শ্রমিক নেতা শ্রমিকের পেটে লাথি দিতে পারে না

মামা বাড়িতে এলেন।
চৈত্রের কাঠ ফাটা রোদ্দুরকে মাথায় নিতে ঠিক দুপুর বেলা রিক্সায় করে থামলেন আমাদের বাসার সামনে।
বিশিষ্ট শ্রমিক নেতা আমার এই মামা। শ্রমিক নেতা না হয়ে ফিল্মের নায়ক হলে বেশি মানাতো। দুধে আলতা দিলে কেমন হয় জানি না তবে এত সুন্দর গায়ের রঙ আশে পাশের দু’চার দশ গ্রামে কেউ দেখেছে কিনা আমার জানা নেই। সবার কাছে রাঙা ভাই নামে তিনি পরিচিত।
খুলনায় বিআইডবি্লউটএি-তে চাকরী করেন মামা, আগে বরিশালে ছিলেন। অসম্ভব জনপ্রিয় শ্রমিক নেতা। শ্রমিক আন্দোলনের এতো ব্যস্ত নেতা যে ঠিকমতো বাসায় ফেরারও সুযোগ পান না, বাজার ঘাট করার সুযোগ পান না।
অসম্ভব যোগ্যতা সম্পন্ন নেতা, অনেক বার তাকে প্রমোশনের সুযোগ দেয়া হয়েছে, প্রতিবারই প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি।
না, অবৈধ কোন লোভের জন্য তিনি শ্রমিক নেতা হয়ে বাঁচতে চান নি, তার শ্রমিক ভাইয়েরাই তাকে আগলে রেখেছে তাদের মাঝে, অফিসার হয়ে দূরে সরে যাওয়ার সুযোগ দেয় নি। আর তালুকদার বাড়ীর বড়ো ছেলে, জায়গা-জমিন যা আছে তাতে চাকুরি করাটা খুব একটা আবশ্যকও ছিলনা তার জন্য।
প্রচন্ড রোদ মাথায় করে বাসায় কড়া নাড়লেন মামা। মাতো মামাকে দেখে দিশেহারা, কি করবেন, কি খাওয়াবেন কোথায় বসাবেন সে এক হুলস্থুল ব্যাপার।
মামা বললেন, আগে পানি খাওয়া।
মা ছুটে গেলেন রান্না ঘরে। আমাদের গাছেরই কিছু ডাব পেড়ে খেয়েছিলাম আর একটা অবশিষ্ট ছিল। মা তাড়াতাড়ি ডাবটা কেটে মামাকে দিলেন।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে মামা ডাবটা তুলে দিলেন রিক্সাওয়ালার হাতে। রিক্সাওয়ালা তৃপ্তিসহকারে বুক ভিজিয়ে ডাবের পানি খেলেন আর মামা গভীর আবেগ নিয়ে চেয়ে চেয়ে দেখলেন।
পরে মা প্রচন্ড রাগে মামাকে বললেন, এতো রৌদে এলেন, ডাবটা দিলাম আপনারে খাইতে আর আপনি কাজটা কি করলেন?
মামা হেসে বলেন, আরে আমি কি জীবনে ডাব কম খাইছি, বেচারা এই রৌদে সারাটা পথ আমাকে টেনে নিয়ে এলো আর আমি ওকে না দিয়ে ডাব কি করে খাব। মামার এ মহানুভবতায় আমরা সবাই অবাক হয়ে যাই।
মামা এমন কাজ মাঝে মধ্যেই করেন।
ভিখারী এসে মামাকে বললেন, রাঙা মিয়া, একটা লুঙ্গি দিবা, পড়নের লিঙ্গুডার কি হাল হইছে দেখ।
মামা ঘরে যেতে তার পরনের নতুন লুঙিটা খুলে এনে দিয়েদিলেন ভিখেরিকে।
তার এ মহানুভবতার জন্য তাকে কম কথা শুনতে হয়নি। কিন্তু তিনি হাসিমুখে সব কথা উড়িয়ে দিয়েছেন, কাজ করে গেছেন শ্রমিকের কল্যাণে। আর সবাই যা করুক, তিনি তো শ্রমিকের কষ্টে বসে থাকতে পারেন না। তিনি যে শ্রমিক নেতা।
ছোট সময় মামার এ ধরণের খেয়ালীপনা দেখে হাসাহাসি করলেও এখন বুঝি একজন শ্রমিক নেতা কখনো শ্রমিকের অমঙ্গল চাইতে পারে না, শ্রমিকের ক্ষতি হয় এমন কাজ করতে পারে না। যে কারখানায় শ্রমিক ঘাম ঝড়ায়, সে কারখানা থেকে শ্রমিকের ন্যায্য দাবী আদায় করার দায়িত্ব শ্রমিক নেতার।
কিন্তু অশুভ কোন ইঙ্গিতে, অবৈধ টাকার লোভে, আবাসিক এলাকায় বিলাশবহুল বাড়ির মালিক হওয়ার প্রলোভনে, শ্রমিকদের কল্যাণের নামে তাদের রুটি রুজির পথ চীরতরে বন্ধ করে দেয়া আর যাই হোক কোন শ্রমিক নেতার কাজ হতে পারে না।
শ্রমিক ভাইদের উচিত, কে তাদের প্রকৃত নেতা আর কে নেতার ছদ্মাবরণে তাদের রুটি রুজির পথ বন্ধ করতে চায় তা চিনে নেয়া, তাদের মুখোশে আগুন লাগিয়ে দেয়া।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন