অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা : মেজর জলিল

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তাদের কাছ থেকেই জানার চেষ্টা করা উচিত যারা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন ৯ নং সেক্টর কমান্ডার (বৃহত্তর বরিশাল জেলা, ভোলা, পটুয়াখালী, ফরিদপুর এবং খুলনা নিয়ে গঠিত বৃহত্তম সেক্টর) মেজর (অবঃ) এম এ জলিল লিখেছেন স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে বই “অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা” । অনেকেই পড়েছেন, অনেকেই নাম শুনেছেন বইটি, তবে সুযোগের অভাবে পড়তে পারেন নি। যারা পড়েছেন তারা রেফারেন্স হিসেবে যাতে ব্যবহার করতে পারেন এবং যারা পড়ার সুযোগ পান নি তারা যাতে পড়ার অতৃপ্ত বাসনা পূরণ করতে পারেন তার জন্য প্রকাশক “ইতিহাস পরিষদের পক্ষে এফ. রহমান”-এর অনুমোদন না নিয়েই ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরবো ইনশাআল্লাহ। বইটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে ইতিহাস পরিষদ সর্বসত্ত্ব সংরক্ষণ করলেও বইটি স্বাধীনতাপ্রেমী সমগ্র বাংলাদেশীর। তাই স্বাধীনচেতা জলিলের বইটি পরাধীনতার শৃংখলমুক্ত করে তুলে দিলাম, আশাকরি ইতিহাস পরিষদ ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।

ভূমিকা

শতাব্দী থেকে শতাব্দী বাংলাদেশের এই ভূখন্ডে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ তাদের স্ব স্ব ধর্ম-কর্ম, সংস্কৃতি, আচার-অনুষ্ঠানসহ মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে এসেছে। এই সহাবস্থানমূলক বসবাসের মাধ্যমে এ দেশের মানুষ গড়ে তুলেছে সমৃদ্ধশালী ঐতিহ্য। তবে যুগে যুগে এই ভূখন্ডের জনগণ বিদেশী শাসক-শোষকদের হাতে শোষিত, নিপীড়িত এবং লুন্ঠিত হয়েছে। ব্রিটিশ শাসক-শোষকদের সুদীর্ঘ দু’শো বছরের শোষণ এখনো অনেকের স্মৃতিতে দু:স্বপ্নের মতই জেগে আছে। একইভাবে হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং জালেম জমিদারী প্রথার মাধ্যমেও নিষ্পেষিত হয়েছে এই ভূখন্ডের শান্তিপ্রিয় জনগণ। সর্বশেষে, ভারত বিভক্তি এবং তারই ফলশ্রুতিতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে পাকিস্তান অর্জন।

ব্রিটিশ রচিত ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো বহাল রেখে পাকিস্তানের উঠতি পুঁজিবাদী গোষ্ঠী বিশেষ করে সামরিক এবং বেসামরিক আমলা গোষ্ঠী এই অঞ্চলের জনগণের উপর বিমাতাসুলভ আচরণ এবং শোষণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে। যার ফলে এই অঞ্চল থেকে যায় অনগ্রসর, অবহেলিত এবং নিগৃহীত। নিগৃহীত জনগণের অভাব-অনটন, হতাশা ও বিক্ষোভ ক্রমশই পুঞ্জীভূত হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে ধূমায়িত হতে হতে ১৯৭১ সনে একটি প্রবল আগ্নেয়গিরির মতই উদগীরণ ঘটে। এই উদগীরণই পরবর্তীতে স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপ নেয়। ১৯৭১ সনের স্বাধীনতা সংগ্রাম হচ্ছে বাঙালী জাতির ধারাবাহিক মুক্তি আন্দোলনেরই একটি স্বত:স্ফূর্ত এবং সক্রিয় রূপ। যুগ যুগ ধরে বাঙালী জাতি দেশী-বিদেশী শাসক-শোষকের বিরুদ্ধে নিরবিচ্ছিন্নভাবে লড়াই করে এসেছে – কখনো করেছে সংঘবদ্ধভাবে, কখনো বা বিচ্ছিন্নভাবে। কিন্তু এই জাতির বিকাশের ইতিহাসে কোনকালেই সংগ্রামী জনগণ একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে যায় নি। নিরবচ্ছিন্ন লড়াইয়ের মধ্যে লালিত মুক্তিপাগল বাঙালী জাতি সর্বযুগেই শোষকদের কবর রচনা করে এসেছে এবং আন্দোলনের ধারা রেখেছে অব্যাহাত।

১৯৭১ সনের সমস্ত গণ-অভ্যুত্থান ছিল একটি যুগান্তকারী গৌরবময় অধ্যায়। এ অধ্যায় রচনা করতে অসীম ত্যাগ-তিতিক্ষার শিকার হতে হয়েছে জাতিকে। প্রাণ দিয়েছে লক্ষ লক্ষ দামাল সন্তান, তাজা রক্ত ঝরেছে অঢেল, ইজ্জত নষ্ট হয়েছে অগণিত মা-বোনের। স্বপ্ন ছিল স্বাধীনতা-মুক্তি। দেশ শত্রুমুক্ত হলে এ দেশে কায়েম হবে একটি শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা। খাদ্যে-বস্ত্রে দেশ হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কৃষি-শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যের সুষ্ঠু বিকাশ ঘটবে। গড়ে উঠবে স্বাধীন জাতির পুঁজি। মানুষের মান-সম্মান এবং জান-মালের থাকবে নিশ্চিত নিরাপত্তা। দেশে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে আইনের শাসন। মর্যাদার দিক থেকে সকল জনগণই হবে মর্যাদার অধিকারী, কর্তব্য এবং দায়িত্ববোধসম্পন্ন। বাঙালী জাতি বিশ্বের মানচিত্রে ঠাঁই লাভ করবে একটি সুখী, স্বাধীন, সমৃদ্ধ সার্বভৌম জাতি হিসেবে। এ সবই তো ছিল সকলের আন্তরিক কামনা-বাসনা। কিন্তু স্বাধীনতা হাতের মুঠোয় পেয়েও যেন আমরা ঠিক পেলাম না।

আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা লাভের প্রায় ১৭ বছর পরেও আমাদের কোন অভাব তো দূর হলোই না বরং যত দিন যাচ্ছে ততই যেন জাতি হিসেবে আমরা মর্যাদাহীন হয়ে পড়ছি, নিস্তেজ হয়ে পড়ছি। বুক ভরা আশা, স্বপ্ন আজ রূপান্তরিত হয়েছে গ্লানি আর হতাশায়।সম্মান, জাতীয়তাবোধ, মর্যাদাবোধ, সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ এ সব কিছুই যেন বিধ্বস্ত। এক কথায়, বিবেক আজ বিভ্রান্ত। সুবিধাবাদ এবং অযোগ্যতার মহড়ায় গোটা জাতি আজ নীর-নিশ্চল, অসহায়, জিম্মী।

আমাদের স্বাধীনতা যেন দেশের সম্পদ, বেপরোয়া লুন্ঠনেরই উন্মত্ততা। আজ বিদেশীরা নয়, আমরাই যেন আমাদের শত্রু। যে জাতির ললাট একদিন স্বাধীনতার লাল সূর্যে ঝিলমিলিয়ে উঠেছিল, সেই উদ্দীপ্ত ললাটই আজ কালিমার আবরণে অন্তরীণ এবং অভিশপ্ত।

এ অবাঞ্ছিত অবস্থার জন্য কে বা কারা দায়ী? আজ সকলের বিরুদ্ধেই সকলের একঘেয়ে অভিযোগ। বিগত ১৭ বছরে যারাই শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে, তারাই দেশ-জাতিকে নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করেছে।

দেশ ও জাতিকে নিজেদের ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত জমিদারী হিসেবে ব্যবহার করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। এ ব্যাপারে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের তো জুড়িই নেই। তবে কেই যেন কারো চেয়ে কম নয়। লুন্ঠন আর দুর্নীতির নির্লজ্জ প্রতিযোগিতার মহড়াই চলেছে কেবল।

ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতাচ্যুত শাসকমহলসমূহের অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগের নাটক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেশবাসীর কাছে আজ অপরাধী এবং আসামীদের চেহারা অত্যন্ত পরিষ্কার। দেশের দশ কোটি মানুষ অপরাধী কিংবা আসামী নয়। সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া একটি জাতি কখনই আসামী হতে পারে না। আমাদের জনগণ জ্ঞানী-গুণী এবং সাহসী। তবে দোষ-ত্রুটি যে আমাদের মধ্যে মোটেও নেই তাও নয়। জাতিগতভাবে আমাদের দোষত্রুটির খতিয়ান দেয়ার সময়ও আজ দ্বারপ্রান্তে। বিগত ১৭ বছরে বেশ কয়েকটি সরকার দেশ পরিচালনা করার দায়িত্ব নিয়েছে। কেউ নিয়েছে নির্বাচনের মাধ্যমে আর কেউ বা নিয়েছে বন্দুকের মাধ্যমে।

কারচুপিমূলক নির্বাচন আর ষড়যন্ত্রমূলক বন্দুকের নলের মাধ্যমে অধিষ্ঠিত ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর কেউই এদেশৈর জনগণের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হয়নি। মুখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তুলে ধরার শপথ নিলেও স্বাধীনতার উষালগ্ন থেকে অদ্যাবধি প্রত্যেকটি সরকারই কার্যত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নির্মূল করার লক্ষেই বিভিন্ন ষড়যন্ত্রমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দোর্দন্ড প্রতাপ নিয়ে জেগে ওঠা বাঙালী জাতির জাগ্রত বিবেক এবং শক্তিকে ভীতির চোখে দেখেছে, প্রীতির চোখে নয়। বিদেশী প্রভুরাও দেখেছে একই চোখে। শোষণ-জুলুমের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রাম পরিচালনা করার অগ্নিশপথপুষ্ট চেতার নামই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। তাই মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিতরণ করা কুছু জমি, বাড়ী, টাকা-পয়সা, তাদের কিছু পদোন্নতি, গড়ে তোলা লাল ইটের কিছু স্তম্ভ। ব্যস! মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষাকারীদের জীবন ধন্য। এ ভাবে চলেছে মুক্তিযুদ্ধের তথাকথিত চেতনা লালনকারীদের নাটক। এই জাতির উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতকে ব্যক্তি, দলীয় এবং গোষ্ঠীর স্বার্থে অতিত নির্দয়ভাবে ঠেলে দিয়েছে বিলাসের পথে, ধ্বংসের পথে। গণ-মানুষের মৌলিক চাহিদা অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং বাসস্থান এ সবের কোন বিহিত না করেই শাসকগোষ্ঠীসমূহ আত্মমগ্ন রয়েছে নিজস্ব ভোগ-বিলাসে।

অন্নহীনের হাহাকার, বস্ত্রহীনের সলজ্জ চিৎকার, রুগ্নের আর্তনাদ, গৃহহীনের ফরিয়াদ এবং নিরক্ষরদের হা-হুতাশ কোন সরকারের কর্ণগোচর হয়নি। আজো হচ্ছে না। অথচ অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠেছে শাসক এবং তাদের দোসরকুলে। তাদের মিথ্যাচার এবং প্রতারণা জাতিকে ভীতিজনকভাবে করেছে কলুষিত। বিচারের নামে প্রহসন ন্যায়-নীতির কাঠামোকে ধসে দিয়েছে। এ সব কিছুর ফলেই একাত্তরের স্বাধীনতা আন্দোলনের ‘প্রাণকেন্দ্র’ মরহুম জনাব শেখ মুজিবুর রহমান এবং স্বাধীনতার ঘোষক বলে পরিচিত জনাব জিয়াউর রহমান উভয় রাষ্ট্রপ্রধানই অস্বাভাবিক পরিণতির শিকার হয়েছেন। তাঁরা তাঁদের সৃষ্ট সমস্যার আবর্তে লুপ্ত হয়েছেন। তাদের যোগ্যতা-অযোগ্যতার প্রশ্ন না টেনে এ সত্যটি আজ নির্দ্বিধায় আমাদের ভবিষ্যত বংশধরদের জানিয়ে দেয়া প্রয়োজন যে, দেশ ও জনগণের স্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতাই উভয় নেতার অস্বাভাবিক তিরোধানের অন্যতম কারণ। তবে তাদের হত্যার বিচারের দাবীও উঠেছে। কিন্তু কে করবে আজ কার বিচার? এ দেশে আজো তো কায়েম হয়নি বিচারের শাসন। তাই কে বা কারা রাষ্ট্র প্রধানদ্বয়কে খুন করেছে এবং এ খুনের বিচার হলো কি হলো না এ প্রশ্নটি অমীমাংসীতই থেকে যাবে যতদিন না এ দেশে আইনের শাসন কায়েম হয়। কিন্তু ‘খুনের বিচার চাই’, ‘রক্তের প্রতিশোধ চাই’ এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যে ধাঁচের রাজনীতি জন্ম দেয়া হচ্ছে, সে রাজনীতি পারবে কি সমস্যা জর্জরিত দেশৈর দশ কোটি মানুষের মৌলিক সমস্যার সমাধান দিতে?

শাসক-শোষক এবং রাজনীতির প্রতি জনগণ আজ চায় তাদের মৌলিক সমস্যার সমাধান। ব্যক্তিপূজা জাতিকে মুক্তি প্রদান করে কিনা সে প্রশ্নটি আজ অতীব গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে সৃষ্ট ‘মুজিব’ শুধু মুজিবই ছিলেন না, ছিলেন ’৭১-এর স্বাধীনতা আন্দোলনের উদ্দীপ্ত প্রতীক। ব্যক্তি মুজিবের তিরোধান প্রতীক মুজিবকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলতে পারবে না। যার যতটুকু প্রাপ্য তা আগামী দিনের ইতিহাস নির্ধারণ করবে।

যে দেশে হাজারো মায়ের প্রাণপ্রিয় যুবক সন্তানেরা কেবল বস্তাবন্দী হয়ে খালে-বিলে-নদীতে ভেসেছ, যে দেশে বিনা বিচারে শত শত মুক্তিযোদ্ধা ও বীর সিপাহীদেরকে রাতের আঁধারে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হয়েছে, ফাঁসিতে ঝুলানো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের অনেক বীর নায়ক-অধিনায়ককে, সে দেশে সত্যিকার বিচার ব্যবস্থা কায়েম হোক এটাই তো সকলের ঐকান্তিক কামনা। আইনের শাসনের অবর্তমানে গগ দেড় যুগ ধরে জাতির রক্ত ঝরেই চলেঠে, সমান গতিতে চলেছে নারী-ধর্ষণ নির্যাতন। বিচার নেই, আছে শুধু হাহাকার-কান্না। এই ন্যায় বিচারের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষেই আজ প্রয়োজন সাহসী দুর্বার গণ-জাগরণ। শোষণমূলক আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে আইনের শাসন বলতে যা বুঝায় তা কেবল শাসকগোষ্ঠীর জন্যই আইন লঙ্ঘন এবং আইন অপপ্রয়োগ করার বেশুমার ক্ষমতা। আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন জনগণকে প্রশাসনমুখী করে তোলে, প্রশাসন এ অবস্থায় কখনো জনমুখী হয় না। প্রশাসন জনশক্তির বিকাশ সাধনে ব্রতী নয়, জনশক্তিকে অসহায়ভাবে প্রশাসনের উপর নির্ভরশীল করে তোলাই হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের লক্ষ্য। ক্ষমতায় বসে কেবল ফরমান জারী করলেই প্রশাসনের চরিত্র গণমুখী হয়ে ওঠে না। আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাঠামোকে আঁকড়ে ধরে জনগণকে মুক্তির আশ্বাস দান জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতারই শামিল। এ সত্যটি অনুধাবন করার মত জ্ঞান প্রত্যেকটি সরকারেরই ছিল। ছিল না শুধু এই প্রচলিত প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তন করে গণমুখী ব্যবস্থা প্রবর্তন করার সদিচ্ছা। তাই সত্য আজ দিবালোকের মতই পরিস্কার যে, বিগত ১৭ বছরে গঠিত সরকারসমূহ সুপরিকল্পিতভাবেই একটি স্বাধীন জাতিকে আত্মবিধ্বংসী পথে ঠেলে দিয়েছে। এ জাতির স্বপ্নিল ভবিষ্যতকে করে তুলেছে অনিশ্চিত ও অন্ধকার। তবে বিগত সরকার সমূহের ষড়যন্ত্র, অযোগ্যতা এবং ব্যর্থতার ইতিহাস দশ কোটি মানুষের এবং এ জাতির অনাগত ভবিষ্যতের ইতিহাস হতে পারে না। বিপুল সম্ভাবনাময় এ জাতির ললাটে স্থায়ী কলঙ্কের ছাপ লেপন করে দেয়ার অধিকার কারো নেই এবং এমন অধিকার কাউকে দেয়াও যায় না। স্বাধীনতাত্তোর শাসকদের ব্যর্থতার পাশাপাশি এসে যায় বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের দু:খজনক বিভক্তি, সুবিধাবাদ, সংকীর্ণতা এবং ষড়যন্ত্রের লজ্জাজনক অধ্যায়। বিভিন্ন মতবাদের বুলিতে আবদ্ধ দেশের রাজনৈতিক সংগঠনসমূহের সার্বক্ষণিক জনগণের মধ্যে বিচরণ করলেও কার্যত কোন সংগঠনই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থের উর্ধ্বে নয় বিধায় দেশ ও জাতিকে যুগোপযোগী দিক-নির্দেশনায় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। প্রচলিত রাজনীতি বুলিসর্বস্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ব্যর্থতা থেকে কোন সংগঠনই মুক্ত নয়। পুন:পুন সামরিক শাসন প্রবর্তনের ফলে আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাঠামো নতুন জীভন লাভ করেছে। অপরদিকে, রাজনৈতিক সংগঠনসমূহ যেমন পড়েছে বিপাকে, তেমনি শিকার হয়েছে বিভিন্ন প্রলোভনের। ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করতে গিয়ে বহু সংখ্যক নেতা ও কর্মী হারিয়েছে রাজনৈতিক চরিত্র। জনসেবা ও প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনের শপথে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েও কার্যত তারা প্রচলিত কাঠামোর আওতায় বন্দী হয়ে পড়েছে। ধারাবাহিক আত্মনিবেদিত রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সার্বিক মুক্তির প্রশ্নটি জনগণের কাছে আজ অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

রাজনীতির এই দু:খজনক পরিণতি দেশ ও জাতির জন্য সুখের খবর তো নয়ই, বরং ভয়াবহ অমঙ্গলের হাতছানি। এই অবস্থার কারণেই আজ জাতি সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস ও বিবেক হারিয়ে ফেলেছে প্রায়। জুলুম, নির্যাতন, মেশিনগান, ট্যাংক যে জাতির যাত্রাপথকে করতে পারেনি রুদ্ধ, সেই জাতিটিই আজ অপমানের বোঝা মাথায় নিয়ে অসহায়ভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া জাতিটিকে আজ মুখ বুজে সহ্য করতে হচ্ছে কতো অপবাদ, ‘তলাবিহীন ভুড়ি’, ‘মিসকিন দেশ’, ‘বিশ্বের দরিদ্রতম দেম’ আরো কতো কি। মুক্তিযুদ্ধে ঝরানো তাজা রক্তের বিনিময়ে এটাই কি ছিল এ জাতির প্রাপ্য? ১৯৭১ সনের স্বাধীনতা যুদ্ধে কতো মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ হারালো, শহীদ হলো, পঙ্গু হলো, হলো নিখৌঁজ তার যেমন নেই সঠিক কোন পরিসংখ্যান, তেমনি স্বাধীনতা উত্তর বিগত ১৭ বছরে আরো কতো শত সহস্র যোদ্ধা যে মিথ্যা খুন-চুরি-ডাকাতির অভিযোগে কারাগারে ধুঁকে ধুঁকে মরেছে, মরেছে অনাহারে, শিকার হয়েছে গুপ্ত ও প্রকাশ্য হত্যার, ঝুলেছে ফাঁসিকাষ্ঠে তারও নেই কোন হিসেব। যেন মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল এদেশের মানুষকে বিশেষ করে দামাল যুবশক্তিকে বেহিসাব নির্মূল করার ‘ব্লুপ্রিন্ট’ নিয়ে।

স্বাধীনতার পর থেকেই প্রত্যেকটি রাজনৈতিক সংগঠন মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের দাবীতে সোচ্চার এবং প্রত্যেকটি সরকারের মুখেই তাদের পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি ধ্বনিত হলেও মূলত মুক্তিযুদ্ধের নামে স্বাধীন বাংলাদেশে বিশেষ কিছু ব্যক্তি, শ্রেণী ও গোষ্ঠী সুপরিকল্পিতভাবে সবসময় সুযোগ-সুবিধা ভোগের মাধ্যমে নব্য ধণিক শ্রেণী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করার প্রতিযোগিতায় বেপরোয়াভাবে মত্ত। এদেরকে নাম ধরে চিহ্নিত না করলেও সমাজদেহের প্রতি স্তরেই এদের কুৎসিত চেহারা আজ সুস্পষ্ট। জাতির বীর মুক্তিযোদ্ধারা আজ উপহাস কৌতুক ও করুণার পাত্র। ভাবখানা এমন যেন মুক্তিযোদ্ধারা ছিল এক শ্রেণীর কামলা যাদের কাজ ছিল হানাদার তাড়িয়ে দিয়ে দেশীয় কিছু অসৎ সামরিক-বেসামরিক আমলা এবং ব্যবসায়িক মনোবৃত্তির এক শ্রেণীর রাজনীতিকদের হাতে দেশের শাসনভার তুলে দেয়া। সবসময় মানবিক, সামাজিক এবং নৈতিক মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়েও তারাই হবে দেশের প্রভু এবং মুক্তিযোদ্ধারা থাকবে তাদেরই বাধ্যগত কামলা। মুক্তিযোদ্ধাদেরকে আজ একটা কথা পরিস্কারভাবে জেনে রাখতে হবে যে, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেয়া জাতির মুক্তিযোদ্ধারা কারো দ্বারা পুনর্বাসিত হয় না, বরং মুক্তিযুদ্ধারাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী হয়। তাদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে তারাই সমাজের পুরাতন কাঠামো ভেঙ্গে দিয়ে নতুন রাষ্ট্রীয় কাঠামো বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে সমাজের শোষিত-নিগৃহীত শ্রেণীসমূহকে পুনর্বাসিত করে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রশ্নে ব্যাপারটি ঘটেছে সম্পূর্ণ উল্টো। মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের চিৎকার সদিচ্ছার চিৎকার নয়, এটাই হচ্ছে প্রকৃত পাওনাদারকে তার প্রাপ্য থেকে প্রতারণা করার এক গভীর ষড়যন্ত্র। সমাজে পুনর্বাসন প্রয়োজন কাদের? সমাজের পঙ্গু, অনাথ, আতুর, বেকার ভিক্ষুক, পতিতা ইত্যাদি অবহেলিত এবং অক্ষম শ্রেণীর প্রয়োজন পুনর্বাসন।

সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ ও জাতির জন্য বিজয় আনয়নকারী বীর যোদ্ধারা কোনদিনই পুনর্বাসনের পর্যায়ে পড়ে না। মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের সমতুল্য কোন বিনিময় নেই। তাদের গৌরবময় অম্লান ত্যাগের কেবল তারাই পুন:প্রতিষ্ঠা লাভ করবে না, দেশ-জাতিও হবে পুনর্গঠিত। যে জাতির যোদ্ধারাই পুনর্বাসনের স্তরে নেমে যায়ম সে জাতির পুনর্গঠন তো দূরে থাক, তাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বই হয়ে পড়ে বিপন্ন। জাতির বীর যোদ্ধারাই যদি হয়ে পড়ে করুণার পাত্র, করে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন, সে জাতির সাধারণ জনগণের ভোগান্তি আর দূর্দশার যে কোন সীমাই থাকে না,তা আজ আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা প্রত্যক্ষ করলেই স্পষ্ট অনুধাবন করা যায়। অথচ এই ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধই বাঙালী সত্তাকে বিশ্ববাসীর দরবারে নকুন আঙ্গিকে সুপরিচিত করেছে।

‘ভেতো’ এবং ‘ভীতু’ হিসেবে পরিচিত বাঙালী অতীতের সকল অপবাদ ঝেড়ে-মুছে ফেলে একটি সক্ষম যোদ্ধা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।রক্তক্ষয়ী বীরত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ ও জাতির এই গৌ্রবের আসন অধিকার করেছে। এ গৌরবের অংশীদার সমগ্র জাতি। এ গৌরব কোন বিশেষ ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা কোন দল বিশেষের নয়। এমন একটি ঐতিহ্যময় গৌরবকে যখন কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা কোন রাজনৈতিক দল কিংবা মুক্তিযুদ্ধে সহকারী কোন দেশ বা জাতি নিজের একক কৃতিত্বের দাবীদার হয়, তখনই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ কেবল বিতর্কিত হয়ে ওঠে না, জনমনেও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জন্ম নেয় নানরূপ সংশয় এবং সন্দেহ। মূলত বাস্তবে ঘটেছেও তাই। মুক্তিযুদ্ধ উত্তরকালে তদানীন্তন শাসকগোষ্ঠীর প্রতারণা, নিপীড়ন এবং শোষণমুখী শাসন, মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যকারী বলে কথিত প্রতিবেশী ভারতীয় শাসক গোষ্ঠীর বাংলাদেশের জনগণের প্রতি ‘বিগ ব্রাদার’ সুলভ আধিপত্যবাদী আচরণ মুক্তিযুদ্ধের গৌরবকে কেবল ম্লানই করেনি, করেছে বিকৃত এবং কলঙ্কিত। মুক্তিযুদ্ধের ৯ নং সেক্টরে সাবেক কমান্ডার হিসেবে বিগত১৭ বছর আমাকে প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার অকাল মৃত্যু, গুম ও খুন। নির্মূল ও বিরান হয়ে গেছে তাদের সাজানো-পাতানো সংসার। স্বাধীণতা অর্জনের আমলেই আওয়ামী লীগ এবং স্বাধীনতার ঘোষক বলে কথিত জিয়া সরকারের আমলেই সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে মুক্তিযোদ্ধারা। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতেই মুক্তিযোদ্ধারা হয়েছে নাজেহাল। মুক্তিযুদ্ধের পরে মুক্তিযোদ্ধারাই হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের চরম শত্রু। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যদি একই হয়ে থাকে, তাহলে এই দু:খ ও লজ্জাজনক বিভক্তি, শত্রুতা এবং নিধন প্রক্রিয়া কেন? তাহলে এই মুক্তিযুদ্ধের আসল রহস্যটা কী? প্রাণপ্রিয় মুক্তিযোদ্ধা ভাই-বোনেরা ও শ্রদ্ধেয় দেশবাসী আসুন না একটু তলিয়ে দেখি।

<<<পূর্বের অধ্যায়পরবর্তী অধ্যায় >>>

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

“অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা : মেজর জলিল” লেখাটিতে 4 টি মন্তব্য

  1. অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা : মেজর জলিল | শাহরিয়ারের স্বপ্নবিলাস বলেছেন:

    […] ২। ভূমিকা […]

  2. অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা : মেজর জলিল | শাহরিয়ারের স্বপ্নবিলাস বলেছেন:

    […] <<<পূর্বের অধ্যায় । পরবর্তী অধ্যায় >>> Share and Enjoy: […]

  3. অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা : মেজর জলিল | শাহরিয়ারের স্বপ্নবিলাস বলেছেন:

    […] পরবর্তী অধ্যায় >>> Share and […]

  4. সাইদ বলেছেন:

    ভাইজান সালাম নিবেন ।
    মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার এ ধরনের আরো বই আপলোড করলে তরুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ও আওয়ামি লীগ সম্পকে জানতে পারত ।
    এই বই গুলো খুব তাড়াতাড়ি লোড করলে উপকৃত হতাম।
    দুই পলাশি দুই মীরজাফর,বাংলাদেশের রক্তের ঋণ,ও মেজর জলিলের আরও বই ।

    আল্লাহ আপনার উদ্দেশ্য, শ্রম সারথক ও বাস্তবায়ন করুক
    (আমিন)

    [উত্তর দিন]

মন্তব্য করুন