শ্রমিক অসন্তোষ, শ্রমবাজারে ধস আর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ : অভিন্ন ষড়যন্ত্রের ফল

বেশ কিছু দিন ধরেই অরাজক পরিস্থিত প্রত্যক্ষ করেছে দেশবাসী। বিশৈষ করে এমন কয়েকটি সেক্টরকে অপশক্তিরা টার্গেট করেছে, যার মাঝেই বাংলাদেশের প্রাণ ভোমরা কোনক্রমে টিকে আছে। হতদরিদ্র একটি দেশে হাজারো অব্যবস্থাপনার মাঝেও  খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের টিকে থাকার নিরন্তন সংগ্রামে তিলে তিলে করে গড়ে উঠেছে এ সেক্টরগুলো। এর একটি তৈরী পোষাক শিল্প, আরেকটি শ্রমবাজার। বাংলাদেশ আজ বহির্বিশ্বে গর্ব করে এসব সেক্টর নিয়ে। তবে “সুখে থাকতে ভুতে কিলায়” বলে গ্রামে যে প্রবাদটি চালু আছে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা এখন শতভাগ সত্য। বাংলাদেশের প্রাণভোমরা হত্যার ষড়যন্ত্রে নেমেছে দেশী বিদেশী চক্র। ক্রমই অশান্ত হয়ে উঠছে গার্মেন্টস শিল্প, শ্রমবাজারে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশীরা হারাচ্ছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা।

তৈরী পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ অন্যান্য প্রতিযোগিদের চেয়ে শক্ত অবস্থানে অনেকদিন ধরেই। কয়েক বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের তৈরী পোশাক রপ্তানীতে ১১.৫% ধরে রেখেছে যেখানে ভারতের শেয়ার মাত্র ৪.২%। একবছরে যেখানে ইউরোপের দেশগুলোতে বাংলাদেশের তৈরী পোষাক রপ্তানীর হার ৩.৬% বৃদ্ধি পেয়েছে সেখানে ভারত, চীন ও তুরস্ক তাদের বাজার ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান সাফল্য বাংলাদেশকে প্রতিদ্বন্দী দেশগুলোর জন্য ইর্ষার কারণ হয়েছে বলে অনেকেরই ধারণা। তৈরী পোশাক শিল্পে সাম্প্রতিক নৈরাজ্য বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পকে ধ্বংসের জন্য বাইরের দেশগুলোর ইন্ধনে এদেশীয় দোসররা করেছে বলেই অনেকে মনে করেন। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাত থেকে অর্ডার তুলে নিয়েছে অনেক দেশের আমদানী কারক যা প্রতিদ্বন্দী দেশগুলোর অসুস্থ্য প্রতিযোগিতার সাফল্য বলেই মনে হয়। আর এ সকল কাজে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কাজ করে যাচ্ছে এদেশেরই কিছু বুদ্ধিজীবী, কলামিস্ট, গবেষক যাদের কাজ হলো বিদেশী পয়সায় বিদেশীদের জন্য গবেষণা করা যে গবেষণালব্ধ অস্ত্র বাংলাদেশের মেরুদন্ডকে গুড়িয়ে দেয়ার জন্যই ব্যবহৃত হয়।

হ্যা, এ কথা সত্য যে বাংলাদেশের শ্রমিকরা সবচেয়ে কম বেতন পায় প্রতিদ্বন্দী দেশগুলোর শ্রমিকদের চেয়ে। নিদ্বির্ধায় এ কথা বলা যায় যে সাধারণ শ্রমিকদের ঠকিয়ে অর্থের পাহাড় গড়ছেন নীতিনৈতিকতা ও মানবিকতার মূল্যবোধ বিবর্জিত ব্যবসায়ীবৃন্দ। অনেক গার্মেন্টসেই শ্রমিকের বেতনের দুশগুন বেশী মুনাফা পকেটে ঢুকান মালিকেরা। তাদের এহেন খামখেয়ালীর কারণে দিনরাত অমানুষিক শ্রম দিয়েও দু’বেলা পুষ্টিকর খাবার জুটাতে পারে না দরিদ্র গার্মেন্ট শ্রমিকেরা। তবে এ কথাও ভুলে গেলে চলে না যে শ্রমমূল্য কম হওয়ার কারণেই বাংলাদেশের শ্রমবাজার আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করতে পেরেছে, শতকোটি জনতার ভারতও যা পারে নি। কিন্তু এ নূন্যতম মজুরীর এ সমস্যাটিকে রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয় , বিশেষ করে শোষণে অভ্যস্ত বুর্জোয়ারা আন্দোলনের মুখে হুট করেই সভ্য হয়ে মানবতাবাদী হয়ে যাবে তা আশা করা যায় না। তেমনি এ ইস্যুকে পুঁজি করে পোশাক শিল্পকে অস্থিতিশীল করে বাজার হারানোর মতো আত্মঘাতি সিদ্ধান্তও সঠিক নয়। তৈরী পোশাক শিল্প টিকে থাকলে নূন্যতম মজুরীর দাবী ধাপে ধাপে হয়তো আদায় করা সম্ভব হবে কিন্তু বাইরের ইন্ধনে এক্ষুণি মজুরি সমস্যার সমাধান করতে হবে নয়তো তৈরী পোশাক শিল্প ধ্বংস করে দেব, যার জন্য খেসারত শ্রমিকদেরকেই বেশী দিতে হবে, মালিকপক্ষ ঠিকই কোন না কোন ভাবে আখের গুছিয়ে পালাবে। তাই দাবী আদায়ের নামে বাইরের শত্রুদের ক্রীড়নকের ভুমিকায় নেমে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ার মানসিকতা কারো জন্যই শুভ হবে না।

পাশাপাশি শ্রমবাজারের ক্ষেত্রেই বাংলাদেশকে নিয়ে চলছে নানাবিধ ষড়যন্ত্র। পার্শ্ববর্তী দেশ ২০২৫ সালে মাঝেই বিশ্বের ২৫% শ্রমবাজার দখলে নেয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, আর এক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রধান অন্তরায় হিসেবেই উঠে আসছে। তাই পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ধ্বংসে নেমেছে প্রতিদ্বন্দী দেশ। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই যে এক্ষেত্রে তারা বেছে নিয়েছে এদেশেরই সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক দলটিকে। ভারতের কূটনৈতিক সাফল্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাথে আতাতের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়ে একের পর এক এমন কিছু কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে যা বাংলাদেশের শ্রমবাজার হারানোর জন্য যথেষ্ট নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে। ইতোমধ্যেই বেশকিছু দেশ শ্রমিকদের ভিসা দেয়া বন্ধ করেছে, অনেক দেশই শ্রমিকদের ফেরত পাঠিয়েছে এবং চলতি অর্থবছরের শুরুতেই রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমে গেছে।  দুঃখের বিষয় এই যে, যেখানে বাংলাদেশে অর্থনীতি বলতে গেলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই ব্যক্তিউদ্যোগে গড়ে উঠেছে, যেখানে বাংলাদেশের অর্থনীতি টিকে আছে শ্রমজীবী মানুষের ঘামে, সেখানে শ্রমিকের কর্মসংস্থান যদি সরকারের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ মদদে ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ে তবে সে সরকার নামের জগদ্দল পাথরটিকে বয়ে বেড়ানোর আদৌ কোন মানে হয় কি?

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যেমন তৈরী পোষাক শিল্প ও শ্রমবাজার বাংলাদেশের প্রাণ, সামাজিক ক্ষেত্রে ঠিক তেমনি সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানের এ দেশে ধর্মীয় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বিশ্বে ইর্ষণীয় ইতিহাস তৈরী করেছে। পার্শ্ববর্তী ভারতে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেয় সাম্প্রদায়িক সংঘাতে সেখানে শত শত সংখ্যালঘু মুসলিমদের প্রাণহাণি ঘটে সেখানে বাংলাদেশে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম হওয়ার পরও ধর্মীয় কারণে হিন্দুদের নির্যাতনের শিকার হওয়ার কোন নজীর নেই।

আমার বাড়ির সামনে মন্দির, প্রায় সারারাতই কোন না কোন কারণে কীর্ত্তণ লেগেই থাকে। মন্দিরের আশে পাশে হিন্দুবাড়ী মোটে চারটি, বাকী সবগুলো মুসলিম পরিবার। মন্দিরের সীমানার একশ গড়ের মাঝেই একটি জামে মসজিদ। অথচ এরপরও সারারাত ঢোলবাদ্য বাজিয়ে সারারাত কীর্ত্তন চললেও পাড়ার কেউ কখনো প্রতিবাদ করেনি বরং বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার পরে বিশ্বব্যাপী উত্তেজক পরিস্থিতিতেও পাড়াপরশি সবাই হিন্দুদের নিরাপত্তা দিয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে এবং এলাকার গণ্যমান্যদের পক্ষ থেকে মন্দির ও হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। আমরা যেমন হিন্দুদের ধর্মীয় কাজে কোন বাধা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছি না, ঠিক তেমনি তারাও মসজিদের জামায়াতের সময়সূচীর আপডেটেড তথ্য সংরক্ষণ করে আসছে এবং স্বউদ্যোগ জামায়াতের সময় ঢোলবাদ্য বন্ধ রাখছে। তবে ইদানিং তাদের এ সংযমে কিছুটা ভাটা পড়েছে বলে মনে হয়। কয়েকদিন আগে গ্রামের বাড়ী ঘুরে এসে দেখলাম মন্দিরের পুঁজারীরা আগের মতো নামাজ রোজার ব্যাপারে ততটা ছাড় দিতে তারা আর আগ্রহী নন। দেশেতো আর এখন রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম নেই, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, মুসলমানদের যেমন অধিকার আছে নামাজ পড়ার, তাদেরও অধিকার আছে ঢাক ঢোল বাজানোর, তাহলে আর ছাড় দেওয়া কেন? তবে এ কথা তাদের বুঝা উচিত ক্ষমতা থাকার পরও সংখ্যাগরিষ্ট যে মুসলিমরা তাদের পুঁজো পার্বনে সার্বিক সহায়তা দিল সংবিধান পরিবর্তনের সাথে সাথেই সেসব মুসলমানদের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টে উস্কানী দেয়া কতটুকু যৌক্তিক তা ভেবে দেখা উচিত।

বাংলাদেশ আমার দেশ, খেটে খাওয়া সাধারণ কুলি মজুর মুটে, চাষী, শ্রমজীবী মানুষের দেশ। এদেশটিকে স্বাধীন করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ময়দান গরম করা ছাড়া যেমন নেতাদের কোন অবদান নেই, দেশটিকে স্বাধীন করেছে সাধারণ বীর বাঙ্গালী, ঠিক তেমনি এ দেশের অর্থনীতিকে গড়তেও নেতাদের পানে তাকিয়ে থাকার কোন মানে নেই, দেশবাসীকেই জেগে উঠতে হবে। দেশবিরোধী সকল ষড়যন্ত্র শক্তহাতে মোকাবেলা করে, সাম্রাজ্যবাদের সকল দোষরদের মূলোৎপাটন করে শ্রমজীবী মেহনতী মানুষের কল্যাণে ঝাপিয়ে পড়তে হবে।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন