পুরস্কারটা হাতছাড়া হয়ে গেল

মাধবীর ফোন পেয়ে হোন্ডায় ইউটার্ন নিলাম।
ট্রাফিক পুলিশকে পরোয়া করার সময় এটা নয়, আর পুলিশ যদি গতিরোধই করে তবে পুলিশের উদ্যত ফনার সামনে সাংবাদিক কার্ড নামের রক্ষাকবজটি ছুইয়ে দিলেই ল্যাটা চুকে যাবে।
স্পটের কাছাকাছি আসতেই চোখে পড়লো কালো ধোয়ার কুন্ডলী পাক খেয়ে খেয়ে ঢাকার বিষাক্ত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে।
ইতোমধ্যে অতু্যৎসাহী জনতার একটা ছোটখাট ভিড় তৈরী হয়েছে, অধিকাংশই এসেছে জীবন্ত সিনেমা দেখার জন্য। দুয়েকজন আবার মগ বালতি নিয়ে ছুটোছুটিতে ব্যস্ত।
ফায়ার সার্ভিসের গাড়ী আসার কোন লক্ষণ দেখলাম নেই, আর গার্মেন্টসা পুড়ে ছাই হওয়ার আগে আসতে পারবে বলেও মনে হয় না।
হোন্ডাটা ফুটপাতে দাড় করিয়েই ক্যানন টুয়েন্টি ডি সিঙ্গেল লেন্স রিফ্লেক্স ক্যামেরাটি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম ভিড়ের মাঝে। যতটা দ্রুত সম্ভব ভীড় ঠেলে পরিস্কার একটা জায়গায় উঠতে হবে। লোকজনের মাথার উপর দিয়ে ক্যামেরা তাক করে ছবি তোলায় মজা নেই।
ছবি তোলার হাত আমার ভালোই, ইতোমধ্যে ছোটখাট নামও করে ফেলেছি এ লাইনে। মাধবীর ধারণা আমি জন্মেছি এএফপিতে কাজ করার জন্য, ভাগ্যদোষে বাংলাদেশের একটা ক্ষ্যাত পত্রিকায় ঢুকে পড়েছি।
গার্মেন্টসে আগুন লাগলে কলাপসিবল গেট বন্ধ করে দিতে হয় এ বোধহয় কোন ধর্মগ্রন্থে লেখা আছে। যথারীতি এখানেও গেট বন্ধ করা হয়েছে কিন্তু জীবন রক্ষার তাগিদে কিংবা নির্মাণ ত্রুটির কারণেই হোক কলাপসিবল গেট ভেঙ্গে নীচতলার গামেন্টর্স কর্মীরা হুড়মুড়িয়ে বেড়িয়ে এলো।
আমি আমার ক্যামেরা হাতে তুলে নিলাম শট নেয়ার জন্য।
দিগ্বিদিক জ্ঞানশুন্য মেয়েরা ইতস্তত ছুটোছুটি করছে। সর্বশেষ যে মেয়েটি বেরিয়ে এলো আগুন তার সর্বাঙ্গ গ্রাস করেছে। প্রাণ বাঁচাতে মেয়েছি ছুটে আসছে, তার শাড়ি উড়ছে হাওয়ায়, শাড়ীর আগুন উড়ছে দাউ দাউ করে। এক্ষুণি মেয়েটি গড়াগড়ি দিয়ে আগুন নেভাতে না পারলে কিছুতেই বাঁচবে না, পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।
স্লস্পীডে প্যান করে চিত্রটা ধারণ করলে নিশ্চিত একটা ক্লাসিক ছবি হবে, ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো পুরস্কার না হলেও ছোট খাট পুরস্কার যে পাওয়া যাবে তা নিশ্চিত।
আমি মুহুর্তেই এক দৌড়ে ঝাপিয়ে পড়লাম মেয়েটিকে নিয়ে। মাটিয়ে লুটিয়ে পরে জড়াজড়ি করে গড়িয়ে পরলাম পাশে জমে থাকা বৃষ্টিভেজা কাদাপানিতে। ক্যামেরাটি হাত থেকে ছুটে কোথায় পড়েছে তার আর খোঁজ পেলাম না।

হাসতাপালের বেডে শুয়ে ভাবছি, কাজটা কি ভুল করলাম। সাংবাদিকদের হাতে এমন সুযোগতো আর বারবার আসে না। ওয়ার্ল্ড ফটো প্রেস পুরস্কারটা হাতের মুঠোও এসেও পিছলে গেল, উপরন্তু ঝলসে গেছে মুখের একটা পাশ।
না, আমি ভুল করিনি, আমি মানবতাকে স্থান দিয়েছি পেশার উপরে, আমার ছবিতে দেশের গার্মেন্টস শিল্প বেচে যেত কি না জানি না, কিন্তু একটা বালিকাকেতো বাচাঁতে পেরেছি, একটি পরিবারের মুখে হাসি ফিরিয়ে দিয়েছি, এই অর্জনই বা কম কোথায়।

Be Sociable, Share!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।