এতো কেন কাঁদাও মেয়ে ???

মানবতা মানবতা বলে গলা ফাটালে মানবতার কোন ক্ষতি-বৃদ্ধি হয় না। মানবতার জন্য চাই সুনীল সমুদ্রসম ভালোবাসা, আর এ ভালোবাসা বুকে ধারন করে যে চীরসবুজ বিশ্বপ্রেমিক, সেইতো প্রকৃত মানবতাবাদী। মানবতাবাদীর ভালোবাসায় থাকবে প্রজাপতির মতো নানারঙের ঝলকানি যা সৃষ্টির অন্তরকে করে প্রশান্ত। ভালোবাসা হবে ঘাসফড়িংয়ের মতো স্বাধীনচেতা, ঘাস ফড়িং যেমন স্বাধীনতার উন্মাদনায় অঙ্গ হারালেও হার মানে না, প্রেমিকের ভালোবাসা তেমনি স্বাধীনতার জন্য, স্বাধীনতার সুবাতাস বইয়ে দিতে নিজের প্রাণবিসর্জন দিতেও কুন্ঠিত হয় না। ভালোবাসায় থাকবে চিতার মতো ক্ষিপ্রতা যা দেয় নির্ভরতা আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, তেমনি থাকবে পায়রার পালকের মতো কোমলতা। মানবতাবাদী প্রেমিকের বুক হবে আর্তপীড়িত সকল মানুষের তীর্থস্থান, যেখানে দুঃখ কষ্ট জ্বালা যন্ত্রণা জলাঞ্জলি দিয়ে ভোরের শুদ্ধ প্রকৃতির মতো হবে শান্ত । প্রেমিকের অন্তর থেকে যে ভালোবাসার ঢল নামে তার শীতল স্রোতে অবগাহন করে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে হৃদয়ের গহীনে দাউ দাউ করে জ্বলা চীতার আগুন।

এমনই এক প্রেমিকের সাথে দেখা হয়ে গেল প্রেমময় মধু সন্ধ্যায়। প্রেমিকের ঘরে থরে থরে সাজানো অফুরন্ত ভালোবাসা, প্রতিটি আসবাবপত্র, শোকেস, দেয়ালে টাঙানো আলোকচিত্র সবখানেই ভালোবাসার ছাপ, যত্নের ছাপ, সুরুচির চিহ্ন। প্রেমিক যখন নজরুলের কবিতা আবৃত্ত করেন মনে হয় মানবতার বন্ধু কাজী নজরুল ইসলাম যেন গাইছেন সাম্যের গান। আমি মুগ্ধ, আমার হৃদয় তন্ত্রির প্রতি কোনে কোনে, ক্ষণে ক্ষণে জাগে অপার্থিব শিহরণ।

প্রেমিকের বাসায় সেদিন নেমন্তন্ন ছিল আমার। সন্ধ্যে ৬টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম ষষ্ঠ আসমানে। সাদরে টেনে নিলেন আত্মার ভেতরে, মনে হলো একমাত্র আমার জন্যই তিনি অপেক্ষা করে ছিলেন, একমাত্র আমিই তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। পরে অবশ্য অন্য প্রেমিকদের আগমনে বুঝতে পারি তিনি আসলে সবাইকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন, সবার জন্যই বরাদ্ধ রয়েছে এক একটা আস্ত অমরাবতী।

ঘরের সোফা দখল করে আছে ক্ষুদ প্রেমিক প্রাপ্তি, ওর মা আর ব্লগারবন্ধু সারিয়া। ওদিকে মায়াজালে কান পেতে আছে গোপাল ভার, গোপালের বউ, সাদিকসহ প্রবাসী ব্লগাররা। মুঠোফোনে ঝড়ে পড়ে হাসানের আনন্দ উচ্ছাস আর ভালোবাসা। ওদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সাত আসমানের সিড়ি বেয়ে উঠে পড়লাম কালপুরুষের ছাদে, আকাশের কাছাকাছি। মন ভালো করা ছাদ, ছাদের উপরে নীল আকাশ, আর আছে মেঘের ভেলা। পশ্চিমে মেঘের আড়ালে সূর্যের লুকোচুরি, আর দুষ্টুছেলের মতো দিগন্তের হারানোর খেয়াল। আমরাও লুকোচুরিতে মেতে উঠি, আমি, সারিয়া, প্রাপ্তি, কালপুরুষ। কিছুক্ষণের মাঝে যোগ দেন সুনীল সমুদ্র। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি সুনীল সমুদ্রের ঢেউগুলো কলকল রবে প্রাপ্তির কাছে এসে আছড়ে পড়ে, প্রাপ্তিসোনা প্রজাপতির মতো উড়ে উড়ে বেড়ায়, সাগরের সৈকতে ঝিনুক কুড়ায়। একে একে সমুদ্র সৈকত ভরে যায় আলোকিত মানুষের আনাগোনায়। সমুদ্র সৈকতে ঝড়ো হাওয়া বয়, শরৎ হাটে অন্যমষ্ক হয়ে, পাশে কৌশিক বউ নিয়ে ছুটে বেড়ায়, পাগলা হাওয়ায় এলোমেলো দোলে তার ভ্রমরকালো চুল। সমুদ্র শৈকতে ভেরে নাবিক আবু সালেহ , আতাউর, আরাফাত, রাগ ইমনের তরী। চারিদিকে বয় সুরের মুচ্র্ছনা, আমরা তন্ময় হয়ে হারিয়ে যাই অচেনা দূর দ্বীপের দেশে, যার খোঁজ ছিল আমাদের অজানা, যেখানে আছে শুধুই ভালোবাসা।

কালপুরুষের ভাইয়ের কন্ঠে গান শুনলাম, শুনলাম কিশোর কালপুরুষের গান। তবে কালপুরুষ ভাবীর গান আমাকে নিয়ে যায় হারানো সুরের দেশে, মনে হলো পুরণো দিনের কোন সিনেমার নায়িকা সমুদ্রের বেলাভূমিতে গান গেয়ে গেয়ে আমাদের আসরে চলে এসেছেন। তার গানের সাথে গলা মেলালো অনেকেই। একে একে সুরের মুচ্র্ছনায় ভাসিয়ে গেল সারিয়া আর রাগ ইমন। তবে রাগ ইমনের কথা আমাকে চমৎকৃত করেছে। কথা বলাও যে শিল্প তা রাগ ইমনের কথা না শুনলে বোঝা মুশকিল। স্বতস্ফুর্ত কথা, কথার পিঠে কথা আমাদের অবাক করে দেয়। ও যদি নারী হতো তবে নিশ্চিত হেলির ধুমকেতুর মতো একটা লম্বা লেজ নিয়ে ছুটে বেড়াতো। লেজের মতো ঝুলে থাকা একপাল প্রেমিক হাপিত্যেষ করে মরতো তবু রাগের নাগাল পেত না।

আমরা শুনলাম আতাউরের কথা, মৃতু্যকূপ থেকে ফিরে আসার ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা। শুনলাম সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য, শিশু পুত্রের সুন্দর আগামীর জন্য জীবন যুদ্ধে লড়ে যাওয়ার কথা। তবু খুব বেশি আশ্বস্ত করতে পারলাম না তাকে। আমাদের কি-ই বা করার আছে, কোটি টাকা খরচ করে তো আর রাজপ্রাসাদ কেনার ক্ষমতা আমার নেই, তবে আমার আছে এক পয়সার টোকেন মানি দিয়ে ভালোবাসার স্বর্গ কেনার ক্ষমতা।

সুনীল সমুদ্র আবৃত্তি করে শোনালো প্রাপ্তিকে নিয়ে লেখা তার আবেগ ঝরা লেখাটি। আগেও পড়েছি, মন্তব্যও করেছি, তবে অফিসের ব্যস্ততায় লেখাটির শক্তি সম্পর্কে ধারণা নিতে পারি নি। কিন্তু তার আবেগ জড়ানো কন্ঠে মুহূর্তে পরিবেশ ভারী হয়ে গেল। এতো দরদ দিয়ে লেখা, এতো মায়ালাগানো কন্ঠ, সুনীল সমুদ্রসম ভালোবাসা আমাদের ক্ষুদ্র হৃদয়ে ধারণ করি কি করে, আবেগের ঢেউ আমাদের হৃদয় উপকূল ছাপিয়ে চোখের তারায় তারায় খেলা করে। সারিয়ার চোখ ভিজে যায়, ভিজে যায় চোখের কাজল, ভালোবাসা গড়িয়ে পড়ে প্রাপ্তির মায়ের গাল বেয়ে। সবার বুকেই শুনি বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, সুনীল সমুদ্রের গর্জন, সমুদ্রের শুভ্র সফেদ ঢেউ ফাদে আটকে পড়া সাপের মতো ফুঁসতে থাকে, আর আমরা কূলহারা নাবিকের মতো এদিক ওদিক তাকাই, জলোচ্ছাস কিছুতেই যেন বাঁধ ভেঙে গাল ভিজিয়ে না দেয়, তবু পার পাওয়া যায় না।

একরত্তি মেয়ে এতো কেন কাঁদাও মোদের, এই বুড়ো বয়সে কাঁদতে যে নেই তা তুমি কেন বোঝ না।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন