সাংস্কৃতিক বিনিময় নয়, আগ্রাসন চালাচ্ছে ভারত

বাংলাদেশে ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী আসিফ আকবর। গত ১০ ডিসেম্বর ২০১০, শুক্রবার দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় তার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয় যা হুবহু এখানে তুলে ধরলাম। এছাড়া এটিএন নিউজের টক শোতে একই দিন তিনি অংশগ্রহণ করে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের সমালোচনা করেন। আসুন উপভোগ করি টকশোর ভিডিও।

আমরা এখনও ঐক্যবদ্ধ হতে পারলাম না-আসিফ আকবর

প্রতিবাদী মানুষ হিসেবে আসিফের সুনাম দীর্ঘদিনের। প্লেব্যাক সিঙ্গারদের সম্মানীর সমন্বয়হীনতার অভিযোগ করে অনেক আগেই প্লেব্যাক ছেড়ে দেয়ার ঘোষণায় আলোচিত হন তারকা এই গায়ক। তার এই প্রতীকী প্রতিবাদের প্রশংসা সবাই করলেও আসিফ এখনও তার পথে কোনো সহযোদ্ধা পাননি। এরপর সঙ্গীত জগতের ঐক্যের অভাবের কথা উল্লেখ করে গান ছাড়ারও ঘোষণা দেন। তাতেও তিনি কাউকে পাশে পাননি। তবে তার এই প্রতিবাদ সাধারণের মনে দাগ কেটেছে। সম্প্রতি তিনি আবারও প্রতিবাদী হয়ে উঠেছেন ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি চিহ্নিত কিছু মানুষের অতি অনুরাগ আর দেশের সংস্কৃতিসেবীদের (?) শাহরুখপ্রীতি দেখে। আসিফ সরাসরি বলেছেন, দেশপ্রেমের যে বুলি আওড়ান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা তারা এখন চুপ কেন? সাম্প্রতিক এসব বিষয় নিয়েই আসিফের সঙ্গে কথা বলেছেন নবীন হোসেন

শাহরুখ খানের অনুষ্ঠানে শাকিব খান ও কুমার বিশ্বজিেক অংশ না নেয়ার অনুরোধ করেছেন আপনি। কোনো সাড়া পেয়েছেন?
আমি একা না। দুটি সংগঠন এই অনুরোধ করেছে। এর মধ্যে তরুণ সঙ্গীত শিল্পীদের একটি সংগঠনের উপদেষ্টা আমি। সংগঠন দুটি মানববন্ধনও করেছে। আমি সেই মানববন্ধন থেকে এই দুই তারকাকে অনুরোধ করেছি যাতে তারা এই অনুষ্ঠানে অংশ না নেন। শুনেছি শাকিব খান অংশ নেবেন না। এজন্য তাকে ধন্যবাদ। তবে কুমার বিশ্বজিতের কোনো মন্তব্য পাইনি।
কেন এমন অনুরোধ করলেন?
ভারতীয় সংস্কৃতি আমাদের রন্দ্রে রন্দ্রে ঢুকে যাচ্ছে। আজ সঙ্গীতের যে বেহাল অবস্থা তাতে ভারতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন সবচেয়ে বড় কারণ। হিন্দি গানের অডিও সিডি এখনও দেদারছে বিক্রি হচ্ছে, কিন্তু বাংলা গান গত কয়েক বছরে হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া হিট হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের দেশে অনেক বরেণ্য শিল্পী অর্থের অভাবে বিনা চিকিত্সায় ধুঁকছেন। তাদের চিকিত্সার খোঁজখবরও আমরা নিতে পারছি না। অথচ বিদেশি শিল্পীদের বেলায় কোটি কোটি টাকা লগ্নি করা হচ্ছে। এর কোনো প্রতিবাদ নেই। কারণ, আজও আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারিনি। মুখে সবাই দেশপ্রেমের কথা বলছি আর দেশীয় সংস্কৃতি রক্ষার জন্য নিজেকে উজাড় করে দেয়ার ঘোষণা দিচ্ছি। অথচ বিদেশি শিল্পী এলে তাদের জন্য নিজেদের বিকিয়ে দিয়ে এ দেশের পাশাপাশি সংস্কৃতি আর সভ্যতাকে অপমান করছি।
আপনার অবস্থান সম্পর্কে আরেকটু স্পষ্ট ধারণা দিন?
আসলে আমার অবস্থান ভারত বা শাহরুখ খানের বিরুদ্ধে নয়। শাহরুখ যোগ্যতম মানুষ হিসেবেই আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছেন। সুতরাং তার বিরুদ্ধে আমি কিছু বলব না। যারা শাহরুখের অনুষ্ঠান আয়োজন করছেন কোটি টাকা খরচ করে, আর দেশের যারা এই অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন তাদের দেশপ্রেম নিয়ে আমার প্রশ্ন রয়েছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনেক শিল্পী এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন, চিকিত্সা করাতে পারছেন না। তাদের জন্য কেউ কি কিছু করছেন? কেন আজম খানের মতো শিল্পীর চিকিত্সার জন্য অর্ধ কোটি টাকা জোগাড় করতে আমাদের এত কষ্ট হলো। কই, শাহরুখ খানের অনুষ্ঠানের জন্য কোটি কোটি টাকা জোগাড় করতে তো কারও বেগ পেতে হয়নি?
দুই দেশের সাংস্কৃতিক চুক্তি অনুযায়ী এমন অনুষ্ঠান হতেই পারে—
সাংস্কৃতিক চুক্তিতে আদান-প্রদানের বিষয়টি রয়েছে। অর্থাত্ এদেশে যেমন ভারতীয় শিল্পী, ছবি, গান আসবে তেমনি ভারতেও আমাদের ছবি, গান, শিল্পীরা যাবেন। যারা শাহরুখ খানকে এ দেশে এনেছেন তাদের বলুন ভারতে আমাদের দেশের শিল্পীদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠান করতে। তারা এই আয়োজন করতে পারবেন না। কারণ, ওই দেশে আমাদের নিয়ে অনুষ্ঠান করার অনুমতিই সে দেশের সরকার দেবে না। তারপর আসবে লাভ-লোকসানের হিসাব। একটু খেয়াল করে দেখুন ভারতে এ দেশের কোনো চ্যানেলই চলতে দেয়া হচ্ছে না। অথচ আমাদের দেশে ভারতীয় চ্যানেলে ভর্তি। এই আমাদের দেশপ্রেম?
একজন শাকিব খান বা একজন কুমার বিশ্বজিত্ না গেলে কী এ অনুষ্ঠান থেমে থাকবে?
কখনোই না। অনুষ্ঠান বন্ধ করার জন্য আমরা এই দু’জনকে যোগ না দেয়ার অনুরোধ করিনি। আসলে এটা একটি প্রতীকী প্রতিবাদ। আমরা মিডিয়ার মানুষই যখন এক হতে পারছি না তখন গোটা জাতিকে কীভাবে এক করব?
ঐক্যের এই অভাব কেন?
ব্যক্তিস্বার্থ। আর কিছুই না। আমাদের দেশে এখন ব্যক্তিস্বার্থই বড় হয়ে গেছে। দেশ আর জাতির কথা কেউ ভাবছে না।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন