বেড়ালটা গেল কই

কয়েক দিন ধরে নাহিদার কোন খোঁজ নেই। ক্লাসে নেই, সেমিনারে নেই, কলেজের কোন খানেই ওর ঝুটির খোঁজ পেলাম না। শহরে ও মামার বাসায় থেকে পড়ালেখা করছে তাই ফ্যাক্স-ফোনের দোকান থেকে ওর মামার বাসায় ফোন করলা। জানতে পারলাম ও গ্রামের বাড়ী গেছে, এখনো ফেরেনি।

কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস হচ্ছে। এমনিতেই আমাদের কলেজে টিচার সংখক, তিনজন টিচারের মধ্যে একজন ছমাস থাকেন অসুস্থ, হেড স্যারের সব সময় পড়ানোর মুড থাকে না, আর একমাত্র প্রাণসংহারিণী ম্যাডাম গেছেন অষ্ট্রেলিয়ায় উচ্চতর প্রশিক্ষণে। সামনেই পরীক্ষা, আর এমন সময়ের দূর্লভ ক্লাসগুলো কেন যে ও মিস করছে বুঝি না। অসুখ-টসুখ বাধিয়ে ফেলেনিতো আবার, নাকি বিয়ের কথাবার্তা চলছে! বিয়ে হলে অবশ্য খারাপ হয় না, ওর বিয়ে দিয়েই তাহলে সে বিয়ের রেলগাড়িটা চলা শুরু করবে, এরপর তারিকা, লিপি, হেলেন বিভিন্ন স্টেশন ঘুরে ঘুরে হয়তো আমার প্লাটফরমেও একসময় থামবে ওটা।

টিচার সংকটের জন্য আমরা নিজেরাই নিজেদের ক্লাস নেই, আবার বিকেল বেলা চলে নির্ধারিত বন্ধুদের মাঝে বিভিন্ন বই নিয়ে আলোচনা। আমাদের আলোচনা চক্রের সদস্য চারজন, আমি, ঝর্ণা, হেলেন আর নাহিদা। নাহিদার অভাবে তাই বিকেলের আড্ডাটাও জমছে না।

সিদ্ধান্ত নিলাম ওর বাড়ি যাব। বাড়ী অবশ্য চিনি না, জানি জেলার একেবারে শেষপ্রান্তে রিমোট এরিয়া সাহেবরামপুরে ওদের বাড়ী। দূর্গম পথ পাড়ি দিয়ে তবেই যেতে হবে। তবু বন্ধুত্বের জোরেই বোধহয় সকাল বেলা রওয়ানা হলাম ওদের বাড়ীর উদ্দেশ্যে। ওদের বাড়ী যেতে প্রথমেই মাদারীপুর থেকে ভুরঘাটা পর্যন্ত যেতে হয় লোকাল বাসে। লোকাল বাসে চড়ে ভুরঘাটা যাওয়া রীতিমতো যুদ্ধ জয়ের মতোই কঠিন। প্রতি বাড়ীর সামনে থেমে থেমে যাত্রী উঠিয়ে যখন বাস ঘুরঘাটা পৌছলো ততক্ষণে একঘন্টারও বেশি সময় চলে গেছে।

এখান থেকে আবার ভ্যানে চড়ে যেতে হবে কালকিনি শহরে। ভ্যানেও যে যাত্রী বহণ করা হয় তা জানলাম মাদারীপুরে এসে। মাদারীপুরে এসে প্রথম দিন মস্তফাপুর থেকে শহরে যেতে রিক্সার জন্য দাড়িয়ে ছিলাম আধা ঘন্টা। হাবার মতো দাড়িয়ে থাকতে দেখে এক লোক এসে যখন জানলো আমি রিক্সার জন্য অপেক্ষা করছি তখন বললেন যে এখানে ছাত্র শিক্ষক, ধনী গরীব সবাই ভ্যানেই চড়ে। অগত্যা লাজ শরমের মাথা খেয়ে ভ্যানেই চড়ে বসলাম।

কালকিনি থেকে আবার ভ্যানে করে কয়েকবার যাত্রা বিরতি দিয়ে এবড়ো থেবড়ো, আকা বাঁকা গ্রাম্য পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছলাম সাহেবরামপুর বাজারে। কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করতেই নাহিদার বাড়ির ঠিকানা পাওয়া গেল। আন্ডারচর সিনিয়র মাদরাসাটা পেরিয়ে আরো কিছুটা সামনে গেলেই ওদের বাড়ি। গ্রামের এই এক সুবিধা, সকলেই সবাইকে চেনে, যেন সবাই একই পরিবারের সদস্য, যেন একদেহ এক প্রাণ।

পথে যদিও কষ্টের কোন সীমা ছিলনা তবে বিশাল একটা বিলের পাগলা হাওয়ায় ভর করে চলতে চলতে ক্ষণে ক্ষণে সীমাহীন আনন্দে শিহরণ জাগছিল মনে। আশে পাশের পরিবেশ এতো মনোমুগ্ধকর, বাবলা গাছের সারি, কোথাও পাটের আশ ছাড়াচ্ছে শাখা-সিঁদুর পরা গ্রাম্য বৌদিরা, কোথাওবা উঠুনে ধান ছড়িয়ে নকশী কাঁথার মতো নকশা কেঁটে চলেছে চপলা কিশোরীর দল, আবার কোথাও বা ঝিলের জলে গাঁয়ের দুষ্টু ছেলের দল শতদল তুলছে মহানন্দে। বন্ধুর বাসায় আদরযত্ন পাব কি না, নাকি লোকলজ্জার ভয়ে না চেনার ভান করে তাড়িয়ে দেবে তা আর মাথায় থাকে না, মাথায় তখন নানারঙের আনন্দ প্রজাপতির পাখায় ভর করে উড়ে উড়ে যায়।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন