বেশ্যার সামাজিকায়ন

রাষ্ট্র বড়, নাকি সমাজ বড় এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা হতে পারে, তবে সমাজই মানবজাতির সত্যিকারের অবস্থানকে তুলে ধরে তা বোধ হয় কেউই অস্বীকার করবেন না। সমাজের প্রচলিত প্রথf, রীতি-নীতি, বিশ্বাস ধীরে ধীরে আইনে পরিণত হয়, আবার আইন করে সমাজের কোন কোন প্রথাকে বিলুপ্ত করা হয়। তবে যে রাষ্ট্রের নীতি সমাজের প্রচলিত রীতি নীতি বিরুদ্ধ সে রাষ্ট্রে আর যা-ই হোক, শান্তি আসতে পারে না, স্বস্তি থাকতে পারে না। তাই রাষ্ট্র যখন কোন নতুন কিছু নাগরিকদের উপর চাপিয়ে দিতে চায় তখন তা সমাজের মানুষের মাঝে আগে ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালানো হয় যাতে সমাজ তাকে সহজে গ্রহণ করে। সমাজের কাছে গ্রহণীয় না হলে কোন আইনই সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ হতে পারে না, আর যদি বা বাস্তবায়িত হয় তার জন্য যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হয়, সমাজটাকে বদলে দিতে হয়। তবে সমাজটাকে রাতারাতি বদলানো যায় না, একটু একটু করে দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় তা হয়তো বদলানো যায়, তবে সমাজ ইচ্ছে করলে এর চেয়ে সহজে রাষ্ট্রের প্রশাসনযন্ত্রকে বদলাতে পারে।

সমাজের সব কিছুই যে ভালো তা নয়, সব বদলানোর প্রয়োজন হয় না। আবার রাষ্ট্র যত আইন করে সবই যে মানবজাতির জন্য কল্যাণকর তা নয়। সমাজের অসংগতিগুলো দূর করে সমাজকে কলুষমুক্ত করার জন্য সমাজপতিরাই রাষ্ট্রযন্ত্র তৈরী করে যাতে নাগরিকসুবিধা বৃদ্ধিপায়, মানবতার কল্যাণ হয়। কিন্তু সবসময় সাধারণ মানুষের আশা আকাঙ্খার প্রদিফলন রাষ্ট্র করতে সফল হয় না। বেশ কিছু বছর যাবত এমনই একটি অপতৎপরতা চলছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যাকে অনুমোদন করে না, বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা যা স্বীকৃতি দেয় না সে ধরণের একটি সামাজিক ব্যাধিকে সামাজিকায়ন করার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চলছে কয়েক যুগ ধরে বাংলাদেশে।

বাংলাদেশ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের দেশ। শতকরা ৯০ ভাগ জনসংখ্যা ইসলামী ঈমান আকিদাকে ধারণ করে। বাকী যে দশভাগ অন্য ধর্মাবলম্বীর বাস, তারাও শালীনভাবে চলাফেরায় অভ্যস্ত। তবে এর বাইরে সব সমাজের মতো এখানেও কিছু ব্যতিক্রম আছে। কিছু লোক সব সময়ই স্রোতের বিপরীতে চলা পছন্দ করে, অন্যায়কে ভালোবাসে, অশ্লীলতাকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বলে মনে করে। অনৈতিকতার পংকিলতায় এদের সমস্ত জীবন কালিমালিপ্ত করে রেখেছে। বাংলাদেশের কিছু কিছু অঞ্চলে তাই এরা গড়ে তুলেছে সমাজ বিধ্বংসী নীতি নৈতিকতা বিবর্জিত বেশ্যালয়। বাংলাদেশে স্থায়ী ১৪টি বেশ্যালয়ে ১৫ হাজারের মতো বেশ্যা রয়েছে, আর বেশ্যালয়ের বাইরে সংঘবন্ধ বা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বেশ্যার সংখ্যা এক লাখেরও বেশী। অবাক করা ব্যাপার এই যে এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বেশ্যালয়টি বৃহত্তর ফরিদপুরের দৌলতদিয়ায় অবস্থিত, আছে ফরিদপুরের অন্যান্য স্থানেও, শহরের রথখোলায়,আছে মাদারীপুরের পুরাণবাজারে, আছে আওয়ামী লীগ অধুষ্যিত অঞ্চলগুলোতে । বেশ্যাবৃত্তির সাথে ধর্মনিরপেক্ষতার একটি স্থায়ী সর্ম্পর্ক হয়তো আছে কেননা ধর্মনিরপেক্ষতার জয়জয়কার বৃহত্তর ফরিদপুরে, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মহীনতা আর অশ্লীলতার সূতিকাগার বৃহত্তর ফরিদপুর। তবুও সমাজ এখনও বেশ্যাকে বেশ্যা হিসেবেই দেখে, সমাজের পঁচে যাওয়া একটি অংশ হিসেবেই গণ্য করে, এদেরকে সামাজিকভাবে স্কীকৃতি দেয়ার মতো নিলর্জ এখনও বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষ হতে পারে নি।

কিন্তু এবার ফরিদপুর থেকে উঠে আসা ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মহীন ও অশ্লীলতার লালগকারীদের সরকার বেশ্যাকে সামাজিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বেশ্যাদের জাতীয় পরিচয়পত্রে ওদের পেশা হিসেব ‘যৌনকর্মী’ লেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে র্নিবাচন কমিশন। বেশ্যাদের আইনী অধিকার সংরক্ষণের জন্য আগে থেকেই বেশ কিছু এনজিও কাজ করে চলেছে, যদিও আইনত বেশ্যাবৃত্তি বৈধ নয়। কিছুদিন আগে ভারতের সুপ্রীম কোর্ট বেশ্যাবৃত্তিকে বৈধ করার পরামর্শ দেয়, যৌনকর্মীর টাকায় পরিবারের দেখভাল নয় কেন, কলকাতা হাইকোর্টে রীট জারি করা হয়। তাই ভারতের আশীর্বাদপুষ্ট আওয়ামী সরকার বেশ্যাদের সামাজিক মর্যাদা দেয়াকে তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা  মনে করছে। আগেই বলেছি যেসক স্থানে বেশ্যালয় আছে সেসব আসন আওয়ামী লীগের স্থায়ী ঘাটি, এমনকি ওসব স্থানে কলাগাছকে নৌকা প্রতীকে দাড় করিয়ে দিলেও পাশ হয়ে যাবে বলে কথিত আছে। তাই পুরো দেশটাই যদি বেশ্যালয়ে পরিণত হয়, দেশের মেয়েরা যদি নিজেদেরকে বেশ্যা বলে গর্বকরে চলতে পারে রাস্তাঘাটে তাহলে আওয়ামী লীগ ঘোষিত ঘরে ঘরে কর্মসংস্থানের ঘোষণাও পূর্ণ হয়, আর আওয়ামী লীগের নির্বাচনী আসনও পাকাপোক্ত হয়।

কিন্তু দেশবাসী এখনও বেশ্যাকে বেশ্যাই ভাবে, যৌনকর্মী নয়। বাংলাদেশ বেশ্যার দেশ নয়, দালালরা ক্ষমতায় থাকলেই দেশটা বেশ্যালয় হয়ে যাবে এমনটা ভাবা অবান্তর। তাই যে কোন মূল্যে বেশ্যাদের সামাজিক মর্যাদা দিয়ে সমাজকে কলুষিত করার আওয়ামী মহাযজ্ঞ রুখে দিতে সবাইকে এখনই সচেতনভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন