তেলের তেলেসমাতি

আজ খুচরাবাজারে ভোজ্য খোলা তেলের সর্বোচ্চ দাম বেঁধে দেয়া হল ৮৬ টাকায়, বোতলজাত তেলের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ অতিরিক্ত  মূল্য যোগ হবে, যা কার্যকর হচ্ছে ৭ ডিসেম্বর থেকে (ভবিষ্যতের কথা ভবিষ্যতই ভালো জানে)। আজ রোববার সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মূল্য নির্ধারণ বিষয়ক এক দীর্ঘ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান। বাণিজ্যমন্ত্রীর এমন সাফল্যে সরকার গর্ব করতেই পারে। তবে সমস্যা অন্য খানে, তেলের ক্ষেত্রে হয় যা আর কি, সব কিছুই পিছলে যায়। তেল নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর সাফল্যও ফুটো তেলের ড্রামের মতো চুইয়ে চুইয়ে ঝড়ে যায়, নিখুঁত অভিনয়ও ফাঁস হয়ে যায়। রঙ্গমঞ্চের লিকসে উঁকি দিলেই উইকিলিকসের মতো বেড়িয়ে পড়ে বিবেক নামের চরিত্রটি, যে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে বাণিজ্যমন্ত্রীকে, ‘আজ তুমি খোলা তেলের দাম ৮৬ টাকায় নির্ধারণ করলে, এক সপ্তাহ আগে ৯১ করেছিলে তবে কোন যুক্তিতে?”

কয়েকদিন ধরে ভোজ্য তেলের তেলেসমাতি দেখলাম। তবে তেলের তেলেসমাতি না বলে বরং বাণিজ্যমন্ত্রীর ভেল্কিবাজি বলাই ভালো। যখন সয়াবিন তেলের মূল্য বৃদ্ধি রোধে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করে, তখন আদালত ও দেশবাসীকে বোকা বানানোর জন্য লিটারপ্রতি ৯১ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। অথচ খোলাবাজারে তখনও খোলা তেলের দাম ৯০ টাকার নীচে ছিল বলে পত্রিকার রিপোর্টে জানা যায়। ৯১ টাকা লিটারপ্রতি দাম বেধে দেয়ার সাথে সাথেই পাইকারী বাজারে খোলা তেলের দাম ৯০ টাকা ছাড়িয়ে যায়, খুচরা বাজার চলে যায় নাগালের একেবারেই বাইরে। বাণিজ্যমন্ত্রীর সেদিনের হুমকি ধমকি যারাই দেখেছেন তারাই চমৎকৃত হয়েছেন, মনে হয়েছিল এবার বুঝি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের রক্ষে নেই। তবে সবকিছুই যে সিন্ডিকেট স্বার্থরক্ষায় মঞ্চায়িত হয়েছিল তা এ কদিনে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে সাধারণ জনগণ। যে সয়াবিনের দাম আজ ৮৬ টাকায় বেধে দেয়া হল, সেদিনের হুমকি ধামকির পরে স্বাভাবিকভাবেই এ দামেরও কম দাম নির্ধারণের সুযোগ ছিল, কিন্তু তিনি তা করেন নি। মূলত তিনি আদালতের রুলকে বিভ্রান্ত করার জন্য ব্যবসায়ী সিন্ডিকের সাথে জোগসাজশ করে মিডিয়ার সামনে সফল নাটক মঞ্চায়ন করেন, ভোজ্যতেলের দাম ঘোষণা দিয়ে আরো বাড়িয়ে দেন এবং প্যাকেটজাত ভোজ্যতেলের বাড়াবাড়ি দাম হাকিয়ে নেয়ার জন্য আজ বরিবার পর্যন্ত সময় বেধে দিয়েছিলেন। একদিনে ১৩ টাকা দাম বাড়ানোর জন্য ব্যবসায়ীদের মুনাফাখোড় বলে গালি দিলেও পিইটি বোতলের সেই দাম তিনি কমান নি এক পয়সাও বরং পিইটি বোতলের দাম বাড়ানোর জন্য গালমন্দ করে খোলাতেলের দাম বাড়িয়ে নির্ধারণ করেছিলেন ৯১ টাকায়।

সবকিছু দেখে মনে প্রশ্ন জাগে, সাধারণ ভোক্তাসাধারণের স্বার্থ দেখার জন্য কি আদৌ কেউ নেই? তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে আদালতের আশ্রয় নিয়ে হীতে বিপরীত হল, তেলের বাড়তি মূল্য গুণতে হল, তবে নাটক দেখা গেল একদম ফ্রি! দর্শকশ্রোতার বুঝতে অসুবিধা হয় না যে মিডিয়ার সামনে হুমকি ধামকি, গালাগালি সবকিছুই সাধারণ মানুষকে বোকা বানানোর জন্য, বিজ্ঞ আদালতকে বিভ্রান্ত করার জন্য এবং স্বাস্থ্যকর প্রতিটি ফোঁটায় মন্ত্রীর পকেট ভারী করার জন্য। মূলত দেশ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের দখলে, বাণিজ্যমন্ত্রী সিন্ডিকেটের পোষ্যমাত্র।

যে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, একই সুরে সুর মিলিয়েছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তবু কাজের কাজ কিছুই হয়নি বরং বলা যায় সিন্ডিকেট ভাঙ্গার চেষ্টাও হয়নি, হুমকি ধামকি দিয়ে কিছু কামিয়ে নেয়ার ধান্দা ছিল বলে অনেকেই মনে করেন। তাইতো দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রোধে অসাধু ব্যবসায়ীদের ‘সিন্ডিকেট’ ভাঙতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে অকপটে হতাশা ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। অথচ দেশে সিন্ডিকেটের কোন অস্তিত্ব নেই বলে বাণিজ্যমন্ত্রী আজ আবার উল্টো ডিগবাজী খেলেন। দেখেশুনে মনে হয় বাণিজ্যমন্ত্রীর মতো বেয়াড়া ঘোড়াকেও ঘোল খাইয়ে বশে নিয়েছে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট।

বাতাসের সমুদ্রে সাঁতরে চলেছি আমরা সবাই, তবু বাতাসের দেখা মেলে না; ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের পকেটে সুখস্বপ্নে মন্ত্রী বিভোর, সিন্ডিকেটের নাগাল তাই বুঝি মেলে না।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“তেলের তেলেসমাতি” লেখাটিতে 2 টি মন্তব্য

  1. আরাফাত রহমান বলেছেন:

    ওস্তাদ, সেরকম একটা লেখা।

    আদালতের আশ্রয় নিয়ে হীতে বিপরীত হল কেন? এখনো কোন রায় পাওয়া যায় নি। সরকারকে কারণ দর্শাতে বলেছে। এবং বিগত দিনে তেল কী রকম দামে আমাদানী করা হয়েছিল সে সম্পর্কেও জানতে চেয়েছে আদালত। নাটক মনে হয় আরো দেখতে পাব।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    হ্যা,তাইতো মনে হচ্ছে। ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট দাম বাড়াবে আর মন্ত্রী মিডিয়ার সামনে গালাগালি শেষে উচ্চমূল্য বেঁধে দিয়ে আইনগত বৈধতা দেবেন। এ নাটকের বুঝি শেষ নেই…

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন