মরুভূমি ছাড়া হয় কি মরুদ্যান?

গ্রেফতারকৃত শীর্ষ চার জামায়াত নেতাকে ঈদের আগে মুক্তি না দিলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা উড়িয়ে দেয়ার হুমকি  দিয়ে আইন কমিশনের ঠিকানায় গত ২৫ আগস্ট ইমেইলই আসে। ৫টি দিন পর ইমেইলটি কর্তৃপক্ষের নজর কাড়তে সক্ষম হয় এবং উড়ো খবরটি আজ পত্রপত্রিকায় গুরুত্বপূর্ণ শিরোনাম হয়ে যায়। এ ঘটনার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে পত্রিকার রিপোর্টে জানা গেছে।  ই-মেইলের হুমকির ধরণেই বোঝা যায় খুবই সাধারণ মানের কম্পিউটার ব্যবহারকারী মেইলটি প্রেরণ করেছে, বিশেষ করে ইংরেজীতে তার দূর্বলতা আছে আবার রোমান হরফে বাংলায় লেখা ইমেইল দেখে বাংলায় ইমেইল লেখায় তার অজ্ঞতাও ধরা পরে । চেষ্টা চালালে প্রশাসন হয়তো দু’একদিনের মাঝে হুমকিদাতার নাগালও পেয়ে যাবে যদি না সরকার দলীয় কোন সমর্থক ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের জন্যকাজটি  না করে থাকে। কিন্তু ইমেইলটি যদি সত্যিকার অর্থেই গুরুত্বপূর্ণ হতো, আসলেই যদি ইমেইলের হুমকি সম্পর্কে হুমকিদাতা শতভাগ আন্তরিক হতো এবং তেমন শক্তিধর হতো তবে হয়তো ইতোমধ্যেই বিপর্যয়কর কিছু ঘটে যেতে পারত। আশ্চর্য বিষয় এই যে, যে ইমেইলটিকে খুবই গুরুত্ব দিয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থাকে জোরদার করা হলো, পত্র-পত্রিকার শিরোনাম বানানো হলো অথচ সে ইমেইলটি নজরে আসতে ৫টি দিন সময় লেগে গেল? সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এহেন দায়িত্বহীনতা অবশ্যই নিন্দনীয় এবং সরকারী আমলা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের টেলিফোন, চিঠিপত্র, ইমেইল কিভাগে ব্যবহার করতে হয়, কতটুকু গুরুত্ব দিতে হয় তা শেখানো উচিত, নচেত একটা দূর্ঘটা ঘটে যাওয়ার ৫ দিন পর যদি হুমকির চিঠিপত্র উদ্ঘাটিত হয় তবে দেশবাসীর লজ্জার সীমা থাকবে না।

ষড়যন্ত্রটি বেশ পুরণো। একটি মিথ্যে শতবার বললে তা সত্যের মতোই বিশ্বাসযোগ্য হয়, এ অনেক পুরণো কৌশল। ঠিক তেমনি এ দেশে যে কোন ঘটনা ঘটলেই তার সাথে প্রথমেই জামায়াতে ইসলামীর নামটি জুড়ে দেয়ার রেওয়াজ আছে। অবশ্যই ঘটনাটি তদন্ত যত এগিয়ে যেতে থাকে জামায়াতের নাম লু্প্ত হতে থাকে এবং পরিসমাপ্তিতে জামায়াতের দূরতম কোন সংশ্লিষ্টতাও খুঁজে পাওয়া যায় না। রাশেদ খান মেননকে গুলি করা হলো, তিনি নিজেও হয়তো জানতেন কারা গুলি করেছে, কিন্তু প্রথমেই জামায়াতের নামটি বলা হলো, এবং জামায়াতকে কিছুদিন দৌড়ের উপর রেখে ছেড়ে দেয়া হলো। ঠিক তেমনি দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, রমনা বটমূলের হত্যাকান্ড, উদীচী হত্যাকান্ড, মাজারে বোমা হামলা, সিনেমা হলে বোমা হামলা, এমন কোন ঘটনা নেই যার সাথে প্রথমে জামায়াতে ইসলামীকে জড়ানো হয় নি। তবে শেষ পর্যন্ত জামায়াতের নামটি আর ধোপে টেকে না, ঘটনার যত তদন্ত হয়, প্রকৃত অপরাধীরা বেরিয়ে পড়ে এবং জামায়াতে ইসলামীর নামটি মামলা থেকে বিলুপ্ত হয়। কিন্তু যে কাজটি মূলত রাজনৈতিক দলগুলো করতে চায় তা ষোলআনাই সফল হয়ে যায়। তারা জেনে শুনেই জামায়াতে ইসলামীর ঘাড়ে দোষগুলো চাপিয়ে দেয় সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য, এবং সবাই জানে একটি ঘটনার প্রথমে মানুষের যতটা আগ্রহ থাকে শেষমেশ আর অত আগ্রহ থাকে না, তাই মানুষ জামায়াতকেই অপরাধী হিসেবে জেনে নেয়, ঘটনার শেষে জামাত যে নির্দোষ প্রমাণিত হয় তা আর কারো চোখে পড়ে না। মজার ব্যাপার হলো পরবর্তীতে যদি কখনো কোন কাজে জামায়াতকে ফাঁসানোর প্রয়োজন পড়ে তবে পুরণো ঐসব মিথ্যে পেপার কাটিং গুলো শুধু জনতার সামনে তুলে ধরলেই কাজ শেষ।

