আদম আলী মাস্টারের সংসার

ভরদুপুরটাকে মাথায় নিয়ে বাসায় ফেরেন আদম আলী। সঙ্গে আবার কোত্থেকে জুটিয়েছেন সুটেড বুটেড এক ভদ্রলোককে। দেখেই মেজাজটা খারাপ হয়ে যায় লাকীর মা’র। নিজের আক্কেল বুদ্ধি এখনও পাকে নাই, হাজার হাজার পোলাপান মানুষ করে কেমনে খয়রাইত্যা মাস্টারে?

লাকীর মা। আদম আলীর স্ত্রী। বিয়ের আগে একটা নামও ছিল, স্কুলের সখীরা আহাদ করে নামের সাথে লেজও জুড়ে দিত কিন্তু লাকীর জন্মের পর সে নাম কোন আস্তাকুড়ে যে হারিয়ে গেছে তার আর কোন খোঁজ নেই। স্কুলের গন্ডি পেরোনোর আগেই বিয়ে হয়ে যায় দশগ্রাম দূরের এক বেসরকারী কলেজ মাস্টার আদম আলীর সাথে। বিয়েতে অবশ্য তার কোন আপত্তি ছিল না বরং এক মাস্টারের সাথে বিয়ে হবে এমন স্বপ্ন দেখতেই তার ভালো লাগতো।

কিন্তু বিয়ের পরেই লাকীর মা বুঝে ফেলে শতাব্দীর সেরা ভুলটা তার জীবনে ঘটে গেছে। না তার মানুষটা খারাপ না, খালের পেরির (নরম কাদা) মতো নরম, ভালোবাসায় পরিপূর্ণ নিঃখাদ খাটি মানুষ আদম আলী। তবে কথায় আছে না “দারিদ্র এসে যখন সদর দরজায় কড়া নাড়ে, ভালোবাসা তখন পেছনের খিড়কি খুলে পালিয়ে যায়” তার হয়েছে ঠিক তেমন অবস্থা। বেসরকারী কলেজের মাস্টার, তাই একমাস বেতন পায় তো দুমাস না খেয়ে দিন পার করতে হয়। ঘরের প্রতিটি কোনে কোনে, প্রতিটি আসবাব পত্রে, লাকীর মার বসনে সবখানেই দারিদ্র স্থান করে নিতে শুরু করে।

দারিদ্রের জন্য তো আর ভালোবাসা থেমে থাকে না, তাই দিনে দিনে মুখের সংখ্যা বাড়তে থাকে, বাড়ে না শুধু চাল-ডাল কেনার বেতন। তারপরও মুখ বুজে সব সহ্য করতে হয়, অভাবগুলো সবার চোখের আড়ালে রাখতে হয়, পাছে মাস্টারের সম্মানের এতোটুকু হানি হয়। সম্মানের দিক থেকে তিনি টিএনওর চেয়ে কোন অংশে কম না তাই নিয়মিত তাদের সাথে তার ওঠাবসা। তাদের সাথে ঠাট বজায় রেখে চলতে তাই তাকে ঘরের চেয়ে ঘরের বাইরের দিকেই বেশি মনোযোগী হতে হয়।

আদম আলী যেমন কোমল হৃদয়ের মানুষ, তেমনি তার আদর্শ আবার টনটনে। পৃথিবী কয়েক ডিগ্রী হেলে যেতে পারে তবু তিনি তার আদর্শচু্যত হতে পারেন না। আর এ কারনেই ছাত্রদের প্রাইভেট পড়ান না, পড়ালেও কারো কাছে টাকা চাইতে পারেন না, ছাত্ররাও চামে টাকাটা তুলে রাখে ময়ুরী মুনমুনের জন্য।

দুমাস ধরে বেতন বন্ধ। বার বার আন্দোলন চলে বেতন বাড়ানোর জন্য, কাফনের কাপড় পেচিয়ে, আত্মাহুতি দেয়ার হুমকি দিয়ে খুব একটা কাজ হয় না। বিরোধী দলীয় নেত্রী আসেন, শরবত খাইয়ে অনশন ভাঙেন, প্রতিশ্রুতি দেন, সরকারে গিয়ে পিটিয়ে ছাগল ম্যান করার শপথ নেন। কিন্তু তবু আদম আলীর চুলায় হাড়ি চড়ে না।

আদম আলীর বাসার ড্রইং রুমে সোফা আর বুকসেফলে থরে থরে বই দিয়ে আভিজাত্যের ছোয়া দেয়ার চেষ্টা চালিয়েছেন। বাসার সামনে বিভিন্ন প্রজাতির ফুল গাছের বাগান। কিন্তু ভেতরে যে কয়েকটা মুখ না খেয়ে বোবা কান্নায় অশ্রু ঝড়ায় তা বাইরে থেকে কারো জানা হয় না।

কয়েকদিন ধরে একবেলা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে লাকীর মায়ের সংসারে। তাই আজ তরকারী বলতে আছে বাসার সামনের নতুন মাটিতে বেড়ে ওঠা দুধকচুর ডগা। খেতে অবশ্য খারাপ না বরং মেহমানকে তা দিলে খুশিই হবে। সবাই রোস্ট পোলাও দেখলেই বলে এ সবে রুচি নেই, কচুর লতি, ভাজি ভুজি হলে বেশ হতো। কিন্তু শুধু দুধকচুর তরকারী মেহমানকে দিলে মনে মনে ঠিকই মেজবানের পিন্ডি চটকাবেন।

লাকীর মা তার ছোট ছেলেকে ডেকে কয়টা টাকা দিয়ে পাঠান মেনাজ মিয়ার হোটেলে। হোটেল থেকে ছোট্ট বাটিতে করে আসে মুরগীর আস্ত একটা রান। লাকীর মা দ্রুত মসলা-পাতি নিয়ে বসে যান মুরগীর রানটাকে মসলা দিয়ে একটু ভালো করে রান্নার কাজে। আর যাই হোক মেহমানের সামনে তিনি মাস্টারকে খাটো করতে পারেন না।

মেহমান তৃপ্তি সহকারে মুরগীর রান চিবান। তৃপ্তির ঢেকুর তুলে আদম আলীকে বলে, “ভাই, আপনার রাজ কপাল, ভাবীর হাতের রান্না যেন অমৃত, মনে হয় প্রতিদিন একবার করে মেহমান হই আপনার বাসার।”

আদম আলী নিশব্দে দীর্ঘশ্বাস লুকান, হাসি মুখে মেহমানদারী করেন। বাইরের চাকচিক্য দেখে মেহমানের আর জানা হয় না, কতগুলো মুখ দিনের পর দিন অভুক্ত রয়ে যায় পর্দার আড়ালে।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন