কে জিতবে বিশ্বকাপ, পল না মেনি?

বিশ্বকাপ ফুটবলে প্রিয় দলগুলো একে একে বিদায় নিয়েছে, বিদায় নিয়েছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নেরা। অনেকেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন খেলা দেখায়। তারপরও ফাইনাল খেলা বলে কথা, তাই চোখের জল মুছে অনেকেই আবার চাঙ্গা হয়েছে উঠেছেন বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচটি দেখার জন্য। যে দলই খেলায় জিতুক না কেন তাতে আর আনন্দ বা আক্ষেপ নেই অনেকেরই তবে ফাইনাল খেলা সবাইকে আগ্রহী করে তুলেছে দুটি জমকালো বিষয়, এক সাকিরার লাইভ নর্তন কুর্দন এবং দ্বিতীয়টি ও সবচেয়ে আর্কষণীয় গনকঠাকুর পলের ভবিষ্যতবাণী।

হ্যা, পল ইতোমধ্যেই তার গণনা শেষ করেছে, স্পেনকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাই যারা গণনায় বিশ্বাসী তাদের এখন আর খেলা দেখা না দেখায় কিছু যায় আসে না, অষ্টপদী দেবতার পছন্দ বলে কথা, জয় স্পেনের এবার হবেই নিশ্চয়।

ইতোমধ্যেই অনেক গুলো খেলায় হারিয়ে দিয়েছে পল। যে ইশ্বরের হাত দিয়ে ম্যারাডোনা গোল করে বিশ্বকাপ জিতে ছিলেন সেই ইশ্বর এবার আর আর্জেন্টিনার সহায় ছিলেন না। বরং জার্মানীর পক্ষে এবার অষ্টপদী দেবতা খেলেছেন, আর্জেন্টিনাকে নাকানি চুবানী খাইয়ে হারিয়েছেন।আর্জেন্টিনার খেলা দেখে মনে হয়েছে দেবতা যেহেতু নেমেছেন জার্মানীর পক্ষে তখন আর খেলে কি হবে, তার চেয়ে দেবতাকে সন্তুষ্ট করে গো-হারা হেরে বাড়ী ফেরাই ভালো। ব্যাপারটা হয়তো আর্জেন্টাইনবাসীও বুঝতে পেরেছেন, তাই ব্রাজিলের খেলোয়াড়দের যেখানে এয়ারপোর্টে বিকল্প রাস্তা দিয়ে পালাতে হয়েছে সেখানে আর্জেন্টিনার টীমের জন্য ফুলের মালা নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন হাজার হাজার ভক্ত।নিজেরা হেরেছে তো কি হয়েছে, ইশ্বরকে তো জিতিয়ে দিয়েছে তারা এই বা কম কিসে।

যেভাবে একেরপর এক খেলায় পল দলগুলোকে জিতিয়ে দিচ্ছে তাতে আর তাকে অক্টোপাস বলা যায় না, নিছক গণক বললেও মান থাকে না তাই সরাসরি দেবতা বলে স্বীকার করাই ভালো। কেননা ইতোমধ্যেই পল ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক আগ্রহ নিয়ে দেখেছে তার ফাইনাল গণণা। শুধু কি তাই? স্বয়ং স্পেনের প্রধানমন্ত্রী তার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত, ইতোমধ্যে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি চৌকষ বাহিনী পাঠানোরও ঘোষণা দিয়েছেন। কারণ যাদের তুষ্ট করতে পারেনি অস্টভূজী, সেইসব কাফেরের দল তাকে গ্রীল করে খাওয়ার হুমকি দিয়েছে।

দিকে দিকে জয়ধ্বনি, বিশ্বের সকল মিডিয়া গ্রোগ্রাসে গিলছে পলের ভবিষ্যৰবাণী। যে পত্র-পত্রিকাগুলো নিজেদেরকে প্রগতিশীল বলে দাবী করে তাদের আগ্রহ বরং বেশীই দেখা যায়। পল বলেছে, অতএব অবশ্যই তা ঘটবে এমন ভক্তি নিয়ে হাজার হাজার পুজারী তাদের জীবন সঙ্গী বাছাইয়ে সরণাপন্ন হচ্ছে তার কাছে, সন্তান ছেলে হবে না মেয়ে, নির্বাচনে জিতবে না কি হেরে যাবে, শেয়ারের দাম বাড়বে না পতন হবে, এমন কোন বিষয় নেই যা তার কাছ থেকে পরার্মশ নেয়া হচ্ছে না। অবস্থা এমন যে তার সামনে যদি অপশন রাখা হয় কাল ওবামা বেঁচে থাকবেন না মরে যাবেন” এবং পল যদি তার মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করে, তবে নিশ্চিত যে তার আর কালকের সূর্যোদয় দেখা হবে না, হার্টফেল করে বেচারা রাতেই রওয়ানা হবেন ইশ্বরদর্শনে।

আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে পল ফুটবল খেলা বুঝে কি না, বিশ্বের সব দেশের পতাকা তার চেনা কিনা, ফুটবল কোন কোন দল খেলছে তা জানে কি না, তার রঙপ্রীতি আছে কি না। আমার ইচ্ছে হয় পলের সামনে বাংলাদেশ আর ভারতের পতাকা দিয়ে বলি দ্যাখ ব্যাটা এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলে কোন দলটি জিতবে? পল কি চুপ করে থাকবে নাকি নতুন কোন খাবারের লোভে বাংলাদেশকেই জিতিয়ে দেবে? নাকি বুঝতে পারবে তাকে বোকা বানানো হচ্ছে?

আমার খেলায় তেমন আগ্রহ নেই, আগ্রহ নেই কোন দল বিশ্বকাপ ঘরে তুললো তাতেও। তবে এবার খুব আশাকরে আছি যেন স্পেন হেরে যায়। না, স্পেনের প্রতি কোন অভিযোগ নেই আমার বরং জ্ঞানীগুণীদের পাগলামি আমাকে ক্ষুদ্ধ করে, তাই পলের ভবিষ্যতবাণীর ব্যর্থতার বলি হিসেবে স্পেনের পরাজয় চাই। জানি স্পেন পরাজিত হলে পলের ভাগ্যে দূর্গতি আছে তবুও চাইছি, কারণ কোটি কোটি মানুষ সাধারণ একটি অবুঝ প্রাণীর কারণে বিবেক বুদ্ধিকে বিসর্জন দেবে তা কিছুতেই কাম্য নয়।

তবে পলের পরাজয়েই কি সব শেষ হয়ে যায়? মনে হয় না, যারা কোটি কোটি মানুষকে ধোঁকা দিয়ে টাকার কুমির হতে চায় তাদের হাতে অব্যর্থ অস্ত্রের কমতি নেই। পল পরাজিত হলে রিজার্ভ রয়েছে সিঙ্গাপুরী সুখপাখি মেনি। এ পাখিটি ভবিষ্যত বাণী করেছে নেদারল্যান্ডই জিতবে বিশ্বকাপ। তাই যারা ভবিষ্যতবাণী বিশ্বাস করতে ভালোবাসে, যারা জ্ঞানবুদ্ধিকে বিসর্জন দিয়ে অজ্ঞতার পুঁজো ভালোবাসে তাদের ভয়ের কিছু নেই। পল হেরে গেলে আছে ম্যানি, মেনির পরাজয়ে আছে পলের মহাজয়।

তবুও নেদারল্যান্ডের জয় হোক, কারণ মন্দের ভালো হিসেবে পলের চেয়ে মেনিই ভালো। কারণ মেনির ভবিষ্যতবাণীতে যতজন বিভ্রান্ত হবে তার চেয়ে হাজারগুণ বিভ্রান্ত পলের গণণায়। আর আমার কথা যদি বলি, লক্ষ কোটি বারও যদি পলের মতো অবুঝ প্রাণী কিংবা চতুর মানুষ গণকেরা ভবিষ্যতবাণী করে তবুও তাদের কথা বিশ্বাস করতে আমার রুচিতে বাধে বৈকি। যারা ভবিষ্যতবাণী পছন্দ করেন, ভবিষ্যতবাণীতে  তাদের স্নায়ুতে প্রভাব বিস্তার করে, আর মানুষের মন অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে। হারার আগেই যে হেরে যায় তাকে জেতানো যায় না। আমি ভবিষ্যত জানতে আগ্রহী নই, ভবিষ্যতে পরিভ্রমনে আগ্রহী, স্বচক্ষে দেখতে আগ্রহী।

Be Sociable, Share!

এ লেখাটি প্রিন্ট করুন এ লেখাটি প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন