সাংস্কৃতিক আগ্রাসন

মহাগৌরবে শাহরুখ খানের ঢাকা অভিযান সম্পন্ন হলো। ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী যেমন দ্রুত ধাবমান ১৭ ঘোড়সওয়ার নিয়ে বাংলা জয় করেছিলেন, শাহরুখ খান ততধিক দ্রুততার সাথে বাংলার সাংস্কৃতিক দর্প চূর্ণ করে ৮ম ধর্ম শাহরুখইজম প্রচার করে গেলেন। শিখিয়ে গেলেন ইভটিজিং-এর নানাবিধ ফর্মূলা, নারীর পায়ে সেজদায় লুটিয়ে প্রেম ভিক্ষার তরিকা। আর এ কাজে সরাসরি অংশ নিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাতনী। শাহরুখ খানের পারফর্মেন্সে পুরো দেশ এতটাই উজ্জীবিত যে ইভটিজিং এর পরিবর্তে অবেশেষে এডাম টিজিং এর শিকার হলেন শাহরুখ খান

চলতি বছরের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরের সময় দুই দেশের মাঝে সাংস্কৃতিক বিনিময় সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ উপলক্ষে ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য, “বাংলাদেশের মতো একটি দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে সাংস্কুতিক দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণও বটে। বাংলাদেশের সত্তায় একটি মেরুবিভাজন রয়েছে বরাবরই। তার এক দিকে যেমন রয়েছে ইসলামি সংস্কৃতি, অন্য দিকে বাঙালিয়ানা। শেখ মুজিবর রহমান ১৯৭১-এ যে বাংলাদেশ তৈরি করেছিলেন, সে’টি ছিল সাংবিধানিক ভাবেই ধর্মনিরপেক্ষ এক রাষ্ট্র। পরে তাঁর হত্যাকাণ্ডের পর সংবিধানের রূপরেখা বদলে ধর্মীয় কট্টরবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে বাংলাদেশ। স্বাভাবিক ভাবে ক্রমশ তারা হয়ে ওঠে পাকিস্তানের ইসলামিক কট্টরবাদী দর্শনের ঘনিষ্ঠ। প্রধানমন্ত্রী চাইছেন সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশের এই দ্বৈত সত্তার কাছে পৌঁছতে“। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সংস্কৃতিসচিব জহর সরকার চুক্তির একটি খসড়া তৈরি করেন। এই খসড়ার মূল দর্শনটিই হল “বাংলাদেশের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চিরাচরিত ধ্যান ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা। অর্থাৎ, শুধু পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি নয়, বাংলাদেশের মানুষের কাছে তুলে ধরা হবে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের সাংস্কৃতিক সম্পদকেও। নিশ্চিত ভাবেই তা জনপ্রিয় হবে। এর কিছুদিন পর ২৩ আগস্ট ২০১০, সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সাইকেল র‌্যালির সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিপু মনি বলেছিলেন, “বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও আমাদের এবং ভারতের সংস্কৃতি এক ও অভিন্ন। আমরা একই সংস্কৃতিতে আবদ্ধ আছি। আমাদের বিভাজনের কোনো লক্ষণ নেই।” পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ বক্তব্যে পুরো বাংলাদেশ হতভম্ব।

ভারতের সাথে বাংলাদেশের এই যে সাংস্কৃতিক বিনিময় চুক্তি এতে বাংলাদেশ আদৌ লাভবান না হলেও ভারত আধিপত্য বিস্তারে বড় ধরণের অগ্রগতি অর্জন করল। কে না জানে আজ আর কোন দেশ অন্য কোন দেশের উপর সামরিক আগ্রাসন চালাতে সাহসী হয় না, তাতে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, বরং অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে দেশকে পরাধীনতার শৃংখলে আবদ্ধ করার প্রচেষ্টা চলে। আর তারই অংশ হিসেবে শেখ হাসিনার নতজানু সরকার সাংস্কৃতিক দিক থেকে ভারতের কাছে আত্মসমর্পন করে। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর ছিল ভারতের কাছে সাংস্কৃতিক পরাজয়ে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা। হ্যা, যদি এ সাংস্কৃতিক বিনিময় চুক্তিতে বাংলাদেশের কোন অংশ থাকতো তাহলে কিছুটা হলেও মুখ বুজে থাকা যেত, কিন্তু চুক্তিটিতে স্পষ্টতই ভারতের সামগ্রিক সংস্কৃতি আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছে।

ঐতিহাসিক ভাবেই এ কথা সত্য যে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সংস্কৃতির নূণ্যতম মিল নেই, মিল যে টুকু পাওয়া যায় তা পশ্চিমবঙ্গের ভাষার সাথে। শুধু ভাষাভিত্তিক সংস্কৃতি বিনিময় হলেও বাংলাদেশের কিছু অর্জনের সুযোগ ছিল। কিন্তু পুরো ভারতের সংস্কৃতির আগ্রাসনের ফলে শত কোটি জনসংখ্যার দেশ অর্থনৈতিক পরাশক্তি ভারতের কাছে বাংলাদেশের আবহমান কাল ধরে টিকে থাকা সংস্কৃতির  দেউলিয়া হওয়া ছাড়া কোন পথ থাকবে কি? অবাধ তথ্য প্রবাহের এ যুগে ভারতীয় অর্ধশতাধিক টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই স্লো পয়জনিংয়ের মতো সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চলছে, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কিছু চ্যানেল, তথা ন্যাশনাল জিওগ্রাফী, কার্টুন নেটওয়ার্কসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু চ্যানেল হিন্দী ও তামিল ভাষায় বাংলাদেশে সম্প্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশী সংস্কৃতির করব রচনা করে চলেছে, যা ইতোমধ্যে দেশীয় সংস্কৃতিকর্মীদের ক্ষুদ্র করে তুলেছে । অথচ সাংস্কৃতিক বিনিময় শব্দের দাবী এই যে, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রদর্শণী ভারতের বুকেও করার সুযোগ থাকবে।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি নব্বইভাগ জনগোষ্ঠী তথা মুসলমান জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি। এখনো ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্ষ পরিবেশকে পাশ কাটিয়ে যেসকল অনুষ্ঠানাদি বাংলাদেশের চ্যানেল গুলোতে অনুষ্ঠিত হয় তা এতটা কলুষিত নয় যে পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেখা যায় না, যদিও ভারতীয় চ্যানেলের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীয় অবতীর্ণ এসকল চ্যানেল আগের চেয়ে অনেক খোলামেলা অনুষ্ঠান করছে। কিন্তু ভারতীয় বাংলা চ্যানেলগুলো পারিবারিক কলহ ও ঘরভাঙ্গার প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রকাশ্যে যৌনাচারের ভিডিও দেখাতেও কুন্ঠিত হচ্ছে না। ভারতীয় বাংলা চ্যানেলগুলোএমন পরকীয়ার খোলামেলা দৃশ্য বাংলাদেশের যুব সমাজকে শুধু ধ্বংশের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে না বরং বাংলাদেশকেই ভয়ংকর ঝুকির মাঝে ঠেলে দিচ্ছে। ভারতীয় চ্যানেলগুলো এখন আর কোন বাছবিচারের ধার ধারে না এমনকি সমকামিতাকে উপজিব্য করে পেপসির মতো কোমল পানীয়ের বিজ্ঞাপন করতেও লজ্জা বোধ করে না। আর এর দেখাদেখি আওয়ামী লীগের এমপি আসাদুজ্জামান নূরের টিভি চ্যানেল দেশ টিভি সমকামীদের প্রতি মানবিক আচরের আহ্বান জানিয়ে অনুষ্ঠান প্রচারেও কুন্ঠিত হচ্ছে না।

বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে হবে। ভারতীয় আগ্রাসন থেকে বাংলাদেশের প্রতিটি ইঞ্চি জমির মতো সংস্কৃতিকেও সমানগুরুত্বের সাথে রক্ষা করতে প্রয়োজনে সকল বাধা উপড়ে ফেলতে হবে, বিজাতীয় সংস্কৃতির সাথে সাথে সকল দালালদেরও পুশব্যাক করে ভারতে পাঠাতে হবে। মহান বিজয় দিবসকে সামনে রেখে তরুন প্রজন্মের এ হোক দৃপ্ত অঙ্গীকার।

Be Sociable, Share!

3 Replies to “সাংস্কৃতিক আগ্রাসন”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।