পতনের ধ্বনি শুনতে কি পাও?

হঠাৎ করেই বাসা থেকে ফোন আসে। বউয়ের ফোন। মারাত্মক কোন সংবাদ না থাকলে আমাকে অফিসে ফোন করা নিষেধ, জানা আছে ওর। তারপরও ফোন! অজানা আশংকায় বুকটা দুরু দুরু করে ওঠে, কারো কোন বিপদ হয় নি তো? বাবুটা সুস্থ্য আছে তো,  মা-বাবা?
: আসসালামু আলাইকুম, কি খবর?
: ওয়ালাইকুম আসসালাম। একটা কথা জিজ্ঞেস করবো, রাগ করবে না তো?
ওপারে বউয়ের কথা শুনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। না, কোন বিপদ নয়, প্রশ্নের জবাব দিতে হবে মাত্র। কিন্তু কি প্রশ্ন?
: এমন প্রশ্ন কেন করবে, যা শুনে রেগে যেতে হবে?
অফিস আওয়ারে অপ্রয়োজনীয় ফোন আমাকে প্রচন্ড বিরক্ত করে। কাজের মাঝে বিচিত্র সব রিং টোন মেজাজটাই বিগড়ে দেয়। কিছু কিছু ক্লায়েন্ট আসেন যাদের রিংটোন শুনে মরে যেতে ইচ্ছে করে। কারো মোবাইল থেকে কুকুরের ডাক, কারো থেকে কুক্কুরুকুউ, কারো থেকে হিন্দী বাজারী গান, কারোটা থেকে আবার শিশুদের কান্নার শব্দ। মানুষের রুঁচিবোধের প্রশংসা না করে পারা যায় না। আর নামাজের মাঝে রিংটোন বেজে ওঠা তো অতি সাধারণ ব্যাপার, আলেম ওলামাদের মোবাইলও বাদ যায় না এ প্রতিযোগিতায় । এমন বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে চব্বিশ ঘন্টাই আমার মোবাইলের সাউন্ড অফ করা থাকে। অবশ্য দু’য়েকটা কল মাঝে মাঝে মিসড্ হয়ে যায়, তবু অন্যদের বিরক্তির কারণ যে হতে হয় না তাতেই আমি আনন্দিত।
: না, তেমন কিছু না। আচ্ছা তাহলে পরে বললো।
: এবার মেজাজটা আরও খারাপ হয়ে যায়। পরে কেন, এখনই বল।
: আচ্ছা, এক টাকার লাল কয়েনের সম্পর্কে কিছু জান?
: কেন, কি হয়েছে?
: উপরের ফ্লাটের ভাবী এসেছিল। বললেন, এক টাকার লাল কয়েন নাকি একশ’ টাকায় বিক্রি করা যায়। আমার কাছে অনেকগুলো জমা আছে, বিক্রি করে দেব?
এবার আমার মেজাজটা পুরোপুরি বিগড়ে যায়। তারপরও মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে, অফিস বলে কথা।
: খবরদার, একটা পয়সাও বিক্রি করবে না। মাস্টার্স পাশ করেও তোমার মাথায় এ বুদ্ধিটা কেন আসে না যে এক টাকার মূল্যমানের পয়সা একশ টাকায় বিক্রি করা যায় না। আর কেউ কিনতে চাইলেই তুমি বিক্রি করবে কেন? এতো স্রেফ প্রতারণা।

বিদ্যুৎগতিতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে।  বিভিন্ন স্থানে এক টাকার সোনালি কয়েন বেচাকেনার হিড়িক পড়ে যায়। পত্রিকার পাতায় স্থান করে নেয় প্রতারণার এ চমকপ্রদ খবরটি। আর গুজবপ্রিয় বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এতটাই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে যে টেলিফোনে লাল কয়েনকে ‘কয়েল’ শুনে বিভিন্ন কোম্পানীর লাল কয়েলের স্টক গড়ে তুলে  বিপাকে পড়ে যায় মাগুরার ছয়চার গ্রামের হাশেম। লোভ মানুষকে যে কতটা অন্ধ করে দেয় তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল লাল কয়েন। নিশ্চয় কোন একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র গুজব রটিয়ে লাল কয়েনের দাম বাড়াচ্ছে এমনকি কোথাও কোথাও ৫০০ টাকা পর্যন্ত দাম উঠেছে। আর এভাবে প্রতারকচক্র প্রথমে বাড়তি দামে কয়েন কিনছে, পরে তারাই আবার উচ্চমূল্যে বিভ্রান্ত সাধারণ মানুষের হাতে ছড়িয়ে উচ্চমূল্যে দিচ্ছে। সাধারণ মানুষ কিনছে আরো বেশি মূল্যে বেচার আশায়। কিন্তু তারা কোথায় বেচবে? কার কাছে বেঁচবে? এক টাকার কয়েন ৫০০টাকা দাম হওয়া যুক্তি কোথায়, কোন প্রশ্নই তাদের মনে স্থান পাচ্ছে না। তাদের মাথায় শুধুই টাকার নেশা। লাল কয়েনের এই দৌরাত্ম আমাকে বিচলিত করে। পুঁজিবাজার নিয়ে আমার পুরনো একটা ভয়ংকর ধারণাই নাড়া দিয়ে যায় সোনালী কয়েন।

********

বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহামন্দা বিশ্ব অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে গেল। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দূর্দমনীয় শক্তিশালী অর্থব্যবস্থা টলে গেল বেপরোয়া ব্যাংকিং ব্যবসার কারণে। অথচ আশার কথা হলো বিশ্বমন্দায় বিশ্ব থমকে গেলেও বাংলাদেশ এর প্রভাব থেকে অনেকটাই মুক্ত ছিল। কিন্তু “সার্ভাবাল অব দ্য ফিটেস্ট” এর বিশ্বে শক্তিমানদেরই টিকে থাকার কথা। যে কোন বিপর্যয়ের স্রোতকে দূর্বলদের দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বেঁচে থাকার আদিম চেষ্টা চালানোরই তো কথা আমেরিকা-ব্রিটেনের মতো মহাপরাক্রমশালীদের। তাই আশংকা হয়, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মহামন্দার ঢেউ কখন যেন বাংলাদেশকেও ছুঁয়ে যায়।

যদি মহামন্দার ঢেউ আসে, তবে কোন পথে? আমেরিকায় ধ্বস নেমেছে ব্যাংকিং সেক্টরে। তবে বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টর নিয়ে অতটা দূশ্চিন্তা করতে পারছি না। বিশেষ করে বাংলাদেশে ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে এখনো যথেষ্ট ডকুমেন্টেশন রক্ষাকরা হয়। আর সবচেয়ে বড় কথা বাংলাদেশে এখন ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থাই ব্যাংকিং সেক্টরকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। আর ইসলামী ব্যাংকিং এবং প্রচলিত ব্যাংকিংয়ে ঋণ বিতরণে বিস্তর পার্থক্য থাকায় হঠাৎ করে পাশ্চাত্যের ব্যাংকগুলোর মতো দুর্যোগে পড়ার সম্ভাবনা দেখতে পাই না।

তবে ইতিহাস বলে, অর্থনৈতিক মহামন্দা থেকে বাংলাদেশের নিস্তার নেই। মহাপরাক্রমশালী পাশ্চাত্যগোষ্ঠী ডুবতে বসা তরীকে সাফল্যের বন্দরে নিতে অপেক্ষাকৃত দূর্বল যাত্রীদের সমুদ্রে ছুড়ে ফেলতে যে দ্বিধা করবে না তা স্পষ্ট। তবে বাংলাদেশে সে বিপর্যয় কোন পথে আঘাত হানবে তা আসলেই চিন্তার বিষয়। এ মুহুর্তে সবচেয়ে যে দূর্বল প্রাচীরটি আমার চোখে পড়ছে তা হলো পুঁজিবাজার। আর এ দেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে দূর্বল দিকটিই হলো এখানে অধিকাংশ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ব্যবসায়ের কোন প্রকার নিয়মনীতি না জেনে এবং না মেনেই ব্যবসায় নেমে পড়েছে। এক টাকার শেয়ার পাঁচশো টাকায় কেন কিনছি এ প্রশ্নটি একবারও বিনিয়োকারীদের মাথায় আসছে না। আর মজার ব্যাপার হলো এক্ষেত্রে কেউ হালাল হারামেরও ধার ধারছে না, এমনকি ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীরাও নয়। তাদের কথা, শেয়ারবাজার হালাল। আরে ভাই, ব্যবসা হালাল হলেই কি শুকরের ব্যবসাও হালাল হয়ে যাবে, মদের ব্যবসা হালাল হয়ে যাবে? আমি ইসলামী আন্দোলনের মধ্যম সারির নেতাদেরকেও বলতে শুনেছি, নেতৃবৃন্দতো নিষেধ করছে না, তাহলে থামবো কেন? তারা বুঝতে চান না, হালাল হারাম নেতৃবৃন্দের অনুমোদনের বিষয় নয়, এটি সম্পূর্ণ শরীয়তের বিষয়। সে যাই হোক, এদের সংখ্যা খুব বেশী নয়, আর এদের বিনিয়োগের পরিমানও ধর্তব্য নয়। ৩০ লাখ বিনিয়োগকারীদের নিয়েই যত মাথাব্যথা, যাদের অধিকাংশই চিলের পিছে ছুটতে অভ্যস্ত। আর কে না জানে, বাংলাদেশ গুজবের দেশ। পুঁজিবাজার নিয়ে যে কোন ধরণের একটা গুজব ছড়িয় পড়লে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

রাশেদ ভাই (ছদ্মনাম)। মাত্র বছর দু’ আগেও বেকার হয়ে বিধ্বস্ত বদনে ঘুরে বেড়াতেন। অথচ পুঁজিবাজারে অর্থলগ্নি করে রাতারাতি তিনি অর্থের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। যথেষ্ট বিচক্ষণ বিনিয়োগকারী তিনি। আর সবচেয়ে বড় কথা, জ্যোতিষিদের মতো সবকিছুই আগেভাগে টের পেয়ে যান। হ্যা, তার একটা ছোট গ্রুপ আছে, কি করে যেন তারা খবর পেয়ে যান, আসছে সপ্তাহে অমুক শেয়ারের দাম বাড়ছে, অমুক শেয়ারেরটা কমছে। আর সে মতেই তারা বিনিয়োগ করছে। শুধু কি তাই, কখনো কখনো মাস খানেক আগেও তারা খবর পেয়ে যান। আসলে শেয়ার বাজার যে পরিকল্পিতভাবে বিশেষ একটা গোষ্ঠী উত্থান পতন ঘটায়, তা একটু বুদ্ধি খাটালেই বোঝা যায়। রাসেদ ভাই হয়তো তাদেরই কোন এক জনের কাছ থেকে খবরাখবর পান। তাই রাশেদ ভাইয়ের বন্ধুরা তার কথায় আস্থা রাখে, বিনিয়োগ করে।

ইদানিং তাকে খুব ব্যস্ত দেখি। আমার অফিসে হঠাৎ করেই তার দেখা। কথা প্রসঙ্গে বললাম, রাশেদ ভাই, এবার একটু স্থির হন। বাংলাদেশের বিপর্যয় কিন্তু শেয়ারবাজার দিয়েই হয়ে যাবে। সময়ও মনে হয় একদম ঘনিয়ে এসেছে। পুঁজিবাজার বুনো ষাড়ের মতো যেভাবে ছুটছে তাতে খাদের কিনারে পৌঁছে নিয়ন্ত্রণ হারালে অবাক হওয়ার থাকবে না। শেষ সময় রাশ টানতে না পারলে শেয়ারবাজার হুমড়ি খেয়ে পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। রাশেদ ভাইও সায় দিলেন। হ্যা, আপনি ঠিকই বলেছেন। আমিও এবার মার্কেট থেকে বের হয়ে আসছি।

রাশেদ ভাইয়ের জবাবে আমি বিস্মিত হয়ে যাই। শেয়ারবাজারের ভবিষ্যত জানেন তিনি, শেয়ারবাজারের ভবিষ্যত গড়ার কারিগরদের সাথেই তার সখ্য । তাহলে কি সামনেই সেই দুঃসময়?

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“পতনের ধ্বনি শুনতে কি পাও?” লেখাটিতে 2 টি মন্তব্য

  1. শামসুদ্দীন বলেছেন:

    সহমত। তবে স্পর্শকাতর এ ইস্যুটি নিয়ে কম লেখাই ভালো। শেয়ার বাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মাঝে ভুল মেসেজ যেতে পারে।

    [উত্তর দিন]

    শাহরিয়ার উত্তর দিয়েছেন:

    পরামর্শের জন্য ধন্যবাদ। লেখাটি কোথাও শেয়ার করছি না, স্রেফ ডায়েরী হিসেবেই রেখে দিলাম। আশাকরি পুঁজিবাজারে এর কোন প্রভাব পড়বে না।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন