কি মজা! আজ আপেল খাবো

:কত?
ক্লান্ত-শ্রান্ত শীর্ণকায় বুড়ি ফলের দোকানীর কাছে প্রশ্ন রাখে।
চৈত্রের প্রখর দৌদ্রতাপে ঝিমিয়ে পড়া লাউয়ের ডগার মতো নেতানো শরীর। ফেলে আসা তিন কুড়ি বছরের স্বাী দিচ্ছে কপালের বলিরেখাগুলো।
গুলিস্তান মোড়ের ফুটপাতে ফল বিক্রেতার ঝুড়িতে কতগুলো পঁচন ধরা আপেল দেখে তার মনে পড়ে যায় মা-বাপ মরা নাতিটার কথা। কয়েকদিন ধরে শুধু আপেলের গল্পই করছে ছেলেটা।
:একদাম পঞ্চাশ টাকা, দামাদামি করলে নাই। নির্লিত জবাব দোকানীর।
:ওই মিয়া, এই পচা আপেলগুলা পঞ্চাশ টাকা চাও, মাথা কি গরমে আউলায়া গেছে?
:প্যান প্যান কইরো না বুড়ি, তোমারে কি কইছি পঁচাগুলা কিনতে? ৯০ টাকা ছাড়ো নতুন এক কেজি আপেল দিয়া দেই। কি লইবা নতুনডা?
দোকানীর কথা শুনে বুড়ির মনটা বিষিয়ে ওঠে। হারামজাদা দারিদ্র্যের খোটা দেয়। এক সময় তারও গোলাভরা ধান আর পুকুরভরা মাছের সুখের সংসার ছিল। নিয়তি আজ তাকে পথের ফকির করেছে। ফকির হলেও একটা কথা ছিল, দ্বারে দ্বারে ভি েকরে খাওয়া যায়, কিন্তু হাত পেতে খাওয়ার মতো অতটা বেইজ্জত হওয়ার চেয়ে না খেয়ে মরা ভালো মনে হয় তার। তাই এ বয়সেও দু’মুঠো অন্ন সংস্থানেই তার কেটে যায় সারা বেলা।
মা-বাপ মরা নাতিটার আপেল খাওয়ার শখ বহুদিন ধরে কিন্তু আপেল কেনার টাকা কোথায়। তার নিজেরও কি খেতে ইচ্ছে করে না? সেই শেষ কবে যে আপেল খেয়েছেন সহজে মনে আসে না । চৌধুরীর সাবের বড় বৌ গতবার একটা আপেল কেটে অর্ধেকটা খেতে দিয়েছিলেন। আহ! বড় ভালো বউটা।
: বিশ টাকায় দিবা? এই পঁচা আপেল গরমে তো আধঘন্টাও টিকবো না।
বুড়ি মনে মনে একবার হিসেব করে নেয় বিশ টাকা আপেলে খরচ হলে কয়বেলা উপোষ থাকতে হবে। কোন ভাবেই বিশ টাকার বেশী দেয়া যাবে না, সীদ্ধান্ত নেয় বুড়ি।
: আপনি বুড়া মানুষ, মায়ের বয়সী, তাই দশ টাকা কমাইলাম। দেন চলি্লশ টাকা দেন।
: না বাপু, বিশ টাকার বেশি আমি এক পয়সাও দিতে পারবো না, তুমি দেখ পারো কি না।
মনে মনে আল্লাহকে ডাকে বুড়ি, আল্লাহ! দোকানদারের মনটা তুমি চৈত্রমাসি জমিনের মতো ফাটাইয়া দিও না, তার দিলে বৃষ্টি দাও। রহম কর আল্লাহ।
: আরো দশ টাকা কমাইলাম। ত্রিশ টাকার নিচে আমি দিমু না, কিনলে কিন না কিনলে রাস্তা মাপো।
বুড়ি একটু দ্বিধা করে। তার নাতিটার করুন মুখটা চোখে ভেসে ওঠে। সেদিন রাতে ছেলেটা গল্প করে, রাজা-রানী আর রাজপুত্রের গল্প। রাজপুত্র বিভাবে আপেল খায় তা অভিনয় করে। নিজের কচি হাতটা মুখের কাছে নিয়ে আপেলের মতো কচ কচ করে কামড় দিয়ে খাওয়ার অভিনয় করে দেখায়। ছেলেটা অভিনয়ের মাঝেই আপেল খাওয়ার স্বপ্নে বিভোড় হয়, চোখগুলো আনন্দে চকচক করে ওঠে, ফোকলা দাতে হাসতে হাসতে দাদীর গায়ে গড়িয়ে পড়ে।
নাতিটার কথা মনে হতেই চোখের কোনে পানি জমে। চোখের পানি লুকোতে তাই দোকান থেকে দ্রুত কেটে পরতে পা বাড়ায়। এই বুড়ো বয়সে ছোকড়া দোকানীর সামনে কাঁদতে তার বড়ই লজ্জা।
:ওই বুড়ি আপেল নিবা না। দাও বিশ টাকায়ই দিলাম। দশ টাকা গচ্চা দিতে হইলো। আপনে মায়ের বয়সী তাই দিলাম।
বুড়ির মনে হলো দোকানদার মানুষ না যেন ফেরেস্তা। আল্লাহ তাহলে তার এই ছোট্ট দোয়াটা কবুল করেছেন। আপেলের আনন্দে বুকটা ভরে ওঠে। তিনি যেন শুনতে পান তার নাতি তার হাতে আপেল দেখেই গান গাইতে শুরু করেছে “কী মজা! কী মজা! আইজ আপেল খামুরে।” তিনি নাতিটা ফোকলা দাতে কচকচ করে আপেল খাওয়া দেখতে দ্রুত পায়ে হেটে চলেন বাড়ীর পানে।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন