ভালো থেকো বাবা

ঝড়ো হাওয়ার আজকের লেখাটি পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। বার বার অতীতে ফিরে যাচ্ছি, কিছুতেই মন ভালো হচ্ছে না। কিছু কিছু কষ্টের স্মৃতি সবার সাথে শেয়ার করতে ইচ্ছে করছে।
বারবার বাবার কথা মনে পড়ছে। চাকুরীর জন্য তার সাথে আমার তিনশ কিলো দূরত্ব। আর বছর খানেক পর তার চাকুরীর মেয়াদ শেষ হবে, তারপর আমরা একসাথে সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করতে পারবো, এই ভেবেই সময় পার করছি।
আমার বাবা। আমার জীবনে দেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ সত্যনিষ্ঠ ও আদর্শ পুরুষ। একটি গৃহস্ত পরিবারে জন্ম নিয়ে মাত্র তিন বছরেই বাবাকে হারান। নানা প্রকিকূলতাকে জয় করে কৃতিত্বের সাথে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নিয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন।
তার কর্মজীবন শুরু হয় স্কুলে শিক্ষকতা দিয়ে। একজন সফল ও আদর্শ শিক্ষক বিশেষ করে প্রধান শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মস্থলে আজো কিংবদন্তী হয়ে আছেন।
বাবা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক। স্কুল ছেড়ে একসময় তিনি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। রাজনীতি তার আলোচনার বিষয় হলেও রাজনীতি থেকে নিজেকে সযতনে সরিয়ে রেখেছেন, তবে রাজনৈতিক অত্যাচার এড়াতে পারেন নি। এমন একটা শাসনামল আসেনি যে আমলে তিনি সরকারের কোপানলে পড়েন নি, আওয়ামী আমলেও নয়। নীতি নিয়ে আর যাই হোক সমাজে টিকে থাকা সহজ নয়।
আমার নানা বাড়ি কট্টর আওয়ামীপন্থী। স্বাধীনতার সময় নানা ছিলেন আওয়ামীলীগের ইউনিয়ন সভাপতি। তেমনি আমার বাবা রাজনীতি না করলেও বঙ্গবন্ধুর কট্টর সমর্থক। বাবা বলেন, “বঙ্গবন্ধুকে যে অসম্মান করে কথা বলে তাকে আমি গুলি করতেও দ্বিধা করবো না” যদিও বাবার গুলি করার কোন ক্ষমতাই নেই, তার বন্দুক নেই আছে শুধু নদীর চরের মতো নরম একখন্ড হৃদয়।
নকলের বিরুদ্ধে তাঁর দৃঢ অবস্থান এলাকায় এখনো শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়। কলেজে যোগদানের পর থেকে নকল বিরোধী জেহাদে তিনি হয়ে ওঠেন অজেয়। বারবার নানা আক্রমনের শিকার হয়েও তাঁর সমরে তিনি ছিলেন অটল।
কিন্তু ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর আমাদের এলাকার পরিবেশ কেমন যেন অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। কিছু উচ্ছৃংখল যুবক স্থানীয় সাংসদের ক্ষমতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তার নকল বিরোধী আন্দোলনে তীব্র আঘাত হানে। তিনি ছুরিকাহত হন এবং তার বুকের হাড় ভেঙে যায়। অথচ সাংসদের হস্তক্ষেপের জন্য এ ঘটনার কোন বিচার হয় নি বরং মামলাটাও শেষ পর্যন্ত উঠিয়ে নিতে হয়েছে।
অন্যায়ের কাছে মাথা না নোয়ালে যে কি খেসারত দিতে হয় তা আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না। ৯১-এর নির্বাচনে পোলিং অফিসারের দায়িত্ব পালনকালীন সাংসদের নির্দেশ অনুযায়ী ভোট ডাকাতিতে সহযোগিতা না করায় নির্যাতনের শিকার হতে হয় বাবাকে। নির্বাচনের পরে রাতের আধারে পায়খানার ময়লা দিয়ে ভাসিয়ে দেয়া হয় আমাদের বাড়ি। না এরও কোন বিচার হয় নি।
ক্ষমতার পালাবদলে সেই সাংসদ একসময় ক্ষমতা হারিয়েছেন কিন্তু তারপরও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া যায় না। কারনমহান স্বাধীনতার যুদ্ধে তিনি দেশের জন্য দেশের স্বাধীনতার জন্য দেশের মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষার্থে অসামান্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে রাষ্ট্রীয় পদকে ভূষিত হন । বাবা ইচ্ছে করলে ক্ষমতাহীন সাংসদের নাম জড়িয়েই মামলা করতে পারতেন পরবতর্ী সময়ে, কিন্তু বাবা বলেন যে লোক দেশের দুর্দিনে, স্বাধীনতার যুদ্ধে অকুতোভয় সৈনিকের ভূমিকা পালন করেছে একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে তাকে সবার সামনে অপদস্থ করা যায় না।
আমরা সাধারণ জনতা একজন মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা বুঝি, তাঁরা কেন নিজেদের দাম বোঝে না? আল্লাহ কি স্বাধীনতার সূর্য সন্তানদের তাদের মর্যাদা অনুধাবনের ক্ষমতা দিতে পারো না?

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন