নেমন্তন্ন

স্বামী আর সাতটি অমরাবতি নিয়ে সবিতা কাকীর সংসার, জসিমউদ্দিনের কবিতার মতো ঘর। একই রুমে ঘরকন্যা, ঘুমপাড়ানি গান, আসমানীদের আকাশ কুসুম স্বপ্নবিলাস, থালাবাসন, মাটির কলস, তেলচিটচিটে খাতাবালিশ। ঘরের কোনে যৌতুক জমানো বাঁশের ব্যাংক, কাঁধে কুজোঁ হয়ে হেলান দিয়ে হোগল পাটি। বড় ছেলে গৌতমবুদ্ধ, ক্ষুৎপিপাসায় কাতর পাপিষ্ট মানবজাতির যন্ত্রণায় সংসারত্যাগী। মেঝটার উড়ু উড়ু মন, ছিনেমা হলের পাশের গলিতে অষ্টপ্রহর বাঁধা মন । তিন তিনবার মেয়ে বিয়োনো বড় মেয়ে নাইওরে বারো মাস বাবার বাড়ী । চেহারা সুরতে মেঝটাই সেরা, বাইন্যার লিপিস্টিকে টকটকে লাল। পাছে লোকে কিছু বলে! সবই যদি দেব তবে কাঁচের চুড়ি রঙ্গীন ফিতেয় লজ্জা কিসে?

বছরের কয়েকটা দিন কাকড়া নামে খালে বিলে। সতীশ কাগু কোলায় কোলায় কাকড়া ধরেন, বাকী সময় কাটে লাঠি হাতে, কচ্চপ শিকারে গ্রামে গঞ্জে । এবারে বেশ কাকড়া পড়েছে, হাজারে হাজারে লাল কাকড়ার ঢল। প্রতি বছর কাকড়ার ঘিলু দিয়ে বড়া করেন সবিতা কাকী, মাংসে রাঁধেন ঝোল। খোলসগুলো ফেলনা নয় মোটেই, যদিও ভাসিয়ে দেয়া হয় খালের জলে, সেখান থেকে সোজা যাবে বঙ্গোপসাগর, আগামী বছরে নতুন জীবনে ঠিক ঠিক ফিরে আসবে শকুনী বিলে।

কাশির বোতলে আঙ্গুল মেপে তেল কেনেন সতীশ কাগু, ১০৬ টাকা ল্যুজ সয়াবিনের দামটা তবু জানা হয় না তার, আদার বেপারীর জাহাজের খবরে যে বেহুদা সময়, কি দরকার! বোতলের মুখে বাশের ছিপি, পাটিশাপ্টা পিঠে বানানো কলাপাতার ডাটার মতো মসৃণ করে কাটা, মাঝে সুক্ষ্ন ছিদ্র, হাজার ঝাঁকুনিতে এক ফোঁটার চেয়ে কিছুতেই যেন বেশী তেল না বেরোয়। নিঁপুন হাতে চেঁচে চেঁচে  তৈরী করেছেন তেলের শিশির ছিপি, যেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চির কোন মহৎ শিল্পকর্ম। রন্ধন শিল্পের জন্য উপযুক্তই বটে ছিপি শিল্প। এ দিয়ে জমবে বেশ এ বছরের কাকড়া উৎসব।

কাকিমা উনুনে পাত্র চড়ান, হিসেবী হাতে পাটি শাপ্টা পিঠের মতো পাতিলে ঘষেণ ছিপি আলতো করে। আঙ্গুল মেপে কেনা সয়াবিন তেল, প্রতি ফোঁটায় বিশুদ্ধতা, প্রতি ফোঁটায় স্বর্গীয় ঔদ্ধত্য, সে কি আর বেহিসেবী খরচ করা যায়? স্বর্গীয় সয়াবিন তেলের দু’ফোটা যেন রূপকথার কাব্য, সোনার কাঠি রূপোর কাঠিতে জাগে রাজকন্যে। আর কি আশ্চর্য দেখ, দু’ফোটা স্বর্গীয় তেলে  লালাঝড়ানিয়া কাকরার বড়ায় ঠাকুমার চোখে চিক চিকে আনন্দ ঝরায় ; শিখা, রেখা, কাজলীরা ভেসে বেড়ায় প্রজাপতির স্বপ্ন ডানায় । সবই তোমার ইচ্ছে ঠাকুর! চৌদ্দপুরুষের পূণ্য হলে তবেই না অমন স্বাস্থ্যকর প্রতি ফোটায় স্বপ্নজাগে। ইশ্বরের কৃপায় তেলের দাম নাগালে বলে এখনো কাকড়ার বড়ায় লালা ঝরে।

শেখ হাসিনা নেমন্তন্ন তোমায়, লালা ঝড়ানিয়া কাকড়ার বড়ায় ডালি সাজিয়ে সবিতা রানীরা তোমারই অপেক্ষায়।

Be Sociable, Share!

2 Replies to “নেমন্তন্ন”

  1. লেখাটি পড়ছিলাম আর নিজেকে মনে হচ্ছিল আমিই এক সতীশ চন্দ্র। সতীশ কাগুর মত আমাদেরকেও প্রতিদিন কত ধরনের ছিপি তৈরি করতে হচ্ছে তারই খবর কে রাখে।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।