জামায়াতকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে প্রমাণের জন্য বারবার ওরা ফাঁদ পেতেছে। শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতারের আগ থেকেই মিডিয়াগুলো কল্পকাহিনী তৈরী করে রেখেছিল, কোথাও একটু এদিক ওদিক হলেও জামায়াতকে একহাত দেখে নেয়ার জন্য। ধারণা করেছিল শীর্ষ নেতাদের মুক্তির জন্য জামাত-শিবির দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করবে, কিন্তু তা হয় নি। জামাত শিবির যেখানেই মিছিল করেছে তাকে জঙ্গী মিছিল নাম দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। পুলিশ পিটিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে জেলে পুরেছে আর মিডিয়া সংবাদ প্রকাশ করেছে শিবির পিটিয়ে পুলিশকে আহত করেছে। মিডিয়া বলছে জামাত শিবির অর্থমন্ত্রীর বাড়ীতে হামলা করেছে, পুলিশ বলেছে এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, পুলিশের ধাওয়া খেয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় দু’একটি ঢিল লেগে যেতে পারে। কোন ভাবেই জামাতকে সন্ত্রাসে জড়াতে না পেরে এবার ইমেইলের মাধ্যমে ফালতু হুমকি দিয়ে জামায়াতের নামে দূর্ণাম রটানো হচ্ছে। কিন্তু মিডিয়া ও সরকাকের সকল প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে জামাত শান্তির পথ আকড়ে থাকতেই বন্ধপরিক বলেই প্রমাণিত হয়েছে।

জামাত কি চায়? অবশ্যই বাংলাদেশে কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে একটি ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু সাধারণ প্রতিষ্ঠিত মতবাদগুলোর পরিবর্তে ভিন্ন কোন মতবাদ কিংবা রাজনৈতিক দর্শন প্রতিষ্ঠিত করার ঐতিহাসিক পদ্ধতি হলো বিপ্লব। চীনে মাও সে তুং এর বিপ্লব, রাশিয়ায় লেনিনের বিপ্লব, ইরানে খোমেনীর বিপ্লব, সবক্ষেত্রেই কিন্তু একটিই পথ তথা বিপ্লব দেখা যায়। এবং বলাই বাহুল্য কোনটিই বিনা রক্তপাতে সংঘটিত হয় নি। কিন্তু এতসব দৃষ্টান্ত থাকার পরও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে ইসলামী সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত রক্তাক্ত বিপ্লবের পথকে পরিহার করে শুধুমাত্র প্রচলিত গণতান্ত্রিক পন্থায়। আর এ ক্ষেত্রেই বিশ্বের অনেক দেশের ইসলামী সংগঠন এবং বিপ্লবী দলগুলো থেকে জামায়াত স্বতন্ত্র অবস্থানে রয়েছে।  বার বার জামায়াতে ইসলামীকে জঙ্গী সংগঠন হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা হয়েছে, প্রতিনিয়ত রেডিও-টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকায় জামায়াতের নিন্দাবাদে মুখর হয়েছে তবুও জামায়াতে ইসলামীকে গণতান্ত্রিক পথ থেকে হঠানো যায় নি। এমনকি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার জামায়াতকে পিটিয়ে পিটিয়ে কোনঠাসা করেছে, হাজার হাজার নেতা কর্মীকে কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছে, আজো তেমনি দলটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দসহ শত শত নেতা-কর্মীকে কারাগারে নির্যাতন চালানো হচ্ছে। সরকার আশা করে জামায়াতে ইসলামী কোনঠাসা বেড়ালের মতো ফোঁস করে উঠবে এবং জঙ্গী নাম দিয়ে তাদের চীরতরে মুলোচ্ছেদ করা হবে।

সকল অপপ্রচারের মাঝেও জামায়াতের একটি আকর্ষণীয় দিক হলো তারা প্রতি মূহুর্তে সতর্কতার সাথে পাতা ফাঁদগুলো এড়িয়ে যায়। শত নির্যাতন আর অপপ্রচার সত্ত্বেও তারা সযত্নে সন্ত্রাসের পথ পরিহার করে গণতন্ত্রের পথে নির্ভিকচিত্তে হেটে চলেছে। এটি বিরোধী শক্তির মনোযাতনার কারণও বটে। জামায়াত এতটাই কৌশলী সংগঠন যে মাঝে মাঝে মনে হয় দলটি আন্দোলনের জন্য কৌশল করে না বরং কৌশলের জন্যই বুঝি তাদের আন্দোলন। কিন্তু এ কথা সত্য যে জামায়াত আজ ধীরে ধীরে যেভাবে সাধারণ মানুষের মাঝে জনপ্রিয় সংগঠনে পরিণত হচ্ছে তার পেছনে এ কৌশলের বিকল্পও ছিল না। কারন অন্যান্য সংগঠনের মতো সন্ত্রাসকে উপজীব্য করে নিলে জামায়াতের পরিণতি জাসদ কিংবা সর্বহারা দলগুলোর মতোই হতো। আসলে সন্ত্রাস আর ইসলাম কখনোই সমার্থক নয় এবং এ কারণেই জামায়াতে ইসলামী প্রতিমুহূর্তে সন্ত্রাসকে সযত্নে এড়িয়ে গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে চলেছে।

নির্যাতনই শেষ কথা নয়। নির্যাতনে নির্যাতনে সত্যের গতি রোধ করা যায় না রমজানের এ পবিত্র মাসটি তারই স্বাক্ষী। ১৭ রমজান মাত্র ৩১৩ জন সত্যের পথের নির্ভিক সৈনিক রুখে দাড়িয়েছিল সারা বিশ্বের বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে। ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করার সে যড়যন্ত্র সেদিন করেছিল আবুজেহেল আবু লাহাবের দল কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে তাদের সকল দম্ভ ষড়যন্ত্র আর অত্যাচারী হাত। আওয়ামী লীগের এ অত্যাচার নির্যাতনও চিরস্থায়ী কোন বিষয় নয়। সব অত্যাচারেরই শেষ আছে, সব অত্যাচারীরই ধ্বংশ আছে, আর সে ধ্বংসস্তুপের মাঝে সত্যের ঝান্ডা উড্ডয়নে আল্লাহ ইসলামী আন্দোলনকে অবশ্যই টিকিয়ে রাখবেন।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“মরুভূমি ছাড়া হয় কি মরুদ্যান?” লেখাটিতে একটি মন্তব্য

  1. মামুনুর রশিদ বলেছেন:

    NO NEVER. হতেই পারে না । কারণ এ জমিন আল্লাহর। এ ধরায় আল্লাহ প্রেমিকরাই সম্মানের সাথে মাথা উচু করে সত্যের ঝান্ডা তুলে রাখবে ইনশাআল্লাহ। মুসলিম ভাইয়েরা সাহস নিয়ে এগিয়ে চলুন…..। আরিফ ভাইরা বোধ হয় জানেন না বাবরি মসজিদ ধংসকারী ১ম এব ২য় কুঠার যারা মেরেছিলেন বাবরী মসজিদের দেয়ালে তারা দুজনেই কয়েকদিনের মধ্যেই পাগল হয়ে গেছেন। আরিফ ভাইরা যেন এসব খবরা খবরও একটু রাখেন। যারা ইসলামের পক্ষে তারা আল্লাহর উপর ভরসা করে সঠিক তথ্য ইন্টারনেরটে দিয়ে যান। আল্লাহ হাফিজ।।

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন