রবিনহুড

হঠাৎ করেই দাড়ি রাখা শুরু করলাম। ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি।
দুই গালে পানামা আর সুয়েজ খাল প্রবহমান বিধায় চাপ দাড়ি রাখা হয়ে উঠেনি। এতো সুন্দর দুটি নদী থাকার পরও এর কূলে ঘন বন-বনানীর সৃষ্টি হয়নি ছড়ানো ছিটানো হালকা একপশলা দাড়ি ছাড়া।
সকালবেলা কলেজে লিপি বললো, হাই রবিন, কেমন আছিস?
রবিন! আমি অবাক হয়ে তাকাই, এমন একটা নাম আমার আর আমিই জানি না!
লিপি বললো, কি অবাক হয়েছিস। আরে রবিন মানে রবিনহুড, তোকে ঠিক রবিনহুডের মতো দেখায়, কেন তুই টিভি দেখিস না?
আগ্রহভরে রবিনহুড দেখতে বসলাম একরাতে, কিন্তু ছাগুলে দাড়ি ছাড়া আর কোন মিল খুঁেজ পেলাম না।
মিল থাক আর নাই থাক, কলেজে রবিন নামটা চালু হয়ে গেল। বন্ধু-বান্ধব আমার আসল নাম ভুলে রবিন নামেই ডাকতে শুরু করলো।

আমাদের ডিপার্টমেন্টের এক অনুষ্ঠানে বিভাগীয় প্রধান স্যার আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ছেলেটা দেখতেও রবিনহুডের মতো, আর সবসময় ঘোরেও একপাল মেয়ে নিয়ে ।
বোটানীর ম্যাডাম নতুন জয়েন করেছেন। তখনো বিয়ে করেন নি, একদম নতুন চাকুরী। আমরা বন্ধু-বান্ধবীরা মিলে প্রাণখুলে ম্যাডামকে টীজ করতাম।
পরীক্ষার ক্লাসে ম্যাডাম দায়িত্বে ছিলেন, কিছুক্ষণ পর আমার কাছে এসে বললেন, বলোতো আমি তোমাকে কেন মনে রাখবো?
আমিতো অবাক, অন্য ডিপার্টমেন্টের ম্যাডাম বলে কখনো কথা হয়নি, তবেকি টীজিংয়ের প্রসঙ্গে প্রশ্ন করছেন? আমি ভয়ে ভয়ে জবাব দেই, জানি না তো।
ম্যাডাম বলেন, রবিনহুডের জন্য, তোমার চেহারা একেবারে রবিনহুডের মতো।

বিকেল বেলা মাঝে মাঝেই কলেজের পাশের অলিগলি দিয়ে হাটি, কখনো একা, কখনো সবান্ধবে।
সেদিন হাটতে হাটতে দেখি একটা শিশু তাদের বাসার সামনের উঠোনে আকুল হয়ে কাঁদছে। অভিমানে অঝোর ধারায় ঠোট ফুলিয়ে কেঁদে কেঁদে বুক ভিজিয়ে ফেলেছে।
বাচ্চাটির বড়বোন হবে হয়তো, কান্না থামানোর অনেক কসরত চালিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ আমার দিকে চোখ পড়তেই বাচ্চাটিকে বললো, দেখ দেখ রবিনহুড যায়।
ম্যাজিক কিনা জানিনা, কিন্তু বাচ্চাটি আমাকে দেখে মুহুর্তেই তার কান্না থামিয়ে হেসে ফেলল। রবিনহুডের প্রতি ওর এ ভালোবাসা দেখে বিস্মিত।

সবাই আমায় রবিন বলে ডাকে, যদিও আজও আমি রবিনহুডের সাথে আমার কোন মিল খুঁেজ পাই না, অনুর্বর কগাছি দাড়ি ছাড়া।
তবুও আমি মনে মনে শিশুদের মতো স্বপ্ন দেখি, আমি যেন রবিনহুড হয়ে গেছি, সমাজের সকল শিশুর মুখে হাসি ফোটাতে দিগ্বিদিক ছুটে বেড়াচ্ছি গরীব, অসহায় অনাহারী মানুষের নায্য অধিকার আদায়ে জালিমের প্রাসাদ চুরমার করে নতুন পৃথিবী গড়ছি।

এ আমার স্বপ্ন হলেও আমি জানি, রবিনহুড আবার ফিরে আসবে, বাংলার ঘরে ঘরে।

Be Sociable, Share!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।