আলোকিত নেতা মওদূদী (রহ:) : লেখালেখিতে হাতেখড়ি

“শহীদের রক্তের চেয়ে জ্ঞানীর কলমের কালি উত্তম”। মওদূদী (রহঃ) তার জীবনে হাদীসের এ বাণীকে এতো গুরুত্ব দিতেন যে কলমকেই তার জিহাদের প্রধান হাতিয়ার বানিয়ে নেন। তিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেন জ্ঞানার্জনে এবং গ্রন্থ রচনায়। দিনের শেষে যখন সমগ্র পৃথিবী ঘুমের কোলে মাথা লুকায়, তখন তিনি বসে পড়তেন বইপত্র আর কাগজ-কলম নিয়ে। রাতের পর রাত তিনি পার করেছেন অধ্যয়ন করে, দ্বীনের খেদমতে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় ও সমসাময়িক সমস্যাবলী নিয়ে মৌলিক গ্রন্থ রচনায়।

তিনি নিছক কল্পনাপ্রসুত বিষয়াদি নিয়ে লেখালেখির পক্ষপাতি ছিলেন না, তিনি লিখতেন কোরআন-হাদীস অধ্যয়ন করে, পূর্ববর্তী মনিষীদের ইসলামী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখা প্রামাণ্য গ্রন্থ পড়ে এককথায় প্রচুর সহায়ক পুস্তক অধ্যয়ন করে। আর এ কারনেই তার যেকোন বই পাঠ করলে শতাধিক গ্রন্থের রেফারেন্স পাওয়া যায়।

তার ক্ষুদ্র জীবনে বারবার তিনি কারা নির্যাতন ভোগ করেন, কিন্তু কারাগারকেই তিনি তার স্টাডিরুমে পরিনত করেন। তার অনেক মৌলিক গ্রন্থ এমনকি তাফহীমুল কোরআনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ তিনি জেলখানাতে বসেই লিখে ফেলেন। আর জীবনের শেষ দিকে আমেরিকার বাফেলো হাসপাতালে বসে তিনি লিখতে থাকেন “সিরাতে সরওয়ারে আলম” নামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সীরাত গ্রন্থ।

লেখালেখির ক্ষেত্রে তিনি এতো সতর্কতা অবলম্বন করেন যে গবেষণার ক্ষেত্রে তিনি নতুন দিগন্তের সৃষ্টি করেন। তাফহীমুল কোরআন রচনার ক্ষেত্রে তিনি এটা অনুভব করেন যে কোরআন যে পরিবেশে যে পরিস্থিতিতে নাজিল হয় তা না জেনে কোরআনের ব্যাখ্যা করলে অনেক কিছুই অস্পষ্ট থেকে যায়। এজন্য তিনি তাফহীমুল কুরআন রচনার ক্ষেত্রে সৌদি আরব সফর করে কোরআন নাজিলের বিভিন্ন স্থান স্বচক্ষে ঘুরে ঘুরে দেখেন, অনুধাবক করেন ভৌগলিক অবস্থান, স্থানীয় অধিবাসীদের উপর আবহাওয়া ও ভৌগলিক প্রভাব ইত্যাদি। এমনকি যে সকল ক্ষেত্রে চিত্রের প্রয়োজন হয় তিনি মানচিত্র একে সে চিত্রগুলো পাঠকের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা চালান।

মওদূদী (রহঃ) জীবনের শুরুতেই ১৯২০ থেকে ২৮ সালের মধ্যে একটি আরবী, তিনটি ইংরেজী গ্রন্থের অনুবাদ করে তার লেখালেখিতে হাতেখড়ি দেন। তবে এ সময়ে তার সমচেয়ে মৌলিক কাজ হলো [email protected]!১ রচনা। গ্রন্থ রচনার ইতিহাসটি জানলে বুঝা যায় চবি্বশ বছরের টগবগে যুবক ইসলাম নিয়ে কতটা ভাবতেন, ইসলামের দুর্দিনের চিন্তায় কতটা কাতর ছিলেন।

ভারতীয় ইতিহাসে ১৯২৬ সাল মুসলমানদের জন্য এক দুযের্াগপূর্ণ সময়। এ বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুদ্ধি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী শ্রদ্ধানন্দ আততায়ীদের হাতে মারা যান। দুর্ভাগ্যজনকভাবে একজন মুসলিম এ কাজের জন্য অভিযুক্ত হয়ে গ্রেফতার হয়। চারিদিকে হা রে রে রে রবে ইসলাম বিদ্বেষীরা ইসলামের শ্রাদ্ধ করার জন্য উঠে পড়ে লাগে। ইসলাম একটি সন্ত্রাসী ধর্ম, কোরান সন্ত্রাসবাদের জন্মদাতা, যতদিন কোরআন থাকবে ততদিন বিশ্বে শান্তি আসতে পারে না ইত্যাদি ইত্যাদি অপবাদে ইসলামকে বিদ্ধ করা হলো। প্রচার করা হয় শ্রদ্ধানন্দকে ইসলামে শত্রু সাব্যস্ত করে বেহেস্তের আশায় মুসলমানরা এ হত্যাকান্ড চালিয়েছে। অর্থাৎ বিধর্মীদের হত্যা করে মুসলমানরা বেহেস্তে যাওয়ার জন্য সন্ত্রাসী কার্যক্রম শুরু করেছে বলে চারিদিকে হৈচৈ শুরু হয়।

অবস্থা এতটা নাজুক আকার ধারন করে যে, অহিংস রাজনীতির প্রবক্তা এবং হিন্দু ধর্মের সবচেয়ে পরিপক্ক বুদ্ধির অধিকারী হিসেবে তৎকালীন সমাজে পরিচিত গান্ধীজীও মন্তব্য করে বসেন, “ইসলাম এমন পরিবেশে জন্মলাভ করেছে যে, তার চুড়ান্ত শক্তির উৎস আগেও তরবারী ছিল, এখনও তরবারীই আছে”। মোট কথা ইসলাম ও সন্ত্রাসবাদকে একাকার করে ঘোলাপানিতে মাছ শিকারে নেমে পড়ে ইসলামবিরোধীরা।

এমন এক পরিবেশে ২৪ বছরের যুবক মওদূদী দিল্লী জামে মসজিদে জুমুয়ার নামাজে ইমাম সাহেবের আবেগময় খুৎবা শুনে অস্থির হয়ে পড়েন। ইমাম সাহেব বলেন, “হায় খোদা, ভারতবর্ষে আজ যদি এমন কোন আল্লাহর বান্দা ইসলামের জিহাদ নীতির উপর প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনা করতো, ইসলাম বিরোধী অপপ্রচারের দাতভাঙ্গা জবাব দিয়ে ইসলামের প্রকৃত রূপ সবার সামনে তুলে ধরতো তবে কতই না ভালো হতো।” যুবকটি নামাজ শেষে মনস্থির করে ফেললো, বুকভরে নির্মল বাতাস টেনে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো যে আল্লাহ এই নির্মল বাতাস দিয়ে আমার অন্তরকে ভরিয়ে দেন, আমি কেন তার মহিমা ঘোষণার জন্য তার পক্ষে কলম ধরবো না।

২৪ বছরের এ টগবগে যুবক লিখে ফেললেন “আল জিহাদ ফিল ইসলাম” নামের এক অসাধারন পুস্তক যা ইসলামে জিহাদের প্রকৃত পরিচয় অমুসলিমদের কাছে স্পষ্ট করে তোলে। বইটি এতোটা তথ্যপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে আল্লামা ইকবাল তার এ বইটি পাঠ করে অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে ভূয়সি প্রশংসা করেন, “জিহাদ, যুদ্ধ ও সন্ধি সম্পর্কে ইসলামী আইন-কানুন সম্বলিত এ গ্রন্থটি অসাধারণ ও চমৎকার। প্রত্যেক জ্ঞানী ও সুধীকে গ্রন্থটি পাঠ করার জন্য অনুরোধ করছি”।

যে সময়ে মুসলমানরা বিধর্মীদের অপপ্রচারে ছিল দিশেহারা, সেসময়ে ২৪ বছরের এ যুবক অসীম সাহসে এ গ্রন্থ রচনা করে ইসলামের পক্ষে যে ভূমিকা রেখেছিল তা আজো অবিস্মরণীয়।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“আলোকিত নেতা মওদূদী (রহ:) : লেখালেখিতে হাতেখড়ি” লেখাটিতে 3 টি মন্তব্য

  1. শাহাদাতুল্লাহ টুটুল বলেছেন:

    অনেক অনেক ধন্যবাদ।

    [উত্তর দিন]

  2. abul bashar বলেছেন:

    dannabad, arokam sondar sondar lekha asha kori

    [উত্তর দিন]

  3. Md. Shafiqul Isalm বলেছেন:

    আসসালামুআলাইকুম,
    “শহীদের রক্তের চেয়ে জ্ঞানীর কলমের কালি উত্তম”-হাদিসটি জাল।
    দয়াকরে হাদিস যাচাই করে সহিহ হাদিস লিখলে আমরা উপকারী হব। দ্বীন প্রচারে সহিহ হাদিসই যথেষ্ট ।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন