প্রজাপতি ও আমি

মুখ দেখে অনেকেই মানুষ চিনতে পারেন, এজন্য জোতিষ হওয়া খুব একটা আবশ্যক নয়।
যত দিন যাচ্ছে, নিয়মিত আমি এ সত্যের মুখোমুখি হচ্ছি।
বাজারে গেলে আমার মুখ দেখে মাছওয়ালা মুহূর্তেই বুঝে ফেলেন যে আমিই সেই ব্যক্তি যাকে তিনি ক্লোজআপ ওয়ানের মতো খুঁজছেন।
তার কাছে গচ্ছিত যাবতীয় পঁচা মাছগুলো আমাকে গছিয়ে দিয়ে তিনি স্বস্তির নিঃস্বাস ছাড়েন।
সেদিন কথা প্রসঙ্গে আমার সুনয়না পচাঁ মাছের কথা ফাঁস করে ফেলে। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি, এতোদিন পচাঁ মাছ কিনছি কই কখনো তো কিছু বলো না। মিষ্টি হেসে ও জবাব দেয়, পচাঁ মাছ কিনেছ বললে তোমার মনটাই খারাপ হয়ে যাবে, তাই বলা হয় নি।
পত্র-পত্রিকা আর টিভি মিডিয়ার কল্যাণে পরম শ্রদ্ধেয় রোকনুদ্দৌলার কার্যকলাপ দেখে হিংসে আমার পিত্তি জলে যায়। পুনর্জন্মে বিশ্বাসী হলে নিশ্চিত আমি রোকনুদ্দৌলা হয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসতে চাইতাম, তাতে অন্তত আর যা-ই হোক পচাঁ-বাসি কিছু খেতে হতো না।
বাজার-ঘাট করায় আরেক বিপত্তি বাধে দরদাম নিয়ে। দরদাম নিয়ে এতো ভোগান্তি হয় যে পারতপক্ষে আমি দরদামের ধারধারি না।
কয়েকটি পরিচিত দোকান থেকে সাধারণত আমি জিনিসপত্র কিনি। দরদাম নেই, যা যা দরকার লিস্ট ধরিয়ে দিয়ে বলি মোট কতো হলো, দাম যা বলে তা-ই দিয়ে বাসায় ফিরি। ডেলার মতো দরকষকষির ধৈর্য বা ইচ্ছে কোনটাই আমার নেই।
বাসার সবাই দেশী মুরগী পছন্দ করলেও আমি কিনি ব্রয়লার মুরগী, কারন ফিক্সড প্রাইস, দামাদামির ঝামেলা নেই। তেমনি জুতা কিনতে বাটা, শাড়ি কিনতে নবরূপা ইত্যাদি।
বাজারের সকল দোকানে ফিক্সড প্রাইসে বেচাকেনা হচ্ছে, তাই ঠকার কোন সুযোগ নেই, এমন স্বপ্ন দেখতে আমার খুব ভালো লাগে।
পথে ঘাটে সওদা-পাতি করতে গিয়ে এভাবে নিয়মিত ঠকে ঠকে লজ্জায় পড়ে যাই। নিজেকে খুবই অযোগ্য মনে হয়, পণ্যের গুণগত মান বোঝার মতো সামান্যতম বৃদ্ধিও আমার নেই জেনে আমি বেশ বিব্রত।

সেদিন বাসার ড্রইংরুমে বসে আছি। হঠাৎ দেখি ফ্লাওয়ার ভাসে সাজানো কৃত্রিম ফুলের উপরে এসে বসেছে একটা বাহারী রঙের প্রজাপতি। ক্ষণিকের জন্য মাত্র, পরেই বেচারী বুঝতে পেরেছে যে ও শতাব্দীর সেরা ধোকাটি খেয়েছে। মুখটি যদিও দেখিনি তবে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে বেচারী লজ্জায় লাল হয়ে গেছে।
ফুলে ফুলে উড়ে উড়ে যে প্রজাপতি মধু খেয়ে বেঁচে থাকে সে-ই যদি ধোঁকাবাজি বুঝতে না পারে, আসল নকল ফুলের প্রভেদ করতে না পারে তবে আমি আজে বাজে জিনিস কিনে ঠকলে খুব একটা দোষ হওয়ার কথা নয়।
প্রজাপতির এ দৃশ্য দেখে আমার হীনমন্যতা কেটে যায়। আমি আবার নব উদ্যমে পঁচা মাছ কেনার জন্য বাজারে যাই। সুনয়না হয়তো দু’একটা ভালো মাছ বেছে রেখে বাকী সব ড্রেনে ফেলে দেয় কিন্তু আমার আর তা জানা হয় না।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন