রমজানের শিক্ষায় ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ হোক

খুব চমকপ্রদ একটি খবর বেশ কয়েকটি পত্রিকায় সম্প্রতি প্রকাশিত হয়। ভাবতে অবাক লাগে বাংলাদেশে ২৩ হাজারেরও বেশী বৈধ কোটিপতি রয়েছেন, অন্তত বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব সে কথারই স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত কোটিপতির সংখ্যা ছিল মাত্র ৪৭ জন। নামে বেনামে দেশী বিদেশী বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাবধারীদের প্রকৃত সংখ্যাটি প্রকাশিত হলে নিঃসন্দেহে কোটিপতিদের সংখ্যা অরো অনেক বেড়ে যাবে। ফকির-মিসকিনের দেশ বলে যারা এতদিন বাংলাদেশীদের ক্ষেপাতো তাদেরকে অন্তত এ সংবাদটি দেখিয়ে কিছুটা হলেও গর্ব করা যেতে পারে। অবশ্য যারা ইতোমধ্যেই গর্বে বুক ফুলিয়ে ফেলেছেন তাদের জন্য একটি দুঃসংবাদ আছে। দেশের অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি আন্ত:মন্ত্রনালয়ের এক মিটিংয়ে বাংলাদেশে ভিক্ষুকের সংখ্যা ৭ লাখ বলে তথ্য প্রকাশ করেন, অর্থাৎ প্রতি দু’শ জনে একজন করে ভিক্ষুকের বাস এ দেশে। কি আশ্চর্য, দু’শ লোক মিলেও একজন ভিক্ষুকের ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ করতে পারছি না আমরা। মড়ার উপরে খাড়ার ঘা হিসেবে আরো দুঃসংবাদ আছে বাংলাদেশের জন্য। দেশে ৫ কোটি কর্মক্ষম লোকই বেকার অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৪০% বেকারত্বের অভিষাপ নিয়ে বসে আছে। বলাই বাহুল্য ‘৭৫ পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে দেশে পুঁজিবাদ ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয় এবং এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট, দেশে বিদ্যুৎগতিতে ধনী ও দরিদ্রের মাঝে বৈষম্য বাড়ছে এবং সমাজের চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীটি ধীরে ধীরে এ দু’শ্রেণীর মাঝে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

আবার মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বেকার সমস্যাটির তাৎক্ষণিক যদি কোন সমাধান নাই করা যায় অন্তত ভিক্ষাবৃত্তিকে ইচ্ছে করলে এক বছরেই নির্মূল করা সম্ভব। যদিও ৭ লাখ ভিক্ষুদের কথা বলা হচ্ছে, তবে এর মাঝে ঝাচাই বাছাই করলে প্রকৃত ভিক্ষুকের সংখ্যা হয়তো কিছুটা কমতে পারে, বিশেষ করে ভিক্ষাবৃত্তিকে লাভজনক ও সহজ পেশা হিসেবে অনেকেই বেছে নিয়েছে। এসব শখের ভিক্ষুকদের বাদ দিয়ে বাকীদের মধ্য থেকে যদি প্রতি কোটিপতি মাত্র ২০ জনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন তবে ভিক্ষাবৃত্তিকে নিবৃত করা খুব সহজেই সম্ভব। হ্যা, ভিক্ষুকদের মাঝে এমন অনেকেই আছে যারা শারীরিকভাবে একেবারেই অক্ষম।এদের কিছু লোককে হয়তো কোনভাবেই কর্মক্ষম করা অসম্ভব, এদেরকে সাহায্য করা আমাদের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব।  তবে বাকীরা যে একটু সহযোগিতা পেলে ভিক্ষাবৃত্তির বদলে শ্রম দিয়ে নিজের প্রয়োজনীয় উপার্জন করতে সক্ষম তা দেশের বিভিন্নস্থানে অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়।

দেশের দক্ষিণাঞ্চল বরিশালের প্রবেশ মুখে দোয়ারিকা এবং শিকারপুরে ফেরীঘাটে এমন কিছু নজীর আমি নিজেও চাক্ষুষ করেছি। হোসেন মোল্লা নামের একজন আয়ুর্বেদ চিকিৎসক যিনি নিজে একসময় হাটে বাজারে মলম বিক্রি করে বিখ্যাত হয়েছেন তার প্রতিষ্ঠিত হোসেন মোল্লা এন্ড কোং এর পণ্য বিক্রি করতে দেখেছি অসংখ্য শারীরিকভাবে অক্ষমদের, যাদের অনেকের চোখে দৃষ্টি নেই, অনেকের হাত নেই, পা নেই তবু মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার ইচ্ছেশক্তির এতটুকু কমতি নেই।  ইচ্ছে শক্তি থাকলে যে কোন প্রতিকূলতাকেই জয় করা যায়, প্রয়োজন শুধু একটু সহযোগিতা। এইতো কিছুদিন আগে আফ্রিকার পর্বতশৃংগ কিলিমানজারো জয় করেছেন যুদ্ধাহত পঙ্গু সেনারা। বাংলাদেশের পথে প্রান্তরেও তেমনি দেখা যায় অনেক পঙ্গু রিক্সাওয়ালা, দোকানদার, বিভিন্ন পেশার মানুষ যারা শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে তুচ্ছ করে সম্মানের সাথে বাঁচতে শিখেছেন। সিআরপিতে টেবিলে বুকে ভর দিয়ে অফিসের কাজ করেন এমন এক নারীর একটি ভিডিও ফুটেজও দেখেছিলাম বেশ অনেক আগে। এভাবে অসহায় এসব মানুষের পাশে হৃদয়বান সচেতন মানুষেরা দাড়িয়েছেন, এদের অনেকেরই হয়তো পুঁজি সংগ্রহের সুযোগ হয়েছে। কিন্তু জঠরজ্বালা নিবৃত করার মতো নূন্যতম পুঁজি যাদের নেই তারা নিতান্ত বাধ্য হয়েই ভিক্ষেকে পেশা হিসেবে বেঁছে নেয়, এবং অবশ্যই তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার স্বপ্ন দেখে, সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। আসলে শখের বসে কেউ ভিক্ষে করতে চায় না, তবে ভিক্ষে করতে করতে অভ্যেস হয়ে গেলে হয়তো পরবর্তীতে এ লাভজনক পেশাকে কেউ কেউ ছাড়তে চায় না, তবে তাদের সংখ্যা নেহায়েতই কম।

একবার ভাবুন তো সেই সব শিশুদের কথা যারা ডাস্টবীন ঘেটে ঘেটে কাক আর কুকুরের সাথে কাড়াকাড়ি করে খাবার সংগ্রহ করে। যারা সমাজের পংকিলতা এড়িয়ে চলেন, সমাজের ভদ্রপল্লির বাইরে যাদের বিচরণ নেই তারা হয়তো এসব কথাকে নিছক বাড়াবাড়ি বলে মনে করবেন, তবে আমি নিজে বারবার মুখোমুখি হয়েছি এসব রূঢ় বাস্তবতার সাথে। মুখোমুখি হয়েছি এসব ময়লা ঘাটা নিরন্ন মানুষের সাথে ঢাকা মহানগরীর রাজপথে, দেখেছি এদের মাঝারী মানের শহরে, দেখেছি মফস্বল শহরেও। এসব অসহায় মানুষগুলো তো আমাদেরই কারো ভাই, কোন, বাবা-মা, সন্তান। তাহলে তাদের দেখে আমাদের হৃদয় কেন আদ্র হয়ে ওঠে না? হ্যা, একখা সত্য যে, এসব মানুষেরা সাধারণত মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের চোখেই ধরা পরে, যাদের আদ্র হওয়ার মতো হৃদয় আছে কিন্তু চোখের জল মোছানোর মতো, অভুক্ত মুখে হাসি ফোটানোর মতো পর্যাপ্ত অর্থকড়ি সামর্থ নেই। আর যাদের ক্ষমতা আছে, অর্থবল আছে, হাজারো প্রতিবন্ধকতা ছিন্ন করে তাদের দুয়ারে কড়া নাড়ার মতো শক্তি আর সাহস নেই অসহায় মানুষের।

প্রতি বছর রমজান আসে, বাজারে আগুন ধরিয়ে আবার চলেও যায়। ভোররাতে নানান ব্যঞ্জনের সেহরী, ইফতারিতে হাজারো রেসিপি, কিছুতেই ক্ষুধা ঘেষতে পারে না অভিজাত মানুষের কাছে। ক্ষুধার্ত মানুষের কষ্টের রংও তাই  কিছুতেই ধরা পড়েনা তাদের চোখে। রমজান আসে, ইফতারের রাজনীতি আসে, দেশে বিদেশে শপিংয়ের উৎসব চলে, চলে তেলে মাথায় তেল ঢালার তীব্র প্রতিযোগিতা, অবশেষে কোলাকুলি, গলাগলির ঈদ মোবারক। অথচ একটিবারও যদি আমরা রোজার প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারতাম, একবারও যদি সাধারণ মানুষের ক্ষুধার যন্ত্রণার তীব্রতা অনুভব করতে পারতাম, একবারও যদি ভাবতে পারতাম, ওদের জন্যও আমার কিছু করার আছে, ওদের পাশে দাড়ানোর দায়িত্ব আছে তাহলেও আগামী রমজানে ৭ লাভ ভিক্ষুকের কোন অস্তিত্ব থাকতে পারতো কি? আশাকরি যাদের সামর্থ আছে তারা এগিয়ে আসবেন বাংলাদেশকে ভিক্ষামুক্ত করার ব্রত নিয়ে, আর যাদের সামর্থ নেই, তাদের কাছে অনুরোধ, আপনার অন্তত এসব ভিক্ষুকের বায়োডাটা সংগ্রহ করুন, আর জেনে নিন তার নিকটাত্মীয় কোটিপতির নাম ঠিকানা। মাত্র দশটি টাকা খরচ করে “এই ভিক্ষুক অমুক কোটিপতির নিকটাত্মীয়” কথাটি কাগজে লিখে ভিক্ষুকটিকে দান করুন। ভিক্ষুক পরিবারের কোটিপতি সদস্যরা তাতে কি এতটুকু লজ্জিত হবেন না?

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“রমজানের শিক্ষায় ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ হোক” লেখাটিতে একটি মন্তব্য

  1. abhimani বলেছেন:

    Excelent article.Why do u not maintain continuity?

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন