি না তা কি একবারও ভেবে দেখা উচিত নয়?

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“সাধারণ মানুষ যুদ্ধাপরাধের বিচার চায় কি?” লেখাটিতে 6 টি মন্তব্য

  1. পাশা বলেছেন:

    ভালই লেখেছেন।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    ধন্যবাদ পাশা ভাই, অনেক দিন পর কমেন্ট পেলাম।

    [উত্তর দিন]

  2. সালাম বলেছেন:

    ভালই লেখেছেন।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    ধন্যবাদ। অনুপ্রাণিত হলাম।

    [উত্তর দিন]

  3. Shamsul Alam বলেছেন:

    Very Good

    [উত্তর দিন]

  4. যুদ্ধাপরাধের বিচার : জাতিকে বিভক্তির মাধ্যমে হিংসাত্মক যুদ্ধে ঠেলে দেয়ার অপচেষ্টা | শাহরিয়ারের বলেছেন:

    […] […]

মন্তব্য করুন