প্রাপ্তির জন্য বুকভরা ভালোবাসা

প্রাপ্তি আমাকে ঘুমুতে দেয় না।
যখন তখন সামনে এসে হানা দেয়, আমার জন্য কি এনেছ চাচ্চু?
আমি লজ্জায় মুখ লুকাই। দারিদ্র আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে।

মাঝে মাঝে দারিদ্র বন্ধুর মতো পাশে এসে শান্তনা দেয়। কাধে হাত রেখে বলে, প্রাপ্তি তোমার কে যে তার জন্য তোমার কিছু করতেই হবে। সমাজে হাজারটা শিশু হাসপাতালে মৃতু্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, সবারতো আর উপকার করতে পারবে না। প্রাপ্তির জন্য কিছু করতে না পারলে শুধু শুধু কষ্ট পাওয়ার কি আছে?

মেজাজটা তেতে ওঠে আমার। বলি, সমাজের কয়টা লোক আমাকে গণার মধ্যে ধরে? কয়জন আমার ভালোবাসা পেতে চায়? প্রাপ্তি আমার ঘরে এসেছে গলা জড়িয়ে বলেছে চাচ্চু, ৫ তারিখ কিন্তু বাসায় আসতেই হবে, কি আসবে না?

প্রাপ্তি বারবার ফিরে আসে।
কখনো ফিরে আসে কেমোথেরাপির নীল কষ্ট বয়ে নিয়ে, কখনো বা আসে শুনসান নিরবতা হয়ে। কখনো অপারেশন থিয়েটারে শরবিদ্ধ কবুতরের মতো অসহ্য যন্ত্রণায় ডানা ঝাপটায়, স্পাইন্যালে ইনজেকশনের ব্যাথা আমার প্রতিটি শিরা বেয়ে স্নায়ুতে ঢুকে বিছের মতো কামড়ে ধরে। কান্ত বিধ্বস্ত আমি উদ্বান্তের মতো ছুটে বেড়াই কিন্তু মুখ লুকোনোর আশ্রয় খুঁজে পাই না।

কেমো থেরাপি শেষে প্রাপ্তিসোনা নিথর হয়ে ঘুমায়। আমি প্রাপ্তির মাথায় হাত বুলিয়ে বিলি কেটে দেই, তপ্ত কপালে দেই চুমো একে। তৃপ্তি ডাগর ডাগর চোখ মেলে আমার দিকে তাকায়। মিষ্টি হেসে বলে: চাচ্চু, আমার জন্য কি এনেছো?
আমি লজ্জায় মুখ লুকাই। দারিদ্র আমাকে আষ্টেপৃষ্টে বেধে রেখেছে।

সাড়ে চার হাজার টাকার বেতনে চাকুরী জীবন শুরু সেই দু হাজার তিনে। এমাসে তুলেছি দশহাজার একশত টাকা। বউয়ের হাতে তুলে দিতে না দিতেই তলানিটুকুও হাওয়া হয়ে গেল। বেতন থেকে বাঁচিয়ে পাপ্তির কাছে যাওয়া আমার আর হয় না।

প্রাপ্তিসোনা আবার আমার সামনে এসে দাড়ায়। আমি কোলে তুলে প্রাণভরে আদর করি। প্রাপ্তি আমার গলা জড়িয়ে বলে, চাচ্চু, সোমবার কিন্তু তোমাকে আসতেই হবে।

আমি কিছু ভাবতে পারি না। আমার চিন্তাচেতনা এলোমেলো হয়ে যায়। প্রাপ্তির ব্লগে ঢুকেও কোন মন্তব্য করতে পারি না, প্রাপ্তির জন্য সবার কাছে আবেদন করতে পারি না, আমার অনিশ্চিত যাত্রা আমাকে পাগল করে দেয়।মাঝে মাঝে ভাবি, আর আসবো না এ ব্লগে, কিন্তু প্রাপ্তিসোনা আমাকে কিছুতেই যেতে দেয় না।

গুলিস্তান থেকে কেনা জুতোজোড়ায় আর চলছে না। একজোড়া ভালো জুতোর জন্য অনেকদিন থেকেই পয়সা জমাচ্ছি। এলিফ্যান্ট রোডে একজোড়া বাটার জুতো দেখে রেখেছি, পনেরশ টাকা দাম। কিন্তু প্রাপ্তির কথা ভেবে ঠিক করেছিলাম এ জুতোদিয়েই আরও কিছুদিন কাটাবো। জুতোছাড়াই যখন এতোদিন পার করতে পেরেছি, তো আর কিছুদিন পার করলে এমন কি ক্ষতি হয়ে যাবে? কিন্তু গতকাল বউটা হঠাৎ অসুস্থ হলে ডাক্তার আমার সঞ্চিত শেষ সম্বলও হাতিয়ে নিয়েছে।

অথচ প্রাপ্তি আমার পথ চেয়ে আছে, আমি কি করে প্রাপ্তিকে এড়িয়ে যাই। প্রাপ্তিকে যতবার আমি ভুলতে চাই ততবারই আমার বাবু হয়ে কাছে আসে। আমার বাবুটাকে কোলে নিলে মিষ্টি করে হাসে, সে হাসিতে আমি প্রাপ্তিকে দেখতে পাই। আমার বাবুটাকে চুমু দিলে প্রাপ্তি গাল বাড়িয়ে দেয়। কি করে আমি প্রাপ্তিকে ভুলে থাকি?

প্রাপ্তি! দারিদ্র যতই আমায় আগলে রাখুক, আমি কাল আসবোই, একবুক ভালোবাসা নিয়ে, তোমাকে আমি কিছুতেই হারাতে দেব না।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন