সময় গেলে সাধন হবে না

ক্লাস সেভেনে থাকতেই নিয়মিত জামায়াতে নামাজ পড়ার ব্যাপারে অভ্যস্ত হয়ে পরি। আযানের আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়তাম। এরপর পাড়ার প্রতিটি বাড়ীতে কড়া নেড়ে নেড়ে বন্ধুদের ঘুম ভাঙাতাম। বন্ধুদের অধিকাংশই সমবয়েসী, কেউ ক্লাস সিক্সে পড়ে, কেউ সেভেনে আবার কেউ বা ক্লাস এইটে। পাড়ার অভিভাবকরাও ধর্মীয় অনুশাসন মানার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন, তাই জামায়াতে নামাজ পড়ার এ আন্দোলনের প্রতি সবারই ছিল অকুষ্ঠ সমর্থন।

ঘুম ভাঙতেই আমার অভিযান শুরু। একে একে মাইনুল, ফরিদ, জুয়েল, অলি এভাবে সব বন্ধুকে নিয়ে মেতে উঠি উৎসবে। আমরা এতো ভোরে উঠতাম যে আজান দেয়ার জন্য মোয়াজ্জিন ঘুম থেকে জাগে নি। তাই আমরা মুয়াজ্জিনের বাসায়ও কড়া নাড়ি। অবশ্য মাঝে মাঝে আমাদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ আযান দিয়ে মুয়াজ্জিনের ঘুমের মাত্রা বাড়িয়ে দিতো। নামাজ শেষে বন্ধুরা মিলে বেইলি ব্রিজ পর্যন্ত দলবেধে জগিং।

শীতের সকাল। শীতকালে অবশ্য কেন যেন ঘুমটা আমার একটু আগেই ভাঙে। হয়তো রাত বড় বলে কিংবা শীতের রাতে ৯টার আগেই ঘুমিয়ে পরি বলে খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে যায়। প্রতিদিনের মতো সেদিনও বাসায় বাসায় হানা দিচ্ছি। একে একে কয়েকজন বন্ধু দলে জড়ো হয়েছে। অবশেষে সর্বশেষ বন্ধু মিঠুর বাসায় কড়া নাড়লাম। মিঠু আমার এক বছরের জুনিয়র। ওর বাবাও আমার বাবার মতোই কলেজে পড়ান, যদিও কলেজ ভিন্ন। স্বভাবতই ওর সাথে আমার বন্ধুত্বটা বেশি গাঢ় ছিল।

কিন্তু সেদিন কড়া নাড়তেই স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। ভেতর থেকে ওর বাবার ঝাঁঝালো হাক, “প্রতিদিন ঘুমের ডিস্টার্ব করো, পেয়েছো কি তোমরা? আর যেন কখনো কড়া নাড়তে না দেখি”।

আগেও দেখেছি মিঠুর বাবা নামাজ-রোজার ব্যাপারে উদাসীন। তবে তার মাত্রা যে এতোটা তা আমাদের কচি মন বুঝে উঠতে পারে নি। বিশেষ করে নামাজের দাওয়াত দিতে গিয়ে এভাবে অপদস্ত হতে হবে তা স্বপ্নেও ভাবতে পারি নি আমরা, তাই এক বুক কষ্ট নিয়ে নামাজ পড়ে বাসায় ফিরে আসি।

সকাল থেকেই মিঠুর আচরণ সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। আমাদের সাথে আর কথা বলে না। একই স্কুলে পড়ি, অথচ স্কুলে দেখা হলেও মুখ ফিরিয়ে নেয়। শেষে একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় ওকে সবাই মিলে ধরে জিজ্ঞেস করলাম, কি দোষ আমাদের, আমাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করছে কেন ও। কিন্তু ও আমাদের সবাইকে চমকে দিয়ে আমাকে তেড়ে এলো মারতে । ভবিষ্যতে ওকে আর ডিস্টার্ব করলে মেরে হাড় গুড়ো করে দেবে এমন হুমকিও দিল। প্রচন্ড কষ্ট পেলাম ওর আচরনে, অথচ ওকে আমি নিজের ছোট ভাই ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারতাম না।

কিছুদিন আগে বাড়ী গেলাম। মিঠুর মায়ের সাথে হঠাৎ করেই রাস্তায় দেখা। সালাম, কুশল বিনিময়ের পরে তিনি আমাকে শোনালেন মিঠুর অধ্বঃপতনের কথা। স্কুল পেরোতে না পেরোতেই বখাটে ছেলেদের সাথে মিশে যায় মিঠু। ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় ধোয়াটে নেশার জগতে। বাবা মায়ের সাথে আজে বাজে ব্যবহার, জোর করে বাবার পকেট থেকে টাকা ছিনতাই প্রভৃতি চলতেই থাকে। শেষে মায়ের সকল গহনা ও টাকা পয়সা নিয়ে একদিন পালিয়ে যায় বাসা থেকে। অনেক খোজাখোজির পরে ওর সন্ধান মেলে, ফিরিয়েও আনা হয় বাড়ীতে। তবে সেই গহনা বা টাকা কিছুই আর ফেরত আসে না।

মিঠুর মা আমার দুহাত চেপে ধরে কান্নাজড়িত কন্ঠে বললেন, “বাবা তুমি ছোট সময় যেমন ওকে নামাজের জন্য ডেকে নিয়ে যেতে আবার একটু ওকে সেভাবে ডাকতে পারো না? ওকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আবার ভালো পথে নিয়ে আসতে পারো না?”

আমি তার অশ্রুভেঁজা মুখের দিকে চেয়ে কিছুতেই বলতে পারি না, খালাম্মা, এখন যতই ডাকি ওকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব না”। আমি জানি ও আর ফিরে আসবে না তবু আমি তাকে কথা দেই, ওকে ফিরিয়ে আনার মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদায় নেই। আমার মনে লালন ফকির গুণগুণিয়ে গেয়ে ওঠে

“সময় গেলে সাধন হবে না
দিন থাকিতে দিনের সাধন কেন করলে না…”

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“সময় গেলে সাধন হবে না” লেখাটিতে 2 টি মন্তব্য

  1. helal বলেছেন:

    অসাধারন লেখা। আসলেই এ ধরনের এক্সপেরিয়েন্স আমারও হয়েছিলো। ধন্যবাদ।

    [উত্তর দিন]

  2. পাশা বলেছেন:

    সময় কথা বলে। এই রকমই হয়।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন