ছোটমা’র জন্য শুভকামনা

সুনয়না যেদিন লজ্জারাঙ্গা মুখটা আমার বুকের মাঝে লুকিয়ে চুপি চুপি ছোট মায়ের আগমন বার্তা জানালো সেদিন আমার মতো সুখী বোধহয় এ পৃথিবীতে কেই ছিল না। সেদিনের স্মৃতি আজো অম্লান হয়ে আছে, চিরদিন হৃদয় মুকুটে কোহিনুরের মতো উজ্জল হয়ে থাকবে।

নীরবে, নিভৃতে, দিনে রাতে যখনই আল্লাহকে ডেকেছি, কায়মনোবাক্যে তাঁর কাছে আমার ছোটমার জন্য প্রার্থনা করেছি, কেঁদেছি। বেশি কিছু চাইনি আমি, আমার ছোটমার চরিত্রে তিনটি গুণ দান করার জন্য আল্লাহর কাছে আর্জি করেছি। তাকওয়া, জ্ঞান আর ভালোবাসা। আর চেয়েছি বিকলাঙ্গতা থেকে নিস্তার। আল্লাহর কাছে এ চাওয়া পাওয়ার ভেতরে আমার কোন খাঁদ ছিলনা, তাই হয়তো আল্লাহও আমাকে বিমুখ করেন নি।

কত সপ্তাহ বয়সে ভ্রণের নড়নচড়ন টের পাওয়া যায়, আমার জানা নেই। কিন্তু আজো আমার মনে আছে, গত বছর পহেলা জুনে মাত্র সাড়ে তিন মাস বয়সেই অন্ধকার মাতৃজঠরে নড়ে ওঠে, খুবই ীণ, যেন ধ্যাণ ভেঙ্গে দূর্বল বুদ্ধ পা ফেললেন ভক্তের দেশে।

আমার আঙ্গিনায় ছোট মায়ের পা রাখার কথা ছিল ২৩ নভেম্বরে। ডাক্তার তাই বলেন। কিন্তুএই বুড়ো খোকাকে দেখার জন্য বুঝি আমার ছোট মায়ের আর তর সইলো না। ৯ নভেম্বর দুপুর ২টা ৩৬ মিনিটে আমার ঘর আলোয় আলোয় আলোয় ভরিয়ে দিতে ডাক্তারের হাত ধরে আসে আমার কোলে।

আমার শেষ প্রার্থণাটা পূরণ হয়েছে দেখে আমার এতো খুশি লাগলো যে মনে হলো পৃথিবীর সবচেয়ে ধনবান যদি আমি হতাম তবে একমুহূর্তে সব দান করে পথের ফকির হয়ে যেতেও আমার বাধতো না। বিকলাঙ্গতার অভিষাপ তাকে বন্দী করেনি, অন্য সবার মতোই স্বাভাবিক আছে এরচেয়ে আনন্দের আর কি আছে?

জ্ঞানও যে খারাপ হয়নি তার প্রমাণ পেলাম প্রথম রাতেই। প্রচন্ড ুধায় কান্নাকাটি করছিল ও । কান্ত শ্রান্ত সুনয়না এ্যানেসথেসিয়ার ঘোরে আচ্ছন্ন। আমি একটু একটু করে দুধ খাওয়াতে শুরু করলাম। আমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে চিনে নেয়ার চেষ্টা চালালো। বেশ কিছু সময় শান্ত হয়ে ছিল ও। আবার ওর কাছে যেতেই কান্না শুরু করে দিলো। অনেকেই ্ওর কাছে এসেছে কিন্তু কাঁদেনি, আমি আসায় কান্না শুরু। এ অল্প সময়েই ও বুঝে ফেলেছে আমার সামনে কান্না কাটি করলে খাবার মিলবে।

একটু বড় হতেই ছুটোছুটি বেড়ে গেল ্ওর। আমি থাকি ঢাকায় অনেক দূরে, আমার ছোট মা সুনয়নার সাথে পদ্মার ওপারে। একটেল এঙ্েিটর কল্যাণে কথা হয় বিরতীহীন। এর মাঝেই মোবাইল ধরা শিখে ফেলেছে ও। মুখের কাছে মোবাইল নিয়ে বিচিত্র শব্দে কথা বলার চেষ্টা চালায়। শত মাইল দূরে থেকেও আমি আমার ছোটমায়ের কথা শুনে ব্যকুল হয়ে যাই।

সাড়ে কিন মাস বয়সেই আব্বু ডাক দিয়ে শুরু করেছে তার কথা বলা। এখন পর্যন্ত গোটা পাঁচ ছয় শব্দ শিখেছে, তবে সবসময় আব্বু শব্দটাই মুখে লেগে থাকে। মজার ব্যাপার হলো, ঘুম থেকে ওটার সময় ডেকে ওঠে আব্বা বলে, বাকী সব সময়ে আব্বু ডাকই ওর প্রিয়। সেদিন ওকে বার বার আম্মু সোনা বলে আদর করছিলাম, আমাদেরকে অবাক করে দিয়ে বলে উঠল আম্মু সোনা। শুনতে ভুল হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, কারণ আমি, সুনয়না আর আমার ছোট ভাই একসাথেই শুনেছি।

দয়াময় খোদা আমার প্রথম দোয়াটাও বোধহয় মেনে নিয়েছেন। আমার ছোটমা যখনি হাঁচি দেয়, আমরা সবাই বলি “আলহামদুলিল্লাহ”। অনেক দিন থেকেই ও হাঁচি দেয়ার পর কিছু একটা বলার চেষ্টা চালাচ্ছিলো। সেদিন হঠাৎ করেই হাচি দেয়ার পরে বলে উঠলো “আলহামদুলি্লাহ”। স্পষ্ট শুনলাম আমরা। তবে স্পষ্ট বলতে তো আর আমাদের মতো নয়, মুখের গঠন তো এখনো কথা বলার উপযোগী নয়। যে টুকু সামর্থ্য আছে ও তার চেয়েও বোধহয় বেশি প্রয়োগ করে বলে ফেলেছে “আলহামদুলি্লাহ”।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন