টিকা আতংক

টীকা আতংকে ভোগেনি আমাদের আমলের এমন শিশুর হদিস পাওয়া যাবে না। কাউকে ভয় দেখাতে হলে টিকার কথা বললেই হতো, মুহুর্তে অনেকে প্যান্টই ভিজিয়ে ফেলত। শিশুদের রাক্ষস খোক্ষসের চেয়ে টিকার কথা বললেই বেশী চাপে রাখা যেত। রোগ প্রতিরোধে যেমন টীকা কার্যকর, তার চেয়ে বেশী কার্যকর শিশুদের ঘুম পাড়ানো ওষুধ হিসেবে। আমার দেখার সুযোগ হয়েছে টীকা দেয়ার আজব যন্ত্রগুলো, এক কথায় ভয়ংকর। পশ্চিমা দেশে যেমন কাউ বয়রা যেমন নতুন গরুর শরীরে গণগণে লোহা দিয়ে ব্রান্ডিং করে, এদেশৈও টীকা দিয়ে তেমনি শরীরে টীকার সার্টিফিকেট সেটে দেয়া হতো। আজো আমাদের মুরুব্বীরা বাহুতে বাহুতে টীকার কুৎসিত দাগ আর ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন নিয়ে ঘুরে বেড়ান। তবে টীকা দেয়ার পদ্ধতিটি যতটা কুৎসিতই হোক না কেন টীকা নিতে গিয়ে সে আমলে কেউ মারা যেত এমন সংবাদ শোনা যায় নি।

টীকা দানের পদ্ধতি অনেক সহজ হয়েছে। সুক্ষ্ম সুঁচ ফুটিয়েই আজকাল টীকার কাজ চলে, কিছু কিছু টীকাতো মুখেই খাওয়ানো হয়। খেয়ে দেখেছি, মন্দ নয় ভিটাসিম এ ক্যাপস্যুলগুলো। তবে যতই মিঠে হোক না কেন, টীকা নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতার অভাব নেই। টীকা ভয়ংকর কিছু রোগকে প্রতিরোধের জন্য নেয়া হয়। টীকার পাশাপাশি ইদানিং ভিটামিন এ ক্যাপস্যুল ও কৃমিনাশকও খাওয়ানো হচ্ছে। ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবে সরাসরি শিশুর মৃত্যু হয় না, তবে এর অভাবে অন্যান্য রোগ দেখা দেয়, যার ফলে শিশুর মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায় এমন দাবী বিশেষজ্ঞদের। তবে ভিটামিন খেলে যে শিশুর মৃত্যু হতে পারে তা কোমলমতি শিশুদের হত্যা করে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় প্রমান করে দেখিয়েছে।

গতকাল বরিশালের হিজলায় হামের টিকায় তিন শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া গেছে। খবরে প্রকাশ বুধবার দুপুর ১২টার দিকে হামের টিকা দিতে হিজলার কালিকাপুর কমিউনিটি ক্লিনিকে অভিভাবকরা শিশুদের নিয়ে গেলে দায়িত্বরত স্বাস্থ্যকর্মী শিশুদের শরীরে ক্লিনিক থেকে দূরে থাকা আলমগীর শিকদার-এর ফার্মেসি থেকে ভাঙ্গা এমপুল (হামের টিকা) পুশ করে। সাথে সাথে তাদের শরীরে সমস্যার সৃষ্টি হয়। তাৎক্ষণিক হিজলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসা হলে তাদের অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয় এবং পরে রিতম, তিশা ও তমা নামের শিশু তিনটির মৃত্যু ঘটে।

গতবছরের মাঝামাঝি সময়ে জাতীয় টীকাদান কর্মসূচী পালনকালীন বাগেরহাট, পিরোজপুর, মুন্সীগঞ্জ ও খুলনাসহ বিভিন্নস্থানে শিশু মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। দেশের বিভিন্নস্থানে হাজার হাজার শিশু অসুস্থ্য হয়ে পড়ে, দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে আতংক। অথচ ঐ সময়ে টীকায় শিশুর মৃত্যুর খবরে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে কাদাছোড়াছুড়ির পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী টীকায় শিশু মৃত্যুর ঘটনা পুরোপুরি অস্বীকার করেন। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর একের পর এক বিপর্যয়ের মাঝে শিশুস্বাস্ত্যের মতো্ স্পর্শকাতর একটি বিষয়ের সরকারের চরম দায়িত্বহীনতা ও ব্যর্থতার দায় এড়াতে শিশু মৃত্যু কথা চাপা দিলেও নূন্যতম দায়িত্বজ্ঞান থাকলে এ ধরণের যে কোন ঘটনার পুনরাবৃত্তিরোধে সতর্ক পদক্ষেপ নেয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হয় নি, বরং টীকার নামে নিত্য নতুন আতংক ছড়িয়ে সাধারণ মানুষকে দিশেহারা করা হচ্ছে।

টীকা দেয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মীদের যুগোপযুগী কোন প্রশিক্ষণ দেয়া হয় কিনা এমন সন্দেহ করার যথেষ্ট কারন আছে। আমার নিজের শিশুকেও টিকা দিতে গিয়ে বিপত্তিতে পড়তে হয়। শিশুদের শরীরে কিভাবে ইনজেকশন পুশ করতে হয় এটুকু সাধারণ জ্ঞানও স্বাস্থ্যকর্মী আছে বলে মনে হয় নি। শিশুদের কোমল শরীরে সতর্কতার সাথে ইনজেকশন পুশ করার বদলে সুঁচে যদি শিশুর বাহু এফোড় ওফোর হয়ে যায় তখন স্বাস্থ্যকর্মীদের টীকা দেয়ার উচিত শিক্ষাটাই দিতে ইচ্ছে হয়। টীকার বিভিন্ন বিপর্যয়ের পাশাপাশি নিত্যনতুন টীকা আবিস্কার করে সাধারণ মানুষের শরীরে পুশ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় বলে মনে হয়। উন্নত বিশ্বে নতুন কোন টীকা আবিস্কৃত হলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নীরিক্ষা শেষে ভলান্টিয়ারদের শরীরে পুশ করে কার্যকারীতা পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু ইদানিং মনে হয় পরীক্ষা-নীরিক্ষার সেই সনাতনী পদ্ধতি বাতিল করে এখন দরিদ্র দেশগুলোর মানুষের শরীরে পুশ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার করে টীকার গুণাগুণ যাচাই করা হয়। আমার অভিযোগের হয়তো কোন ভিত্তি নেই, কিন্তু কিছুদিন আগে নতুন বের হওয়া টীকা নিয়ে আমার বাবা যখন অসুস্থ্য হয়ে পড়েন তখন এ দাবী করা ছাড়া কোন যুক্তি খুঁজে পাই না।

ভিটামিন এ’র অভাবে শিশু মারা যায় না, হামেও শিশু মৃত্যুর কথা খুব একটা শোনা যায় না, কৃমির অত্যাচারে শরীর রুগ্ন হলেও সচরাচর মৃত্যুর খবর শোনা যায় না। কিন্তু ভিটামিন এ ক্যাপস্যুল খেয়ে, হামের টীকায় কিংবা কৃমিনাশক ট্যাবলেটে যে শিশুর মৃত্যু হতে পারে তা এদেশের সরকার শিশু হত্যার মাধ্যমে প্রমাণ করেছে। শত যন্ত্রণা হলেও টীকা নিয়ে শিশুদের ভবিষ্যতকে রোগমুক্ত রাখতে চায় অভিভাবরা, কিন্তু ভবিষ্যতকে নিরোগ রাখতে বর্তমানটাই যদি হারিয়ে যায় তবে সে টীকায় কি লাভ। যুগ যুগ ধরে টীকা নিতে গিয়ে এমন বিপর্যয় হয় নি বরং কঠিন কয়েকটি রোগ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তাই টীকা যে কার্যকর এতে সন্দেহ নেই, সন্দেহ স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের অদক্ষতা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বাবহেলায়। তাই টীকা নিয়ে দেশব্যাপী যে আতংক সৃষ্টি হয়েছে, জনমনে যে সন্দেহ সংশয় দেখা দিয়েছে তা দূরকরণে আশু পদক্ষেপ নেয়া দরকার। পাশাপাশি টীকা নিতে গিয়ে দেশব্যাপী শিশুমৃত্যুর প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করতে হবে। আর এতগুলো শিশু মৃত্যুর দায় কিছুতেই সরকাকের স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় এড়াতে পারে না বিধায় দায়িত্বহীনতা ও ব্যর্থতার দায় নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দ্রুত পদত্যাগ করা উচিত।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“টিকা আতংক” লেখাটিতে 3 টি মন্তব্য

  1. আরাফাত রহমান বলেছেন:

    পদত্যাগ তো দুরের কথা, মন্ত্রী এই শিশু মৃত্যুর কারণ হিসেবে যুদ্ধপরাধীদের দায়ী করেন কিনা সেটাই দেখেন।

    [উত্তর দিন]

    sohel উত্তর দিয়েছেন:

    100% like korlam

    [উত্তর দিন]

  2. ranu বলেছেন:

    আমার টিকা নেওআার ঘটনা মনে আছে।চারটী টিকা।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন